kalerkantho


‘কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায়’

কিডনি রোগ নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন। এসংক্রান্ত কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ, কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায়’

প্রশ্ন :  কিডনির কাজ আসলে কী?

হারুন আর রশিদ : দেহের এক ভাইটাল অর্গান কিডনি। জন্মের ছয় সপ্তাহের মধ্যে মানুষের কিডনির ছাঁকনি বা ফিল্টার মেমব্রেন পুরোপুরি তৈরি হয়। তখন পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারে কিডনি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতি কিডনিতে প্রায় ১০-১২ লাখ ছাঁকনি থাকে, যা প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ লিটারের মতো রক্ত পরিশোধন করে এক থেকে তিন লিটার শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের আকারে বের করে দেয়। যখন এই ফিল্টার বা পরিশোধনকাজ বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন কিডনি রোগ হয়। এ ছাড়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত তৈরিতে সাহায্য করা এবং ভিটামিন ‘ডি’ কার্যকর করায় কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

প্রশ্ন : ঠিক কী কী কারণে কিডনি রোগ হয়?

হারুন আর রশিদ : কিডনি রোগকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এর একটি হচ্ছে আকস্মিক কিডনির কার্যকারিতা লোপ পাওয়া এবং অন্যটি ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া। আমাদের দেশে আকস্মিক কিডনি রোগের প্রধান কারণ হলো, পানিবাহিত কিডনি রোগ। হঠাৎ করে অতিরিক্ত ডায়রিয়া, বমি, ডেঙ্গু জ্বর ও ফ্যালসিপরাম ম্যালেরিয়া রোগের কারণে আকস্মিক কিডনি রোগ হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে গর্ভকালীন জটিলতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, বিভিন্ন ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবেও আকস্মিক কিডনি বিকল হতে পারে। এ ছাড়া নেফ্রাইটিস, জীবাণুজনিত ইনফেকশনও কিডনিকে তাত্ক্ষণিক অকার্যকর করে ফেলতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের প্রধান কারণ হচ্ছে নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। নেফ্রাইটিসে শরীর ফুলে যায়, পরে পেটে ও পায়ে পানি জমে, প্রস্রাব কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে টনসিল বা  খোসপাঁচড়া হওয়ার দু-তিন সপ্তাহ পর এ ধরনের নেফ্রাইটিস হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রস্রাবে রক্ত যেতে পারে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।

শিশুদের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নেফ্রাইটিস নিরাময় হয়, কিন্তু বড়দের নেফ্রাইটিস মাত্র ৫০ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব। তাদের কিডনির ৩০ শতাংশের ১ শতাংশ কয়েক বছর পর নিরাময় হয়। বাকি ৩০ শতাংশ ওষুধের মাধ্যমে সেরে যায়, আর বাকি ৩০ শতাংশ চিকিৎসা সত্ত্বেও কিডনিকে ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ অকেজো করে ফেলে। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস রোগীর ৩০-৪০ শতাংশের  কিডনি জটিলতায় ভুগে ভুগে কিডনি ক্রমান্বয়ে অকেজো হতে থাকে। আর উচ্চ রক্তচাপের কারণে ২০-২৫ শতাংশ কিডনির কার্যক্রম ধীর ধীরে লোপ পায়। যাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাদের কিডনিও বিকল হতে পারে।

 

প্রশ্ন : দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে জটিলতা কেমন?

হারুন আর রশিদ : দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সবচেয়ে অসুবিধা হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগীদের কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। ফলে বছরের পর বছর তাঁরা চিকিৎসকেরও শরণাপন্ন হন না। উপসর্গ দেখা দিলে কিডনির কার্যকারিতা ৭০-৭৫ শতাংশ লোপ পায়। তখন ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করে পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। কিডনি ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিরূপণ করা যেত, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে ওই রোগগুলো আংশিক বা পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হতো। সুতরাং কেউ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে কি না এটা জানা এবং জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।

 

প্রশ্ন : সম্ভবত ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনি রোগের একটা সম্পর্ক রয়েছে।

হারুন আর রশিদ : হ্যাঁ, ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনি রোগের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে গ্রামপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ। এদের ১৮.৫ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ, ১০ শতাংশের ডায়াবেটিস এবং ৬ শতাংশ লোকের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়। এই ১০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীর ৩০-৪০ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপের ২০ শতাংশ এবং ৬ শতাংশ রোগী যাঁদের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়, তাঁরা সবাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। অথচ প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী জানেনই না যে তাঁদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ অথবা প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়। ফলে তাঁরা চিকিৎসকের শরণাপন্নও হন না। এই রোগীরাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভুগে ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণভাবে কিডনি বিনষ্ট করেন।

 

প্রশ্ন : কেউ কি উত্তরাধিকার সূত্রে কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারে?

হরুন আর রশিদ : অনেক সময় বংশগত কারণে বা পরিবারের কারো কিডনি রোগ থাকলে সে ক্ষেত্রে অন্য কারো কিডনি রোগ হতে পারে। তবে একক জেনেটিক কারণে সহজে হয় না। কিডনি রোগের সঙ্গে অনেক কারণ জড়িত। উত্তরাধিকার সূত্রে কিডনি রোগের প্রধান কারণ পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ, যা ওষুধের মাধ্যমে নিরাময় হতে পারে।

 

প্রশ্ন : কারো কিডনি রোগ হয়েছে কি না—এটা বোঝার উপায় কী?

হারুন আর রশিদ : দুঃখজনক সত্য হলো—কিডনি রোগের তেমন কোনো উপসর্গ নেই। যখন উপসর্গ প্রকাশ পায়, তখন দেখা যায়, ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ বা তারও বেশি পরিমাণ কিডনি বিকল হয়ে গেছে। তবে কিছু উপসর্গ হলো : প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, চা ও কফির রঙের মতো প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া, চোখের পাতার নিচ ফুলে যাওয়া, পায়ে ও পেটে পানি আসা, সারা শরীরে চুলকানি, রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া অথবা হঠাৎ কমে যাওয়া, রক্তস্বল্পতা দেখা দেওয়া, হঠাৎ করে কিডনির পেছনের দিকে ব্যথা অনুভূত হওয়া ইত্যাদি।

 

প্রশ্ন : কিডনি রোগ কি নিরাময়যোগ্য?

হারুন আর রশিদ : বেশির ভাগ কিডনি রোগই নিরাময়যোগ্য। জন্মগত কিডনির জটিলতা শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা যায়। পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, মশার কামড়ে আকস্মিক কিডনি রোগ এবং টনসিল ও খোসপাঁচড়ার মাধ্যমে কিডনি রোগ হলে তা-ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে, তা যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 

প্রশ্ন : কিডনি রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে কী কী করা উচিত?

হারুন আর রশিদ : সবাইকে সচেতন হতে হবে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বা ৫০ বছরের ওপরে লোকের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক, তার রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপ করা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হচ্ছে কি না তা জানা এবং ডায়াবেটিস আছে কি না তা নিরূপণ করা প্রয়োজন। যদি কারো ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তার প্রস্রাবে অ্যালবুমিন ও মাইক্রো অ্যালবুমিন যাচ্ছে কি না এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক কি না তা অন্তত বছরে একবার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। 

এ ছাড়া জন্মের পর থেকে শিশুদের খাবারে পরিবর্তন আনতে হবে। বাসি, পচা বা খোলামেলা খাবার, ফাস্ট ফুড ও সফট ড্রিংকস পরিহার করাই শ্রেয়। প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান, সবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শিশুরা যেন মুটিয়ে না যায়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত চিনি ও লবণজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চা, খেলাধুলা, দৌড়ানো ও হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

এ ছাড়াও পরিবেশের সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সম্পর্ক। বাতাসে সিসার পরিমাণ বেশি থাকলে, পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি হলে, শরীরে মার্কারি প্রবেশ করলে, সিগারেটের ধোঁয়া নাকেমুখে গেলে শিশুদের ক্রমান্বয়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগসহ ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই রোগ হওয়ার আগে সতর্কতামূলক বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং কারো কিডনি রোগ হয়ে গেলে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করা—দুটিই জরুরি।

 

প্রশ্ন : কিডনি রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা কী?

হারুন আর রশিদ : আমরা বলি, কারো কিডনি রোগ হোক বা না হোক, বয়স চল্লিশের ওপরে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের বছরে একবার হলেও রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা,  প্রস্রাব পরীক্ষা (ইউরিন আর/ই), সিরাম ক্রিয়েটিনিন, কিডনির ছাঁকনির কার্যকারিতা ইত্যাদি পরীক্ষা করা উচিত। সম্ভব হলে আলট্রাসনোগ্রাম করে কিডনির পরিধি বা আকার পরিবর্তন হয়েছে কি না, সিস্ট বা স্টোন রয়েছে কি না, তা দেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

প্রশ্ন : কিডনির পাথুরি রোগ কেন হয়? এটা প্রতিরোধের উপায় কী?

হারুন আর রশিদ : শরীরে ক্যালসিয়াম, ফসফেট, ইউরিক এসিড প্রভৃতির সমন্বয়ে কিডনিতে পাথর তৈরি হয়। দৈনন্দিন খাবারে ক্যালসিয়াম, ফসফেট, ইউরিক এসিড, সিস্টিনসহ নানা উপাদান থাকে। এগুলো কিডনির মাধ্যমে পুরোপুরি মেটাবোলাইজ বা বিপাক হয় না। কিছু কিছু মানুষের শরীরে এ ধরনের খনিজ পদার্থগুলো কিডনি হয়ে  প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়। অনেকের শরীরে বেশি পরিমাণ ইউরিক এসিড জমা হয়, অনেক ক্ষেত্রে মেটাবলিক অ্যাবনরমালিটিজের দরুন সিস্টিন এবং অকজালেট রক্তে জমা থাকে। ফলে এই উপাদানগুলো কিডনি দ্বারা রক্ত পরিশুদ্ধিত হওয়ার সময় কিডনি টিবইউলে ক্রিস্টাল তৈরি হয় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্রিস্টাল ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন পাথর তৈরিতে সাহায্য করে। যাদের পানি খাওয়ার প্রবণতা একটু কম, তাদের এসব পদার্থের একটি ক্রিস্টিলাইজেশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কিডনির পাথর প্রতিরোধের জন্য দৈনিক কমপক্ষে দু-তিন লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করা, নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করা, ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার কম খাওয়া, ইউরিক এসিড, অক্সালেট ও সিস্টিন বেশি রয়েছে এমন খাবারগুলো পরিহার করা, উচ্চ আমিষ, উচ্চ সোডিয়াম এবং উচ্চ চিনিযুক্ত খাবার কম গ্রহণ করা উচিত।

 

প্রশ্ন : শিশুদের কিডনি রোগের প্রবণতা বাড়ছে। এর কারণ কী?

হারুন আর রশিদ : ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিবছর দেশে অর্ধলাখেরও বেশি শিশু কিডনি রোগে আক্রান্ত  হচ্ছে, যাদের বেশির ভাগের বয়স পাঁচ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দিলে শিশুদের বেশির ভাগ কিডনি রোগই ভালো হয়ে যায়।

এ ছাড়া জন্মগত ত্রুটি ও বংশানুক্রমিক কিডনি রোগ বড়দের চেয়ে বেশি। ফলে কিডনি রোগের প্রবণতা কিছুটা বাড়ছে। তবে সুখবর হচ্ছে, ওষুধের মাধ্যমে শিশুদের সংক্রমণ ও অসংক্রমণ দুই ধরনের কিডনি রোগ সঠিকভাবে চিকিৎসা দিলে ভালো হয়ে যায়। জন্মগত ত্রুটি সবটাই শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। বংশানুক্রমিক কিডনি রোগ হলে পুরো নিরাময় সম্ভব হয় না। 

 

প্রশ্ন : একটি কিডনি দিয়ে কি বেঁচে থাকা সম্ভব?  সংযোজনের জন্য অন্যকে কিডনি দান করলে দাতার পরবর্তী জীবনে কি কোনো সমস্যা দেখা দেয়?

হারুন আর রশিদ : কোনো ব্যক্তি একটিমাত্র কিডনির সাহায্যেই সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারেন। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপনে কোনো সমস্যা হয় না। উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, কিডনি সংযোজনের পর কিডনিদাতা, যারা একটি কিডনি নিকটাত্মীয়কে দান করেছেন, ২৫-৩০ বছর পর তাঁদের কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাঁদের কিডনি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ ও সক্রিয় রয়েছে। কিডনি দেওয়ার আগে তাঁর দুটি কিডনির যে কার্যকারিতা ছিল, এখন একটি কিডনি থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকারিতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এতেই বোঝা যায়, একজন সুস্থ ব্যক্তির জন্য একটি সুস্থ কিডনিই যথেষ্ট। তাঁরা আগের মতো সব ধরনের কাজকর্ম, খেলাধুলা করতে পারেন। সন্তান ধারণেও কোনো অসুবিধা হয় না।

 

প্রশ্ন : কেউ চাইলেই কি কিডনি দান করতে পারেন?

হারুন আর রশিদ : না। ইচ্ছা করলেই একজন আরেকজনকে অঙ্গ দান করতে পারেন না। কিডনিদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের রক্তের টিস্যু টাইপিংসহ আরো কিছু বিষয়ে যথেষ্ট মিল থাকতে হবে। বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৬৫ বছর। দাতা বা উভয়ের হেপাটাইটিস বি এবং সি, এইচআইভি ইনফেকশন, শরীরে জীবাণুজনিত ইনফেকশন থাকা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কিডনিতে অন্য কোনো প্রকার অসুখ থাকা চলবে না। দুটি কিডনিই সুস্থ থাকতে হবে এবং তাকে স্বেচ্ছায় কিডনি দান করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এ ছাড়া যক্ষ্মা, হৃদরোগ, লিভার ডিজিজ ইত্যাদি ধরা পড়লে তা উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করে তবেই কিডনি সংযোজন করা যাবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, যিনি কিডনি দান করবেন, তাঁকে অবশ্যই রোগীর রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয় হতে হবে। সুস্থ, স্বাভাবিক, স্বেচ্ছায় শুধু মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে কিডনি দান করতে পারবেন। তাঁদের মধ্যে কিডনি না পাওয়া গেলে আপন চাচা, মামা, ফুফু অথবা খালা কিডনি দিতে পারবেন। ‘অঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯’-এ বলা আছে, কিডনিদাতার ওপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ, কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করা, পত্রিকায় কিংবা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 

প্রশ্ন : কিডনি রোগের বিভিন্ন স্তর বা স্টেজ রয়েছে। কোন স্টেজ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

হারুন আর রশিদ : দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের পাঁচটি স্তর থাকে। প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরে রোগীর কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক থাকে। তখন রোগ শনাক্ত করা গেলে সম্পূর্ণ নিরাময় করা যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরে কিডনির কার্যকারিতা কমতে থাকে। বেশির ভাগ রোগ এই স্তরে ধরা পড়ে। এদের সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনির কার্যকারিতা বেশ কয়েক বছর ধরে রাখা সম্ভব, তবে পুরো নিরাময় সম্ভব নয়। কিডনির কার্যকারিতা ৮৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেলে সেটা পঞ্চম স্তর। অর্থাৎ শেষ পর্যায়। রোগীকে তখন ডায়ালিসিস অথবা কিডনি সংযোজন করার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। রোগী যখন পঞ্চম স্টেজে চলে যায়, তখন ডায়ালিসিসের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। মেশিনের সাহায্যে করা ডায়ালিসিস হলো হেমো ডায়ালিসিস, যা সপ্তাহে দু-তিন দিন চার-পাঁচ ঘণ্টা করে করা হয়। এর জন্য ডায়ালিসিস করার এক থেকে তিন মাস আগে হাতের কবজির ওপর অথবা কনুইয়ের ওপর এভি ফিস্টুলা করা হয়। আর যদি রোগী নিজের ঘরে ডায়ালিসিস করতে চায়, সেটিকে বলে সিএপিডি বা হোম ডায়ালিসিস। এতে শরীরের পেরিটোনিয়াম ব্যবহার করা হয়।

 

প্রশ্ন : দেশ কিডনি রোগের চিকিৎসায় কি স্বয়ংসম্পূর্ণ? রোগীরা বিদেশে যায় কেন?

হারুন আর রশিদ : কিডনি রোগের উন্নত চিকিৎসায় আমরা সার্ক দেশগুলোর সমতুল্য। রোগ নির্ণয়, সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ল্যাবরেটরি টেস্ট, বায়োপসি, ইমিনোফ্লোরোসেন্স, সিটিস্ক্যানসহ সব কিছু আমাদের দেশে করা সম্ভব। কিডনি অকেজো রোগীর হেমোডায়ালিসিস, সিএপিডি, কিডনি সংযোজন—সবই আমাদের দেশে হচ্ছে। আমরা পিছিয়ে আছি একটা জায়গায়, আর সেটা হলো মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে কিডনি সংযোজন (মরণোত্তর) এখনো চালু করতে পারিনি। ব্ল্যাড গ্রুপ ও টিস্যু মিল না থাকলে কিডনি সংযোজন করতে সক্ষম হইনি, যা অনেক উন্নত দেশে হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে যে ‘অর্গান অ্যাক্ট ল’ তৈরি হয়েছে, তাতে আমরা আশাবাদী যে অচিরেই মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে রোগীর ট্রান্সপ্লান্ট করতে সক্ষম হব। তবে মেডিক্যাল সায়েন্সের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটছে। এ জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডাক্তারদের বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তা না হলে আমরা আরো পিছিয়ে পড়ব। আর বিদেশে চিকিৎসা করা নির্ভর করবে রোগী দেখার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু আন্তরিক, রোগীরা কতটুকু আমাদের ওপর নির্ভরশীল বা যত্নবান।

পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশ মেডিক্যাল ট্যুরিজম এগিয়ে নিতে বেশ কাজ করছে। বাংলাদেশের রোগীদের বিদেশে যেতে নানা প্রলোভনও দেওয়া হচ্ছে। তারা রোগীর ভিসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করছে। এতেই রোগীরা বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা আনলে দেশেই সব ধরনের চিকিৎসা করাতে মানুষ আস্থা পাবে। এ জন্য সরকারকে ভূমিকা পালন করতে হবে। 

সাক্ষাৎকার : আতাউর রহমান কাবুল



মন্তব্য