kalerkantho


বিশ্ব হার্ট দিবস
২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

‘কায়িক পরিশ্রম হার্টের জন্য ভালো’

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘কায়িক পরিশ্রম হার্টের জন্য ভালো’

হৃদেরাগ নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন। কিন্তু সব প্রশ্নের বিজ্ঞানসম্মত সঠিক উত্তর মেলে না।

বিশ্ব হার্ট দিবসকে সামনে রেখে হৃদেরাগ বিষয়ক কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হৃদেরাগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী

 

প্রশ্ন : হৃদেরাগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয় এমন মানুষেরা কিভাবে হৃদ্যন্ত্রের যত্ন নিতে পারে?

ডা. ওয়াদুদ : হৃদেরাগের আসল কারণ হলো—উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তে কোলেস্টেরল লেভেল বেশি থাকা, স্থূলতা, বংশগত ইত্যাদি। এখানে শুধু বংশগত কারণ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে আমাদের নিজেদের সতর্ক থাকার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে সচেতন হলেই হৃদেরাগ প্রতিরোধ করা যায়। এ জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

 

প্রশ্ন : সুস্থ মানুষ প্রায়ই হৃদেরাগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনটা আসলে কেন ঘটছে?

ডা. ওয়াদুদ : কারো হয়তো ফ্যামিলি হিস্ট্রি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ আছে অথচ সে নিজেও তা জানে না বা কোনো দিন পরীক্ষা করেও দেখেনি। যখন সে আক্রান্ত হচ্ছে, তখন না জানার কারণে আমাদের কাছে হঠাৎ সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হওয়া মনে হচ্ছে। কারো বয়স ৪০ বছর পার হলেই তার বছরে অন্তত একবার ব্লাড সুগার, কোলেস্টেরল লেভেল পরীক্ষাসহ ইসিজি করে হার্টের অবস্থা দেখা উচিত।

 

প্রশ্ন : কেউ উত্তরাধিকারসূত্রে হৃদেরাগে আক্রান্ত হতে পারে?

ডা. ওয়াদুদ : বংশগত কারণে কারো হৃদেরাগ হতে পারে।

তবে একক জেনেটিক কারণে হৃদেরাগ সহজে হয় না। হৃদেরাগের সঙ্গে অনেকগুলো ফ্যাক্টর জড়িত। সব কিছুর সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্কও রয়েছে।

 

প্রশ্ন : জগিং না হাঁটা—কোন ব্যায়ামটি ভালো?

ডা. ওয়াদুদ : দুটিই ভালো। তবে শারীরিক বা কায়িক পরিশ্রম করা উচিত, যাতে শরীর থেকে অন্তত ঘাম বের হয়। মডারেট এক্সারসাইজ সব সময় ভালো, হেভি এক্সারসাইজ কখনোই ভালো না। সব কিছুর মাত্রা রেখে করা উচিত। দিনে ৩০-৪০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যায়াম করা ভালো। সাঁতার কাটাও ভালো ব্যায়াম।

 

প্রশ্ন : নিম্ন রক্তচাপে যাঁরা ভোগেন, তাঁরা কি হৃদেরাগে আক্রান্ত হতে পারেন?

ডা. ওয়াদুদ : নিম্ন রক্তচাপে ভোগা মানুষদের হৃদেরাগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম। তবে মূল বিষয় হলো, তার ডায়াবেটিস আছে কি না, ধূমপান করেন কি না বা কোলেস্টেরল লেভেল বেশি কি না—এসব বিষয় আগে দেখা উচিত।

 

প্রশ্ন : কোলেস্টেরলের মাত্রা কি অল্প বয়স থেকেই বাড়তে থাকে? কখন এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত?

ডা. ওয়াদুদ : সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই মানুষের দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিবর্তন হতে শুরু করে। আমরা তাই ৪০ বছরের পর লিপিড প্রফাইল নিয়মিত চেক করার পরামর্শ দিই। আর যাদের বংশগত হৃদেরাগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর পার হলেই বছরে একবার লিপিড প্রফাইল করা উচিত। ।

 

প্রশ্ন : অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস কিভাবে হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে?

ডা. ওয়াদুদ : অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে ভাজাপোড়া, জাংক ফুড বেশি খাওয়া হয়ে যায়। এতে হেলথ এনভায়রনমেন্টটা আসলে নষ্ট হয়। তাই হৃদেরাগ থেকে বাঁচতেই শুধু নয়, বরং শারীরিক সুস্থতায় নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস জরুরি।

 

প্রশ্ন : ওষুধ ছাড়া কি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

ডা. ওয়াদুদ : অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও ব্যায়াম—শুধু এ দুটি মাধ্যম দিয়ে সাকসেসফুললি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করেছেন অনেকে। মনে রাখা দরকার, খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাটজাতীয় খাবার কমাতে হবে; কিন্তু প্রোটিন ঠিক রাখতে হবে।

 

প্রশ্ন : হৃদ্যন্ত্রের জন্য সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপ খাবার কোনটি?

ডা. ওয়াদুদ : মেডিসিনে একটি কথা আছে, প্রতিটি ওষুধই ক্ষতিকর হতে পারে, যদি সেটি অনুপযুক্ত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। খাদ্যের দোষ নেই, পরিমাণটা উপযুক্ত কি না তা-ই বিবেচ্য বিষয়। সপ্তাহে একটি বার্গার খেতেই পারি, তাই বলে প্রতিদিন তো খাওয়া ঠিক হবে না।

 

প্রশ্ন : রান্নার জন্য কোন তেল ভালো?

ডা. ওয়াদুদ : খাঁটি সরিষা ও সানফ্লাওয়ার তেল রান্নার জন্য ভালো। অলিভ অয়েলকে বেস্ট অয়েল বলা হলেও আমাদের দেশের খাঁটি সরিষার তেল কিন্তু বেশ ভালো।   রান্নার জন্য রাইস ব্রান অয়েলও ভালো। তবে এটা নিয়ে তেমন স্টাডি নেই। আবার পাম অয়েল মেশানো সয়াবিন তেল খাওয়া ঠিক নয়।

 

প্রশ্ন : নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা আছে?

ডা. ওয়াদুদ : খালি পেটে ব্লাড সুগার, লিপিড প্রফাইল, উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করে একটা ইসিজি করে নিলেই হয়। বয়স ৩০ পেরোনোর পর দুই বছরে একবার হলেও প্রত্যেকের উচিত এ পরীক্ষাগুলো করা।

 

প্রশ্ন : হার্ট অ্যাটাক হলে কেউ কি নিজে নিজে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারে? এসময় করণীয় কি?

ডা. ওয়াদুদ : সাধারণত চার ভাগের এক ভাগ মানুষ কোনো ধরনের পূর্বাপর ব্যথার উপসর্গ ছাড়াই হৃদেরাগে বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। এই চিত্রটা সারা পৃথিবীতে একই রকম। সব রোগীর টিপিক্যাল বুকে ব্যথা হয় না। তবে কেউ যদি বুঝতে পারেন যে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হতে যাচ্ছে, তখন বিলম্ব না করে ফার্মেসি থেকে অ্যাসপিরিন ৩০০ মি.গ্রা. ট্যাবলেট কিনে সরাসরি চিবিয়ে খেয়ে ফেলবেন। এই অ্যাসপিরিন হার্ট অ্যাটাকে ৩০ শতাংশ মৃত্যু কমাতে পারে। অন্যান্য অসুখ থাকলেও এটা সেবনে কোনো ক্ষতি নেই। এছাড়াও নাইট্রেট স্প্রে বা ট্যাবলেট জিহ্বার নিচে দিতে পারেন। এরপর গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট খেয়ে একটা ইসিজি করে হার্ট অ্যাটাকের মার্কার হিসেবে রক্তের ট্রপোনিনও দেখা উচিত।

 

প্রশ্ন : হৃদেরাগজনিত ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার মধ্যে পার্থক্য করা যায় কিভাবে?

ডা. ওয়াদুদ : বিশেষজ্ঞ ছাড়া এটা আসলে অন্য কারো পক্ষে বোঝা মুশকিল। এটা বুঝতে হলে হার্টের ইসিজি করে দেখতে হবে। তবে ইসিজি নরমাল মানেই যে হার্ট অ্যাটাক হয়নি—এমনটি মনে করা যাবে না। এটায় অনেকেই ভুল করেন। অথচ ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে প্রাথমিক ইসিজিতে হার্ট অ্যাটাকের প্রমান মেলে না। এ জন্য প্রয়োজনে কিছুক্ষন হাসপাতালে অবজারভেশনে থেকে আবার ইসিজি করাতে হবে।

 

প্রশ্ন : যুবকদের মধ্যে হৃদেরাগের সমস্যা বাড়ছে, এর কারণ কী?

ডা. ওয়াদুদ : আমার একটা অবজারভেশন হলো, ইয়াবা মোটরসাইকেল গোষ্ঠীদের হৃদরোগ বাড়ছে। অর্থাৎ যুবকদের মধ্যে একটা গ্রুপ আছে, যারা ইয়াবায় আসক্ত, তারা হৃদেরাগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার অনেকে মোটরসাইকেল নিয়ে সারা দিন খালি ছুটে বেড়ায়। তারা এত ব্যস্ত যে নিজের শরীরের দিকে তাকানোর পর্যন্ত সময় নেই! এরাও হৃদেরাগে আক্রান্ত হচ্ছে সতর্কতার অভাবে।

 

প্রশ্ন : রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রা (১২০/৮০) না থাকলেও কি কেউ পুরোপুরি সুস্থ থাকতে পারে?

ডা. ওয়াদুদ : রক্তচাপের স্বাভাবিক মার্কার হলো ১২০/৮০ মিমি মার্কারি। তবে রক্তচাপ ওপরেরটা ১০০ থেকে ১৩৯ পর্যন্ত থাকলেও নরমাল। আবার নিচেরটা ৬০ থেকে ৯০-এর নিচে থাকলে নরমাল। অর্থাৎ কারো রক্তচাপ যদি ১১০/৬০ বা ১৩৫/৮৫ থাকে, তবে সে স্বাভাবিক রক্তচাপে অবস্থান করছে ধরতে হবে।

 

প্রশ্ন : নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে করলে সন্তানের হৃদেরাগ হতে পারে—এটা কি সত্য?

ডা. ওয়াদুদ : এ ক্ষেত্রে জন্মগত হার্ট ডিজিজ হতে পারে। তবে হবেই যে এমন কোনো কথা নেই।

 

প্রশ্ন : বেশির ভাগ মানুষ অনিয়ন্ত্রিত রুটিন অনুসরণ করে। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করেন কেউ কেউ। এতে কি হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হয়? এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

ডা. ওয়াদুদ : যাঁরা রাত জেগে কাজ করেন, তাঁদের স্ট্রেস লেভেল বেশি। তাঁরা টেনশন করেন বেশি, মেজাজও খিটমিটে ধরনের হয়। অনেকে উচ্চ রক্তচাপেও ভোগে এবং ধূমপানও বেশি করেন। এদের মধ্যে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রয়েছে এবং রক্তে কোলেস্টেরল লেভেল বেশি, তাঁদের একটু সতর্ক থাকতে হবে।

 

প্রশ্ন : অ্যান্টি-হাইপারটেনসিভ ওষুধ গ্রহণ করলে অন্য কোনো জটিলতা তৈরি হয়?

ডা. ওয়াদুদ : প্রতিটি ওষুধেরই রি-অ্যাকশন আছে, সাইড ইফেক্ট আছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে মাত্রা জেনে সতর্কতার সঙ্গে যেকোনো ওষুধ সেবন করা উচিত।

 

প্রশ্ন : নিয়মিত হার্টের ওষুধ খেলে কি কিডনি রোগ বা অন্য সমস্যা হয়?

ডা. ওয়াদুদ : এটা একেবারেই ভুল ধারণা।

 

প্রশ্ন : অতিরিক্ত চা বা কফি পান করলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

ডা. ওয়াদুদ : অতিরিক্ত যেকোনো কিছুই ক্ষতিকর। সারা দিন তিন-চার কাপ চা বা কফি পান করা যেতে পারে—এতে হার্টের তেমন সমস্যা হবার কথা নয়।

 

প্রশ্ন : অ্যাজমা রোগীদের কি হৃদেরাগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি?

ডা. ওয়াদুদ : এটা নির্ভর করে রোগীর ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল লেভেল বেশি কি না তার ওপর। তবে যাঁরা আনকন্ট্রোল্ড অ্যাজমার রোগী অথবা যাঁরা নিয়মিত শ্বাসকষ্টে ভুগে থাকেন, তাঁদের শ্বাষরোগজনিত হৃদরোগ বা কর-পালমোনালে হতে পারে।

 

প্রশ্ন : রক্তে শ্বেতকণিকা ও হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে কি হৃদেরাগ হতে পারে?

ডা. ওয়াদুদ : রক্তের সঙ্গে হৃদেরাগের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে কেউ রক্তশূন্য থাকলে হার্টের অক্সিজেন সাপ্লাই কমে যায়। কাজেই তাদের অ্যানজাইনা বা হার্টের ব্যথা হতে পারে।

 

প্রশ্ন : ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে অনেকের ব্যায়াম করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে ঘরের স্বাভাবিক কাজের সময় হাঁটাহাঁটি করা অথবা সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করা কি ব্যায়ামের বিকল্প হতে পারে?

ডা. ওয়াদুদ : কায়িক পরিশ্রম করা হার্টের জন্য ভালো। আমি যখন দ্রুত পায়ে হাঁটব, তখন ফুসফুসে রক্ত চলাচল বাড়বে, হার্ট অক্সিজেন পাবে। এ অক্সিজেনই হার্টের খাবার। আর ঘরে বসে যখন হাঁটাহাঁটি করব বা সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করব, তখন সেভাবে তা হয় না। শরীর থেকে ঘাম বের করতে না পারলে তেমন লাভ হয় না।

 

প্রশ্ন : নারীদের চেয়ে পুরুষরা হৃদেরাগে বেশি আক্রান্ত হয় কেন?

ডা. ওয়াদুদ : সব সময় এটাই হয়ে আসছে। ঋতু চলাকালে নারীরা হরমোনাল প্রটেকশনের মধ্যে থাকেন, ফলে তাঁদের হৃদরোগ কম হয়। নারীদের মাসিক বন্ধ হওয়ার পর এই প্রটেকশনটা চলে যায়, তখন রোগের ঝুঁকিটা পুরুষদের মতোই হয়ে যায়। তাই প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত নারীরা হৃদরোগে তেমন আক্রান্ত হন না।

সাক্ষাৎকার : আতাউর রহমান কাবুল


মন্তব্য