kalerkantho


শীতে বয়স্কদের অসুখ

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতে বয়স্কদের অসুখ

রোগ থেকে বাঁচতে শীতকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন

অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর শীতের তীব্রতা বেশি। এ সময় সবারই কমবেশি শীতকালীন রোগব্যাধি হলেও বয়স্কদের সমস্যা কিছুটা বাড়তে পারে।  শুধু দৈহিক নয়, মানসিকভাবেও প্রভাব বিস্তার করে শীত। তাই বয়স্ক মানুষদের বাড়তি যত্ন-আত্তি ও সতর্কতার প্রয়োজন। পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ

 

সর্দি, কাশি, ফ্লু, গলাব্যথা

শীতে সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জ সাধারণ সমস্যা। তবে বয়স্করা ইনফ্লুয়েঞ্জায় ভোগেন বেশি। এই ভাইরাস খুবই ছোঁয়াচে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঠাণ্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ফ্লু ভাইরাস আরো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফ্লু থেকে হতে পারে নিউমোনিয়া, যা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ জন্য ফ্লুতে আক্রান্ত হলে বিশ্রামের বিকল্প নেই। বিশেষ করে হাত, পা, গলা, বুক গরম কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

গলাব্যথা হলে হালকা উষ্ণ পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গেল করলে অথবা আদা-চায়ের মতো গরম পানীয় বা স্যুপ মাঝে মাঝে পান করলে কিছুটা আরাম মিলবে। শুকনো, বিরক্তিকর কাশি ঠেকাতে মধু মেশানো গরম দুধ বিশেষ কাজ দেয়।

 

হাঁপানি বা অ্যাজমা

হাঁপানি বা অ্যাজমা, শ্বাসনালির প্রদাহ ইত্যাদির তীব্রতা শীতে বেশি হয়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় প্রবীণদের মারা যাওয়ার ঘটনাও বেশি ঘটে। তা ছাড়া শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়ায় বয়স্কদের সহজেই অ্যাজমা দেখা দেয়।

খুব ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অ্যাজমার রোগীদের বাইরে না যাওয়াই শ্রেয়। প্রচুর হালকা গরম পানি পান করুন। ইনহেলার নিয়মিত নিতে হতে পারে। কোনো কারণে অ্যাজমা পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি হলে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে অক্সিজেন, নেবুলাইজার প্রয়োগসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা দিন।

 

আর্থ্রাইটিস বা বাতব্যথা

আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা শীতে বাড়ে বেশি। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা এনকাইলোজিং স্পন্ডিওলাইটিস, স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস, রি-অ্যাকটিভ আর্থ্রাইটিস, সোরিয়াসিটিস, অস্টিও-আর্থ্রাইটিস রোগীদের শীতে চলাফেরা বা মুভমেন্ট কম হয় বলে ব্যথার প্রকোপ বেড়ে যায়। হালকা চলাফেরায় বরং ব্যথা কম হয়। তা ছাড়া তীব্র ঠাণ্ডায় বাতের কিছু রোগীর হাত-পা নীল (রেনোড ফেনোমেনা) হয়ে যেতে পারে। এ জন্য হালকা গরম ছেঁক দেওয়া, মোজা পরিধান করা, যতটুকু সম্ভব ঘরেই হালকা মুভমেন্ট করা ও চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। প্রয়োজনে গরম পানি ব্যবহার বা তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া উচিত।

 

হার্ট অ্যাটাক

শীতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে মারা যাওয়ার ঘটনা বয়স্কদেরই বেশি ঘটে। এ সময় দেহের তাপমাত্রা বজায় রাখতে হৃদযন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হয়। ফলে ধমনি দৃঢ় হয়ে হৃপিণ্ডে অক্সিজেন সরবরাহ কমে আসে। শীতল পরিবেশে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় বলে হৃদযন্ত্রে বাড়তি চাপ পড়ে রক্ত জমাট বাঁধার ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দেখা দেয়। এই সময় সাধারণত ভোরের দিকে হার্ট অ্যাটাক হয়।

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে ঘরের ভেতরটা উষ্ণ রাখতে হবে। বয়স্কদের ঘরে রুমহিটার রাখলে ভালো। আবার হালকা হাঁটাচলার মধ্যে থাকলে উপকার মেলে। শরীর গরম রাখতে সরিষার তেল দিয়ে শরীর ম্যাসাজ করা যেতে পারে। এ ছাড়া সব সময় গরম কাপড়, মাফলার বা শীতের টুপিতে কান-মাথা ঢেকে রাখতে হবে। আগে থেকেই হার্টের অসুখ থাকলে নিয়ম করে ওষুধ খেতে ও সতর্ক হতে হবে। হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে এমন মনে হলে দ্রুত হাসপাতালে নিন।

 

মানসিক সমস্যা

শীতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রবীণরা আরো বেশি মানসিক সমস্যায় ভোগেন এ সময়। তাঁরা সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করেন। ট্রমা ও বিষণ্নতা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দেখা দেয় অন্যান্য স্বাস্থ্যগত জটিলতা। তাই

এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের বেশি করে সময় দেওয়া উচিত। বিশেষ করে বাসার প্রবীণ সদস্যটিকে নিয়ে একসঙ্গে টেলিভিশন দেখা বা গল্প করার কাজটি করা উচিত। তাঁদের একা ফেলে রাখা উচিত না।

 

হাইপোথার্মিয়া

তীব্র শীতের একটি মারাত্মক সমস্যা হাইপোথার্মিয়া। এতে শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে গিয়ে রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। এটা বয়স্কদের বেশি হয়। তাই যেকোনোভাবেই হোক শরীরের সঠিক  তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে কেউ পড়লে রোগীকে দ্রুত গরম পরিবেশে এনে গরম কাপড় পরিয়ে গরম পানি পান করাতে হবে।

 

শুষ্কতা, খুশকি, চর্মরোগ

চামড়ার শুষ্কতা, চুলকানি, হাত-পা ফেটে যাওয়া, মুখে-জিহ্বায় ঘা ছাড়াও নানা ধরনের চর্মরোগ বা খোসপাঁচড়া বেশি দেখা দেয় শীতে। আর্দ্রতার অভাবে ঠোঁট ফেটে যাওয়া বা চুলে খুশকিও দেখা দেয়। অপরিচ্ছন্ন বা ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাসকারী মানুষদের এসব বেশি হয়।  

চামড়ার শুষ্কতা ঠেকাতে ত্বকে ময়েশ্চার ক্রিম মাখতে হবে, যা মূলত ত্বক ও আবহাওয়ার মধ্যে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া অ্যান্টি-ড্যানড্রফ শ্যাম্পু ব্যবহার ও হালকা উষ্ণ পানিতে গোসলের পর লোশন লাগালে সতেজ ভাব আসবে। চুলে খুশকির প্রকোপ কমাতে ভালো মানের তেল ব্যবহার করতে হবে।

 

আরো কিছু পরামর্শ

►      শরীর গরম রাখতে সুতি কাপড়ের গরম পোশাক পরুন। বিশেষ করে মাথা, হাত ও পা ঢেকে রাখার চেষ্টা করুন। রাতে ঘুমানোর সময় শরীর থেকে কাপড় যেন সরে না যায়, সেদিকে লক্ষ রাখুন।

►      দৈনন্দিন খাবার, অজু-গোসলের কাজে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।

►      উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার খান। ঠাণ্ডা খাবার পরিহার করে গরম খাবার খান। 

►      রুমহিটার ব্যবহারে চামড়া শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে রুমহিটার চলাকালে ঘরের কোথাও বালতি বা গামলায় একটু পানি রেখে দিতে পারেন, এতে ঘরে জলীয় বাষ্পের শূন্যতা রোধ হবে।

►      ঘরের মধ্যে হালকা হাঁটাহাঁটি করুন। হাত-পা হালকা নাড়াচাড়া করুন। তবে হার্টের অসুখ, অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসনালির প্রদাহ থাকলে খুব সকালে হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করবেন না।

►      ত্বকের সুরক্ষায় ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন, অলিভ অয়েল, সরিষার তেল প্রভৃতি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

►      জ্বর, কাশি, কফ ও শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো রোগ হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের লক্ষণ দেখামাত্রই রোগীকে দ্রুত সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে নিন। 

 

 অনুলিখন : সাকিব সিকান্দার



মন্তব্য