kalerkantho


গ্লুকোমা : নীরব অন্ধত্বের প্রধান কারণ

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গ্লুকোমা : নীরব অন্ধত্বের প্রধান কারণ

ছবি : তারেক আজিজ নিশক গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, কিন্তু পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব নয়

১২ থেকে ১৮ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ। নীরব অন্ধত্বের প্রধান কারণ গ্লুকোমা। এতে চোখের প্রেশার বেড়ে গিয়ে অপটিক নার্ভের ক্ষতি হয় এবং দৃষ্টির পরিসীমা কমে যায়। তবে শুরুতে চিকিৎসা নিলে ভালো থাকা যায়। লিখেছেন বারডেম হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বাংলাদেশ আই হাসপাতালের ফ্যাকো ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম নজরুল ইসলাম

 

বিশ্বের প্রায় ৭০ মিলিয়ন লোক গ্লুকোমা রোগে ভুগছে। বাংলাদেশে পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের শতকরা প্রায় তিনজনের গ্লুকোমা রয়েছে। বাংলাদেশ আই কেয়ার সোসাইটির সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ গ্লুকোমা রোগে ভুগছে।

 

গ্লুকোমা কী?

রক্তের যেমন চাপ আছে তেমনি চোখেরও একটি নির্দিষ্ট চাপ রয়েছে। চোখের স্বাভাবিক চাপ ১০-২০ মি.মি. মারকারি। কোনো কারণে চোখের চাপ বেড়ে গেলে চোখের অপটিক নার্ভের ক্ষতি হয় এবং খুব ধীরে ধীরে নার্ভটি শুকিয়ে যায়। এক পর্যায়ে দৃষ্টির পরিসীমা কমতে কমতে চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এ অবস্থাকেই বলা হয় গ্লুকোমা। এ রোগের মারাত্মক দিক হচ্ছে-রোগটি উপসর্গহীন এবং অপরিবর্তনীয়। একবার অন্ধ হয়ে গেলে তা ভালো করা যায় না। এটি নীরবে চোখকে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায় বলে একে নীরব ঘাতক বা সাইলেন্ট কিলার বলা হয়।

 

ধরন

অনেক প্রকারের গ্লুকোমা রয়েছে। যেমন—  প্রাথমিক অ্যাঙ্গেল খোলা গ্লুকোমা, প্রাথমিক অ্যাঙ্গেল বন্ধ গ্লুকোমা, স্বাভাবিক চাপ গ্লুকোমা, সেকেন্ডারি গ্লুকোমা, জন্মগত গ্লুকোমা ইত্যাদি।

 

লক্ষণ

এ রোগের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ থাকে না। রোগের শেষ মুহূর্তে লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত রোগী বুঝতে পারে না যে এ রকম জটিল রোগ রয়েছে। চশমা পরিবর্তনের সময় বা নিয়মিত চোখ পরীক্ষার সময় হঠাৎ রোগ ধরা পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে :

♦    ঘন ঘন চশমার গ্লাস বদলাতে হয়।

♦    চোখে ঝাপসা দেখা বা আলোর চারপাশে রংধনুর মতো দেখা যায়।

♦    ঘন ঘন মাথা ব্যথা বা চোখে ব্যথা হয়।

♦    দৃষ্টিশক্তি বা দৃষ্টির পারিপার্শ্বিক ব্যাপ্তি ধীরে ধীরে কমে আসে। অনেক সময় চলতে গিয়ে দরজার পাশে বা অন্য কোনো পথচারীর গায়ে ধাক্কা লাগে।

♦    মৃদু আলোয় কাজ করলে চোখে ব্যথা অনুভূত হয়।

♦    চোখে আঘাত পেলে হতে পারে।

♦    ছোট শিশুদের অথবা জন্মের পর চোখের কর্নিয়া ক্রমাগত বড় হওয়া বা সাদা হয়ে যাওয়া, চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি হলে।

 

কারণ

গ্লুকোমা কেন হয় এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। এ রোগ হলে চোখে উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হয়। তবে স্বাভাবিক চাপেও এ রোগ হতে পারে। সাধারণত চোখের উচ্চ চাপই ধীরে ধীরে চোখের স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দৃষ্টিকে ব্যাহত করে। অন্যান্য কারণসহ কিছু রোগের সঙ্গেও এ রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেসব কারণে হয় তা হলো—

♦    নিকটাত্মীয়ের (মা, বাবা, দাদা, দাদি, নানা, নানি, চাচা, মামা, খালা, ফুপু) এই রোগ থাকলে।

♦    চল্লিশ বা তদূর্ধ্ব বয়স হলে।

♦    ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে।

♦    মাইগ্রেন বা মাথা ব্যথা থাকলে।

♦    রাতে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন।

♦    দীর্ঘদিন ধরে স্টেরয়েড সেবন।

♦    সময়মতো চোখের ছানি অপারেশন না করলে।

♦    অল্প আলোয় অনেকক্ষণ ধরে পড়াশোনা করলে, সেলাই করলে বা টেলিভিশন দেখলে।

♦    মায়োপিক চশমা ও প্লাস পাওয়ার ব্যবহারকারীদেরও গ্লুকোমা হয়।

♦    জন্মগত ত্রুটিসহ চোখের অন্যান্য রোগ থাকলে।

 

গ্লুকোমা না ছানি?

কেউ চোখে না দেখলে বুঝতে পারবেন না যে আসলে তার গ্লুকোমা হয়েছে না ছানি হয়েছে।   কেননা গ্লুকোমাতেও উপসর্গ থাকে না, ছানিতে উপসর্গ থাকে না। তবে ছানি হলে সম্পূর্ণ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। আর গ্লুকোমাতে সাধারণত চোখ ঝাপসা হয় শেষ পর্যায়ে। এ ক্ষেত্রে দেখার ক্ষেত্রটা ছোট হয়ে যায়। প্রথম দিকে কেবল দৃষ্টির পরিসীমাটা কমতে থাকে।

এ জন্য যেকোনো কারণেই হোক, কেউ যদি চোখে না দেখেন তাহলে উচিত হবে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে জেনে নেওয়া যে সমস্যাটা ছানি পড়ার কারণে, নাকি তার গ্লুকোমা হয়েছে।

 

দেখতে পায় না কেন?

যখন আলো চোখের ভেতর ঢোকে, তখন চোখের ভেতর একটি স্নায়ু কোষ, গ্যাংলিয়ন কোষের মধ্যে গিয়ে উদ্দীপিত হয়। চোখের চাপ বেড়ে গেলে গ্যাংলিন কোষটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন দেখার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং শেষ পর্যন্ত দেখার পরিসীমা কমে যায়। মানুষের চোখে প্রায় ১২ লাখ গ্যাংলিয়ন কোষ রয়েছে, চোখের চাপ বাড়ার কারণে হয়তো ছয় লাখ গ্যাংলিয়ন কোষ নষ্ট হয়ে গেল। তখন তার অর্ধেক দৃষ্টির সীমা কমে যাবে। আর আরো যদি ছয় লাখ কমে যায়, তখন তিনি পুরোটাই অন্ধ হয়ে যাবেন। এ জন্য গ্লুকোমায় সোজাসুজি দেখাটা শেষ পর্যন্ত থাকে। তবে পাশের দেখা সীমাটা কমে যায়। মূলত এটি স্নায়ুর ক্ষতি করে। এবং এটি এমনভাবে ক্ষতি করে, যাতে তা আর ঠিক হয় না।

 

চিকিৎসা

গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, কিন্তু পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব নয়। গ্লুকোমা যে পর্যায়ে নির্ণয় হোক না কেন তার আধুনিক চিকিৎসা বাংলাদেশেই রয়েছে। এ রোগের প্রচলিত তিন ধরনের চিকিৎসা হলো—ওষুধের দ্বারা চিকিৎসা, লেজার চিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসা বা সার্জারি।

চোখের উচ্চ চাপ যেহেতু এই রোগের প্রধান কারণ, সেহেতু ওষুধের দ্বারা এই চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে একাধিক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

 

প্রচলিত শল্য চিকিৎসা

ওষুধ ও লেজার প্রয়োগ করেও কাজ না হলে শল্য চিকিৎসা বা সার্জারি করতে হয়। এ রকম প্রচলিত একটি চিকিৎসা ট্রাবেকুলেকটোমি। গ্লুকোমার চিকিৎসায় এটি সারা বিশ্বে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। এটি একটি বাইপাস সার্জারি। হার্টে ব্লক হলে রক্ত চলাচলে যেমন ব্যাঘাত ঘটে, তেমনি চোখের ভেতরের তরল পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হলে চোখের চাপ বাড়তে থাকে। এ জন্য তখন একটি বাইপাস করে দিতে হয়, যাতে তরলটি বেরিয়ে গিয়ে রক্তের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এতে চোখের ভেতরে চাপ কমে।

আবার ট্রাবেকুলেকটোমি সফল না হলে চোখের পাশে ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করা হয়, যা আমরা বাংলাদেশে করছি। এর সফলতা অনেক বেশি। তবে কিছু গ্লুকোমা চিকিৎসা রয়েছে যেমন ‘আই স্ট্যান্ট ইমপ্ল্যান্ট’। ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে সেটি এখনো বাংলাদেশে শুরু হয়নি। তবে শিগগিরই করতে পারব বলে আশা করছি।  

 

পরীক্ষা

দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, চোখের চাপ পরীক্ষা, দৃষ্টির ব্যাপ্তি বা ভিজ্যুয়াল ফিল্ড পরীক্ষা, রেটিনার রঙ্গিন ছবি, ও.সি.টি মেশিনের সাহায্য রেটিনার নার্ভ ফাইবার এনালাইসিস, অপটিক ডিস্কের পরীক্ষা ইত্যাদি।

 

করণীয়

♦    প্রত্যেকের বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করা এবং জেনে নেওয়া যে গ্লুকোমা হয়েছে কি না।

♦    চল্লিশোর্ধ ব্যক্তিদের নিয়মিত চেকআপ।

♦    গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না, কমপক্ষে তিন মাস অন্তর চোখ পরীক্ষা করা।

♦    চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারিত মাত্রার ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার।

♦    চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুদের স্টেরয়েড না দেয়া।

♦    দীর্ঘদিন একটি ওষুধ ব্যবহারে এর কার্যকারিতা কমে গেলে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।

 

দরকার সচেতনতা

অনেক ক্ষেত্রে এ রোগের লক্ষণ বোঝার আগেই চোখের স্নায়ুর অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এ রোগ সম্পর্কে জানা থাকা জরুরি।

কারো চোখ পরীক্ষা করে দেখা গেল হয়তো তার প্রাথমিক গ্লুকোমা হয়েছে। স্নায়ু ক্ষতি হয়েছে ৩০ ভাগ। ৭০ ভাগ দৃষ্টি ভালো আছে। এ অবস্থায় যদি তার চিকিৎসা ঠিকমতো হয়, তবে ৭০ ভাগ দৃষ্টিশক্তি নিয়ে তিনি সারা জীবন ভালো থাকবেন। আর কমবে না। আর যদি ৯০ ভাগ দৃষ্টি ক্ষতি হওয়ার পর তিনি চিকিৎসকের কাছে আসেন, তবে ৯০ ভাগ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। হয়তো ওই ১০ ভাগ সারা জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তাই যত দ্রুত তিনি চিকিৎসকের কাছে যাবন তত দ্রুত তিনি নিজের দৃষ্টিশক্তিকে রক্ষা করবেন। এ বিষয়ে মানুষের সচেতন হওয়া উচিত।

 গ্রন্থনা : সীমা আক্তার


মন্তব্য