kalerkantho

স্টেরয়েড

উপকারিতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



স্টেরয়েড

স্টেরয়েড ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবনের মাত্রা ও ব্যবহারের মেয়াদ জেনে নিতে হবে

অতি প্রয়োজনীয় অথচ স্পর্শকাতর এক ওষুধ স্টেরয়েড। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েড যেমন অপরিহার্য, তেমনি এর নির্বিচার ব্যবহারে তৈরি হতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।

চিকিৎসকের পরামর্শে, নির্ধারিত সময়জুড়ে সঠিক মাত্রায় এই ওষুধ ব্যবহার করা জরুরি। স্টেরয়েডের উপকারিতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত

 

মানবদেহের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজকর্ম এবং স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াকে চলমান রাখতে নানা ধরনের হরমোন কাজ করে, যা প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের শরীরে তৈরি হয়। কর্টিকোস্টেরয়েড, যা সাধারণভাবে স্টেরয়েড নামে পরিচিত এই হরমোনগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর নিঃসরণ ঘটে মানবদেহের অ্যান্ড্রিনাল গ্রন্থি থেকে। কেউ যখন খুব বেশি স্ট্রেস বা চাপে থাকে তখন তাকে সামাল দিতে এগিয়ে আসে কর্টিসল। দেহের স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখা, লবণের ভারসাম্য ঠিক রাখা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে স্টেরয়েড।

স্টেরয়েডের আরেকটি ধরন আছে, যাকে বলে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড। সাধারণত দেহের পেশি গঠনে এটি বেছে নেওয়া হয়। বডি বিল্ডার বা অ্যাথলেটরা পেশি ফোলাতে কিংবা পারফরম্যান্স বাড়াতে একধরনের স্টেরয়েড ব্যবহার করে।

এগুলোই অ্যানাবলিক স্টেরয়েড।

 

যেভাবে কাজ করে

ইনফ্লামেশন এমন এক জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে শ্বেত রক্তকণিকা অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে জোট বেঁধে সংক্রমণ ঠেকায়। ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেহকে সুরক্ষা দেয়। এটিই দেহের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা। অনেক সময়ই এ ব্যবস্থা অতিমাত্রায় ক্রিয়াশীল হয়ে উল্টো আচরণ শুরু করে। তখন তা টিস্যুর বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকে। এতে টিস্যু হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে কর্টিকোস্টেরয়েড আনতে পারে সমাধান।

বেশ কিছু ইনফ্লামেটরি অবস্থার চিকিৎসায় মূল সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্টেরয়েড। যেমন—সিস্টেমেটিক ভাসকুলিটিস (রক্তবাহী নালির প্রদাহ) ও মায়োসাইটিস (পেশির প্রদাহ)। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস কিংবা সোগ্রেন সিনড্রোম ইত্যাদি রোগ সামলাতেও এই ওষুধের প্রয়োজন হয়।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ছাড়াও অন্যান্য কারণে গিরা বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা ও জড়তার যন্ত্রণা সারাতে ব্যবহৃত হয় স্টেরয়েড। এ ছাড়া অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), কিডনি রোগ কিংবা একজিমার মতো রোগ সারাতেও অনেক সময় দ্রুত কাজ করে। কিছু কিছু মারাত্মক সংক্রমণ, যক্ষ্মার মতো রোগেও অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি ব্যবহার করতে হয় স্টেরয়েড।

 

প্রচলিত স্টেরয়েড

করটিসন, হাইড্রোকরটিসন, প্রেডনিসলন, মিথাইলপ্রেডনিসোলন, ট্রাইমাইসিলোন,  ডেক্সামিথাসন, বিটামিথাসন, ফ্লুটিকাসন  ইত্যাদি জেনেরিক নামে স্টেরয়েড ট্যাবলেট, ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট, ইনজেকশন, স্প্রে, ইনহেলার প্রভৃতি বাজারে রয়েছে। এদের শক্তিমাত্রা ও কার্যকারিতার ব্যাপ্তিকালে রয়েছে ভিন্নতা।

 

 

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

স্টেরয়েড যেহেতু এক জটিল ওষুধ, তাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শেষ নেই। নির্দিষ্ট কিছু রোগে সঠিক মাত্রায় স্টেরয়েড ব্যবহারের ফল অনেকটা হয় ম্যাজিকের মতো। কিন্তু দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে এর মারাত্মক পরিণতি দেখা যায়। স্টেরয়েড ব্যবহারে সংক্রমণ, অ্যালার্জি, সংযোগস্থলে রক্তপাত, অস্বাভাবিক ত্বকের রং, হাড়, লিগামেন্ট বা টেন্ডন দুর্বল হয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটে। ব্যক্তি বিশেষে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মাত্রা ও ধরন ভিন্ন হতে পারে। মুখে সেবন বা ইনজেকশন যা-ই হোক না কেন একেক স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া একেক ধরনের।

স্টেরয়েডের কিছু সাধারণত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হলো—ত্বকে ফুসকুড়ি, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা, চোখে ছানি, সামান্য আঘাতে অতিযন্ত্রণা ভোগ, ঘুম না আসা, উচ্চ রক্তচাপ, ক্ষুধা বৃদ্ধি, ওজন বাড়া, দেহের লোমের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সামান্য সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা হারানো, পেশি দুর্বলতা, পাকস্থলীতে প্রদাহ, আচমকা মেজাজ বদল, মুখ ফোলা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ইত্যাদি অন্যতম।

স্টেরয়েডের অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবহারের ফলে দেহে অতিরিক্ত সোডিয়াম লবণ জমে গিয়ে রক্তচাপ বেড়ে যায়, হাত-পা, মুখ ফুলে যায়, ঘাড়ে চর্বি জমে, পটাসিয়াম ও ক্যালসিয়াম কমে গিয়ে মাংসপেশির দুর্বলতা ও হাড়ের ক্ষয় হতে পারে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও পেপটিক আলসারের ঘা শুকাতে দেরি হয়, পুরনো কিছু রোগ নতুন করে দেখা দেয়, নারীদের দাড়ি-গোঁফ গজানো ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

আরো মারাত্মক অবস্থাও দেখা দিতে পারে যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ব্যবহার বা  ভুল প্রয়োগের কারণে হয়।

স্টেরয়েডের প্রভাবে পুরুষের দেহে প্রাকৃতিকভাবে থাকা টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এতে শুক্রাণুর পরিমাণ হ্রাস, মাথার চুলও পড়ে যেতে পারে। নারীদের অতিমাত্রায় টেস্টোস্টেরন বৃদ্ধির কারণে কণ্ঠস্বর মোটা হয়ে যায়। ঋতু পরিবর্তনসহ চুল পড়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বদলে যায় রোগীর মানসিক আচরণ। তখন বিষণ্নতা ভর করে, আচরণ পাগলাটে হয়ে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

শিশুদের দেহে অতিমাত্রায় স্টেরয়েডের প্রয়োগ হলে হাড়ের বৃদ্ধি রুখে দেওয়া, সংযোগস্থলে সমস্যা অথবা পেশির বৃদ্ধিতেও বাধার সৃষ্টি করতে পারে।

অতিমাত্রায় স্টেরয়েড ব্যবহারে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দৈহিক ওজন বেড়ে যাওয়া, দৈহিক বৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া, চোখে ছানি পড়া, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ, মাংসপেশি সরু ও ব্যথা হওয়া, অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি, সেপ্টিসেমিয়া বা দেহে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি ঘটতে পারে। এ ছাড়া দেহে পানি জমতে পারে, মুখমণ্ডল ফুলে যেতে পারে, রক্তচাপ বৃদ্ধি হতে পারে। তাই যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের স্টেরয়েড ব্যবহারে খুব সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। নচেত এ ওষুধ প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দিতে পারে।

 

করণীয়

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট ফেইলিওর, পেপটিক আলসার, অস্টিওপোরোসিস কিংবা গ্লুকোমার মতো সমস্যায়ও স্টেরয়েড ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। কারো স্টেরয়েড নেওয়া প্রয়োজন কি না তা বিবেচনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। বয়স, স্বাস্থ্যের সার্বিক অবস্থা আর অন্যান্য রোগ-বালাই বিবেচনা করে চিকিৎসকই সঠিক স্টেরয়েড নির্ধারণ করবেন।

তবে স্টেরয়েড সেবনের সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মাবলি রয়েছে, যা মেনে চললে সমস্যা কম হয়। আবার স্টেরয়েড সেবনের কারণে দেহের স্বাভাবিক স্টেরয়েড হরমোন নিঃসরণের ছন্দপতন ঘটে। হঠাৎ ওষুধ ছেড়ে দিলে বা ভুলে গেলে বমি, দুর্বলতা, পেট ব্যথা এমনকি অজ্ঞান হয়ে গিয়ে মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই চিকিৎসকের কাছ থেকে এর মাত্রা ও সেবনের মেয়াদ জেনে নিতে হবে। ওষুধ সেবনের সময় কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবন করলে ধাপে ধাপে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ কমিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে হরমোন বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

 অনুলিখন : সাকিব সিকান্দার


মন্তব্য