kalerkantho

চোখে যখন ছানি

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



চোখে যখন ছানি

সময়মতো ছানির অপারেশন না করালে সম্পূর্ণ অন্ধ হতে পারে চোখ

চোখে ছানি হওয়ার কারণে দেখতে সমস্যা হয়। শুধু বয়স বাড়ার কারণেই নয়, বরং জন্মগতভাবেও যে কেউ ছানিতে আক্রান্ত হতে পারে।

যথাযথ চিকিৎসা নিলে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। লিখেছেন বাংলাদেশ আই হাসপাতালের ফ্যাকো ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম নজরুল ইসলাম

 

ক্যামেরার লেন্সের সাহায্যে দূরের কোনো দৃশ্য যেমন ফোকাস হয়, তেমনি চোখের ভেতরে থাকা লেন্সও দৃষ্টিকে ফোকাস করে। ফোকাসটা রেটিনায় পড়ে। এই লেন্সের কোনো অংশ যদি কোনো কারণে ঘোলা হয়ে যায়, তাহলে দেখতে সমস্যা হয়। এই রোগটিই চোখের ছানি। সাধারণ মানুষ একে চোখে পর্দা পড়া বলেও। ইংরেজিতে ক্যাটার‌্যাক্ট বলা হয়।

 

কারণ

যেকোনো বয়সেই ছানি হতে পারে, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছানি বার্ধক্যজনিত ব্যাধি। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের চোখে ছানি পড়ে বেশি।

আবার সেকেন্ডারি অনেক কারণে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের ছানি হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। তাঁদের ৪০ বা ৫০ বছরের মধ্যেই ছানি পড়তে পারে।

গর্ভকালীন মায়ের হাম (জার্মান মিজেলস বা রুবেলা) হলে, মা অপুষ্টিতে ভুগলে বা ডায়াবেটিস হলে, টোক্সোপ্লাজমা জাতীয় ভাইরাস আক্রমণ করলে বা শিশুর গঠনপ্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকলে কনজেনিটাল ক্যাটার‌্যাক্ট বা জন্মগত ছানি হতে পারে।

এ ছাড়া আঘাতজনিত কারণ, হাই মায়োপিয়া বা অতিমাত্রায় নিকট দৃষ্টিজনিত সমস্যা, চর্মরোগ, হরমোনাল কারণ, মেটাবলিক সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে চোখে ছানি পড়ে। চোখের প্রদাহ, অ্যালার্জি, হাঁপানি কিংবা যেকোনো কারণে ব্যথানাশক স্টেরয়েড জাতীয় কিছু ওষুধ, ড্রপ ব্যবহার, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি ইত্যাদির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছানি হয়।

 

লক্ষণ

চোখে ছানি পড়লে স্বাভাবিক দৃষ্টির সমস্যা হয়। সব কিছুই আস্তে আস্তে ঘোলা বা অস্বচ্ছ দেখা যায়।  

 

চিকিৎসা

পূর্ণবয়স্কদের প্রায় ৮০ শতাংশ অন্ধত্বের কারণ এই ছানি। এজন্য চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া মাত্রই চিকিৎসা শুরু করা উচিত। প্রথমে চশমা ব্যবহারের পর দৃষ্টির সমস্যার সমাধান না হলে, তখন অপারেশন লাগতে পারে। লেন্স প্রতিস্থাপন বা অপারেশন ছাড়া তেমন চিকিৎসা নেই। নবজাতকের ছানির ক্ষেত্রেও অপারেশন লাগতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ হতে পারে। ছানি অপারেশন মূলত চার ধরনের হয়। যেমন—      

ইসিসিই : এ ক্ষেত্রে চোখের স্বচ্ছ কর্নিয়া ও সাদা অংশের মাঝ বরাবর কেটে ছানি বের করে আনা হয়। তারপর কৃত্রিম লেন্স সংযোজন করা হয়। প্রায় ১০ বছর আগে এ ধরনের অপারেশন বেশি হলেও চিকিৎসাশাস্ত্রের আধুনিকায়নের ফলে এখন বাংলাদেশে এই অপারেশন তেমন একটা হয় না।

এসআইসিএস : এই পদ্ধতিতে চোখের সাদা অংশ বিশেষভাবে কেটে সেই পথে ছানি বের করে আনা হয়। এরপর কৃত্রিম লেন্স সংযোজন করা হয়। কাটা স্থানটি খুব ছোট হওয়ায় এবং কাটার সময় বিশেষভাবে ভাল্বের মতো ব্যবস্থা রাখা হয় বলে কাটা স্থানে সেলাই দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যেখানে ফ্যাকো সার্জারির সুবিধা নেই, সেখানে এসআইসিএসের প্রচলন এখনো আছে। এতে খরচ তুলনামুলক কম।  

ফ্যাকো সার্জারি : এ পদ্ধতিকে আধুনিক চিকিৎসা বলা যায়। ফ্যাকো মেশিনের সাহায্যে খুব ছোট ছিদ্র করে আল্ট্রাসনিক ওয়েভের মাধ্যমে লেন্সকে গলিয়ে বের করে সেখানে নতুন একটি লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর কৃত্রিম লেন্স সংযোজন করা হয়। এই পদ্ধতির সুবিধা হলো, চোখে সেলাই দেওয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। সার্জারির পরপরই রোগী বাড়ি চলে যেতে পারে, দ্রুত আরোগ্য লাভ করে এবং অপারেশন পরবর্তী জটিলতা হওয়ার আশঙ্কাও কম। অত্যন্ত দামি ফ্যাকো মেশিন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা প্রয়োজন বিধায় এই অপারেশন কিছুটা ব্যয়বহুল।

লেজার ফ্যাকো সার্জারি : চোখের ছানির সর্বাধুনিক সার্জারি এটি। অত্যন্ত ব্যয়বহুল ফেমটো লেজারের সাহায্যে এই সার্জারি করা হয়। চোখকে ফেমটো লেজার মেশিনে সংযোগ করে লেজার রশ্মি দিয়ে ছানির ওপরের অংশ গোল করে নিখুঁতভাবে কেটে ছানিকে ৮ বা ১৬ টুকরা করা হয়। এ চিকিৎসা প্রচলিত ফ্যাকো সাজারির চেয়েও সঠিক, যার গুণগত মানও অনেক ভালো।

 

কোন লেন্সটি ভালো?

ছানি অপারেশনের জন্য কোন লেন্সটি ভালো—এটা ছানির রোগীদের সচরাচর জিজ্ঞাসা। অপারেশন সফল হলে এবং চোখের ভেতরে কোনো রোগ না থাকলে সব লেন্স দিয়েই দেখা যায়। তবে লেন্সের গুণগত পার্থক্যের কারণে দেখারও গুণগত তারতম্য ঘটে। সাধারণত শক্ত ও নরম ভাঁজ করা—এই  দুই ধরনের লেন্স হয়। ভাঁজ করা লেন্সের সুবিধা হচ্ছে চোখের পাশে যে ছোট্ট ছিদ্র করে ফ্যাকো সার্জারি করা হয়, ওই একই ছিদ্র দিয়ে লেন্সটি প্রবেশ করিয়ে বসানো যায়। এসব লেন্স মোনোফোকাল, যা লাগানোর পর দূরের দৃষ্টি ভালো হয়। অবশ্য কাছে দেখার জন্য চশমা ব্যবহার করতে হয়। কেউ যদি বিনা চশমায় পড়াশোনা করতে চায়, তবে কৃত্রিম লেন্সের পাওয়ার ২-৩ ডায়াপ্টার বাড়িয়ে দিলে খালি চোখেই দেখা সম্ভব। তবে দূরে দেখার জন্য ২-৩ ডায়াপ্টার মাইনাস পাওয়ারের চশমা লাগে।

টোরিক ও মাল্টিফোকাল কৃত্রিম লেন্স হচ্ছে সবচেয়ে আধুনিক লেন্স। টোরিক লেন্স লাগালে চোখের অ্যাঙ্গেল পাওয়ার কারেকশন করা সম্ভব। মাল্টিফোকাল লেন্স লাগালে বেশির ভাগ (৭০-৮০ শতাংশ) ক্ষেত্রে চশমা ছাড়াই কাছে এবং দূরে দেখা যায়। ২০-৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে খুব ছোট লেখা দেখার জন্য চশমার প্রয়োজন হতে পারে। মাল্টিফোকাল লেন্সের মূল্য অনেক বেশি। চোখের ভেতরে কোনো রোগ থাকলে এটি না দেওয়াই ভালো।

 

প্রস্তুতি

এক সময় ছানি অপারেশনের জন্য ইনজেকশন দিয়ে চোখকে অবশ করে নিতে হতো। এখন শুধু চোখে ড্রপ বা জেল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে অস্ত্রোপচার করা যায়। কোনো ব্যান্ডেজও লাগে না। রোগী খালি চোখে বাসায় চলে যায়; শুধু একটি কালো চশমা পরতে হয়।

ছানির অপারেশনের দু-এক দিন আগে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ওরাল অ্যান্টিবায়োটিক মেডিসিন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কালচারাল সেনসিটিভিটি পরীক্ষাও করতে হয় প্রয়োজনে। এ ছাড়া সার্জারির আগে আরো কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। যেমন—চোখে অ্যালার্জির সমস্যা আছে কি না, ইনফেকশন, চোখের কর্নিয়ার সেল ইত্যাদির অবস্থা দেখে নেওয়া হয়। রোগীর ডায়াবেটিস থাকলে সেটা কতটা নিয়ন্ত্রণে আছে সেটি পরীক্ষা করে নিতে হয়। ইসিজি, এক্স-রে ইত্যাদি টেস্ট সহ আইওএল পাওয়ারের বায়োমেট্রি পরীক্ষা করা হতে পারে।

 

সতর্কতা

►    ছানি অপারেশনের পর সাত দিন স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে গেলেও ঘরের বাইরে অফিস, বাজার, খেলার মাঠ বা যেকোনো পাবলিক প্লেসে না যাওয়াই নিরাপদ।

►    গৃহিণীদের সাত দিন পর্যন্ত রান্নার কাজে, আগুনের সংস্পর্শে না আসাই ভালো।

►    চোখে কোনোভাবেই যেন ধুলাবালি ও পানি প্রবেশ না করে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

►    সার্জারির আগে ও পরে স্বাভাবিক খাবার খাওয়া যেতে পারে। এতে তেমন সমস্যা নেই।

দেশের বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রায় বিনা মূল্যে কিংবা অত্যন্ত স্বল্প খরচে ছানির অপারেশন হয়। বেসরকারি হাসপাতাল ভেদে খরচের তারতম্য রয়েছে।

অনুলিখন : ফারিয়া মৌ


মন্তব্য