kalerkantho


বেশির ভাগ ডায়াবেটিস রোগীই রোজা রাখতে পারেন

অধ্যাপক ডা. ফরিদ উদ্দিন, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



বেশির ভাগ ডায়াবেটিস রোগীই রোজা রাখতে পারেন

খাদ্য, ব্যায়াম, ওষুধ ও শৃঙ্খলা—এই মিলে ডায়াবেটিস, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব

দরজায় কড়া নাড়ছে মাহে রমজান। চলছে রোজা রাখার প্রস্তুতি। ধর্মপ্রাণ মুসলমানমাত্রই রোজা রাখতে চান। কিন্তু যাঁরা ডায়াবেটিস রোগী, তাঁরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন রোজা রাখতে পারবেন কি না। অথচ কিছু বিশেষ সতর্কতা, নিয়ম আর শৃঙ্খলা মেনে চললে বেশির ভাগ ডায়াবেটিস রোগীই রোজা রাখতে পারেন।

এটা তো সবাই জানেন যে ডায়াবেটিস হলো সারা জীবনের অসুখ। খাদ্য, ব্যায়াম, ওষুধ ও শৃঙ্খলা—এই মিলে ডায়াবেটিস রোগ, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ডায়াবেটিস সঙ্গে নিয়েও ভালো থাকা যায়।

 

কারা রোজা রাখ তে পারবেন না

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখেন। তবে এটা মাথায় রাখতে হবে যে আবেগের বশবর্তী হয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। আল্লাহ অন্তর্যামী। তিনি আমাদের অপারগতা নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন।

তবে যেসব ডায়াবেটিস রোগীর রোজা রাখা উচিত হবে না, তাঁরা হলেন—

 

►    ব্রিটল ডায়াবেটিস রয়েছে যাঁদের। অর্থাৎ যে ডায়াবেটিসে রক্তে সুগারের মাত্রা খুব বেশি ওঠানামা করে।

►    যাঁদের ডায়াবেটিসের সঙ্গে অন্যান্য জটিল অসুখ, যেমন কিডনি, হৃদরোগ বা কোনো ইনফেকশন ইত্যাদি রয়েছে।

►    রোজার সময় যেসব ডায়াবেটিস রোগীর ডায়রিয়া বা বমি হয়, তাঁদের রোজা রাখা উচিত নয়।

 

করণীয়

►    রোজার জন্য আগেভাগেই পূর্বপ্রস্তুতি লাগবে। রোজার কমপক্ষে তিন মাস আগে থেকেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারলে ভালো হয়।

►    ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ব্যায়াম খুব জরুরি। তবে রোজার সময় দিনের বেলায় ব্যায়াম, কায়িক পরিশ্রম বা বেশি হাঁটাহাঁটি বিপজ্জনক। এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। এ জন্য দুপুরের পর কাজকর্ম একেবারেই কমিয়ে দিতে হবে। রাতের বেলায়, বিশেষ করে তারাবি নামাজের পর হালকা ব্যায়াম করা ভালো।

 

খাবারদাবার

►    রমজান মাসে ডায়াবেটিস রোগীরা সাহরি খাবেন শেষ সময়ের অল্প আগে।

►    ইফতারের সময় অধিক মিষ্টি ও চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন।

►    খাদ্যের ক্যালরি ঠিক রেখে খাওয়ার পরিমাণ ও ধরন ঠিক করুন। ইফতারের সময় অতিভোজন এবং সাহরির সময় স্বল্পভোজন দুটিই পরিহার করুন। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদদের পরামর্শ নিন।

►    সাহরি ও ইফতারিতে ফলমূল, শাকসবজি, ডাল ও টকদই তালিকাভুক্ত করুন। খেজুর খুব বেশি নয়, বড়জোর একটা খান। ভাজাপোড়া খাবার একদম বাদ দিন।

►    পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, যাতে পানিশূন্যতা না হয়। ইফতারের পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুক্ষণ পরপর সাধারণ পানি, রাইস স্যালাইন বা ডাবের পানি পান করুন।

►    গ্যাস্ট্রিক বা অন্য কোনো অসুখে সমস্যা না হলে ইচ্ছামতো খাওয়া যাবে কালোজাম, লেবু, আমড়া, জাম্বুরা, কামরাঙা, বাঙ্গি, জামরুল, আমলকী, কচি ডাবের পানি ইত্যাদি।

►    শাকসবজির মধ্যে পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক, কচুশাক, ফুলকপি, কাঁচা টমেটো, কাঁচা পেঁপে, শসা, উচ্ছে, করলা, ঝিঙা, চিচিংগা, ধুন্দল, পটোল, চালকুমড়া, লাউ, শজিনা, কাঁচা মরিচ খেতে পারেন।

►    রমজানের আগে নফল রোজা রেখে প্রস্তুতি নিতে পারেন।

 

খাবার ওষুধ ইনসুলিন

►    রমজানের আগে আগে ওষুধের ডোজ সমন্বয় করে নিন। অন্য সময়ের তুলনায় সাধারণত এ সময়ে মুখে খাওয়ার ওষুধ বা ইনসুলিনের ডোজ কিছুটা কমিয়ে আনতে হয়। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনবারের ওষুধ একবার বা দুইবারে পরিবর্তন করে আনুন।

►    রমজানের আগে থেকে সকাল বা দুপুরের ওষুধ রাতে খাওয়ার অভ্যাস করুন। অর্থাৎ যাঁরা মুখে খাওয়ার ওষুধ খান তাঁরা সকালের ডোজটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের ডোজটি অর্ধেক পরিমাণে সাহরির আধা ঘণ্টা আগে খাবেন।

►    যাঁরা দিনে একবেলা ওষুধ খান, তাঁরা ইফতারের আগে পরিমাণে একটু কম খাবেন।

►    ইনসুলিনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। অর্থাৎ সকালের ডোজটি ইফতারের আগে, রাতের ডোজটি কিছুটা কমিয়ে সাহরির আধা ঘণ্টা আগে। কতটা কমাবেন তা ডাক্তার বলে দেবেন।

►    দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে এ রকম কিছু ইনসুলিন এখন বাজারে পাওয়া যায়। এসব ইনসুলিন দিনে একবার নিলেই হয়। এতে হঠাৎ সুগার কমে যাওয়ার ভয়ও কম থাকে, রোজার সময় মুখে খাওয়ার ওষুধের ক্ষেত্রে এ রকম দীর্ঘমেয়াদে কাজ করা ওষুধ ব্যবহার কিছুটা নিরাপদ।

 

নিয়মিত সুগার পরীক্ষা করুন

►    রোজার সময় রাতে, এমনকি দিনেও সুগার মাপুন, যাতে ওষুধের মাত্রা ঠিকভাবে সমন্বয় করা যায়। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।

►    সাহরির দুই ঘণ্টা পর এবং ইফতারের এক ঘণ্টা আগে রক্তের সুগার পরীক্ষা করুন। যদি সুগারের পরিমাণ কমে ৩.৯ মিলিমোল/লিটার হয়ে যায়, তবে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের মনের খবর রাখেন।

►    রোজায় যদি সুগারের মাত্রা ১৬.৭ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশি হয়, তবে প্রস্রাবে কিটোন বডি পরীক্ষা করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে চামড়ার নিচে ইনসুলিন নেওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞ আলেমদের মত অনুযায়ী এতেও রোজার ক্ষতি হবে না।

 

সতর্কতা

ডায়াবেটিক রোগীরা রোজা রাখতে গেলে রক্তে সুগারের স্বল্পতা (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), রক্তে সুগারের আধিক্য (হাইপারগ্লাইসেমিয়া), ডায়াবেটিক কিটো-অ্যাসিডোসিস, পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন ইত্যাদি জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন।

 

হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীদের যে সমস্যাটি বেশি হয় এবং যা সবচেয়ে বিপজ্জনক, সেটি হলো হাইপোগ্লাইসেমিয়া। ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তে সুগারের মাত্রা কমে গিয়ে ৩.৯ মিলিমোল/লিটার বা তার কম হলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এ সময় রোগীর মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, চিকন ঘাম দেওয়া, শরীর কাঁপুনি, ঘুম ঘুম ভাব, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। দিনের যেকোনো সময় এ রকম লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। রোজা অবস্থায় ডায়াবেটিক রোগীর সুগারের মাত্রা ৩.৯ মিলিমোল বা তার কম থাকলে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। তাত্ক্ষণিকভাবে চার থেকে ছয় চামচ গ্লুকোজ বা চিনি এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। চিনি বা গ্লুকোজ না থাকলে মিষ্টি, চকোলেট বা অন্য যেকোনো খাবার খাওয়াতে হবে। অজ্ঞান হয়ে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে এবং ২৫ শতাংশ ডেক্সট্রোজ স্যালাইন শিরায় দিতে হবে।

 

গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে

ডায়াবেটিস রোগীদের গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে অনেক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। ইনসুলিনের ঘাটতির কারণে কম সময়ে অ্যাসিটোন বেড়ে গিয়ে মাথা ঘোরা, শক্তি কমে যাওয়া, কখনো কখনো ঝিমুনি, বমি, দুর্বলতা ইত্যাদি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সেই সঙ্গে গ্লুকোজের কার্যক্রম অনিয়মতান্ত্রিক হয়ে অধিক প্রস্রাব, পিপাসা ও পানিশূন্যতার লক্ষণ প্রকাশ পায়। এ সময় রক্তচাপ নিম্নমুখী হওয়া, চামড়া শুকিয়ে যাওয়া, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, প্রস্রাবে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি হওয়া এবং অ্যাসিটোন প্রকাশ পাওয়া প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। এ সময় দ্রুত চিকিৎসা না করালে কিটো-অ্যাসিডোসিস হয়ে রোগী বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। কিটো-অ্যাসিডোসিস ছাড়াও যদি রক্তে সুগার ১৬.৭ মিলিমোলে পৌঁছে তবে চামড়ার নিচে ইনসুলিন দিয়ে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে অবশ্য রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। পরে ডায়াবেটিসের ওষুধ সমন্বয় করতে হবে।

 

রক্তে ফ্যাট বা চর্বি বেড়ে গেলে

রমজান মাসে নিয়ন্ত্রিত খাবারের ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে চর্বির ঘাটতি হয়। কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড কমে যায়। আবার অনিয়ন্ত্রিত খাবারের ফলে রক্তে চর্বিও বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য ক্যালরি ঠিক রেখে খাবারের পরিমাণ ঠিক করতে হবে। চর্বিজাতীয় খাবার, বিশেষ করে প্রাণিজ চর্বি যেমন ঘি, মাখন, মাংস ও তৈলাক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। মোট খাদ্যের মধ্যে চর্বির পরিমাণ যেন ৩০ শতাংশের বেশি না হয়। এ জন্য শাকসবজি, টক ফলমূল বেশি করে খাওয়া ভালো।

 

ওজন বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া

রমজানে ক্ষতিকারক খাবার বেশি খাওয়া হয় বলে শারীরিক ওজন বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া রোজাদার ব্যক্তিরা কম নড়াচড়া ও অলস জীবন কাটান বলে তাঁদের ওজন বৃদ্ধি পায়। আবার ডায়াবেটিস রোগীরা তাঁদের অনিয়মতান্ত্রিকতার ফলে ওজন কঠিনভাবে নিম্নপর্যায়ে নিয়ে আসতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে রোজা না রাখার জন্যও বলা হয়।

মোটকথা শরীরের জন্য রোজা উপকারী, বিশেষ করে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় রোজাকে সহায়ক গণ্য করা হয়। তাই এ সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।

 

অনুলিখন : ডা. গুলজার হেসেন


মন্তব্য