kalerkantho


এ সময়ে শিশুর রোগবালাই

দূষিত পানি পানের ফলে পানিবাহিত রোগগুলো বেশি দেখা দেয়। এর মধ্যে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড অন্যতম। এ সময়ের শিশুর রোগবালাই নিয়ে লিখেছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু কিডনি রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এ সময়ে শিশুর রোগবালাই

ডায়রিয়া হলে প্যাকেটের পুরোটা স্যালাইন না মিশিয়ে কিছুটা অংশ পানির সঙ্গে গুলিয়ে খাওয়ানো একেবারেই ঠিক নয়

ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে বাতাসে ধুলাবালি বা ডাস্টের পরিমাণ বেশি থাকায় নানা রোগ হয়। ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড বেশি হলেও অন্যান্য ভাইরাল ইনফেকশনের রোগগুলো যেমন—চিকেনপক্স, ঠাণ্ডা-কাশি ইত্যাদিও হতে পারে।

তাই এ সময়ে বিশেষ করে শিশুদের বেশ যত্নের সঙ্গে রাখতে হয়।

 

ডায়রিয়া

ডায়রিয়া একটি কমন রোগ হলেও এ সময়ে বেশি দেখা দিতে পারে। ডায়রিয়া হলে শিশুর শরীর থেকে দরকারি পানি ও লবণ বের হয়ে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন কারণে এই রোগ হলেও পানির কারণেই বেশি হয়। ব্যাকটেরিয়াল ডায়রিয়ায় পেটে ব্যথা হয়। পেট মোচড় দিয়ে পায়খানা হয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলেও পায়খানা ক্লিয়ার হয় না। সঙ্গে রক্ত বা আম যায়। এ রোগ প্রতিরোধের জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।

এর মধ্যে পানি ফুটিয়ে খাওয়া, ভেজাল বা বাসি-পচা খাবার না খাওয়া, হাত-মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করা ইত্যাদি।

 

জন্ডিস

শিশুদের বেলায় জন্ডিস একটি কমন রোগ হলেও নবজাতকের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। বিভিন্ন প্রকারের জন্ডিস রয়েছে। এটা হলে রক্তে বিলোরুবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়। জন্ডিসের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—শিশুর জ্বর ও বমি, প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হবে। অনেকটা সরিষার তেলের মতো। চোখের সাদা অংশটা হলুদ হয়। হাত বা হাতের তালু, মুখ, পেট, পায়ে কিছুটা হলদে হয়ে যাবে। রোদে গিয়ে দেখলে এ ভাবটা ভালোভাবে বোঝা যায়। অনেক সময় পেটও খারাপ হতে পারে।

জন্ডিস প্রতিরোধে টিকা রয়েছে। এ জন্য শিশুর জন্মের নির্ধারিত সময়ে প্রথমেই জন্ডিসের টিকাগুলো দেওয়া উচিত। এ ছাড়া শিশুকে সব সময় বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার খাওয়াতে হবে। তার সঙ্গে সব সময় পানির বোতল থাকা ভালো অভ্যাস। সর্বোপরি প্রতিরোধমূলক অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সময় অনেক শিশু বুকের দুধ পান করতে চায় না, তবে কোনো অবস্থায়ই দুধ খাওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে না। আর জন্ডিস হয়ে গেলে রক্তে বিলোরুবিনের মাত্রা পরীক্ষা করে সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।

 

টাইফয়েড

যেকোনো বয়সীদের টাইফয়েড হলেও শিশুদের এ সময়ে এই রোগটি বেশি হচ্ছে। টাইফয়েড হলে এর পাশাপাশি জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানা হতে পারে।

সাধারণত জ্বর হলেও প্রথম দিকে বোঝা যায় না এটা আসলে শিশুর টাইফয়েড, ডেঙ্গু না অন্য কোনো ধরনের জ্বর। পরবর্তী সময়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্বরের প্রকৃতি নির্ণয় করে চিকিৎসা দিতে হয়। অনেক সময় শিশুর নিউমোনিয়াও হতে পারে।

এ জন্য শিশুকে সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার গ্রহণ করা উচিত। টাইফয়েডের টিকা দেওয়া উচিত।  

 

করণীয়

পানি ফুটিয়ে পান করুন : শুধু শিশু নয়, বরং সবাইকে সুস্থ থাকতে প্রথম পরামর্শ হলো খাওয়ার পানি ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করুন। অনেকেই বলে থাকেন তাঁরা তো পানি ফুটিয়েই পান করেন। তাহলে এসব রোগ হচ্ছে কেন? তাঁদের ক্ষেত্রে পরামর্শ হলো—পানি বিশুদ্ধ করতে চুলায় পানি ফোটানোর সনাতন পদ্ধতিটাই ভালো। খেয়াল রাখতে হবে, পানি বলক আসার পর ঘড়ি ধরে আরো ৩০ মিনিট অনবরত ফোটাতে থাকতে হবে। এতে জীবাণুগুলো মারা যায়। এ জন্য রান্নাবান্নার পর চুলায় পানি ফোটানোর উত্তম সময়।

সতর্ক থাকুন : অনেক সময় শিশুরা পুকুরে বা বাথরুমে গোসল করার সময় অসাবধানতাবশত কিছুটা পানি খেয়ে ফেলে। এতে দূষিত পানি পেটে চলে যায়, যাতে পেটের পীড়া হতে পারে। এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

খোলা খাবার নয় : অনেকে রাস্তার ধারে বা খোলা পরিবেশে খাবার খায়। অনেকে বাসি খাবার খায়। এগুলো থেকে সাবধান হতে হবে। নইলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ফাস্ট ফুড থেকে সাবধান : শিশুরা ফাস্ট ফুডে অভ্যস্ত। তারা ফুসকা, বার্গার, হটডগ, কাবাব ইত্যাদি খায়। এগুলোয় কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু থাকে। চিকেন তৈরির সময় বা তাড়াহুড়া করে মাংসজাতীয় কিছু রান্না করতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায় ওপরের অংশটি সিদ্ধ হয়ে গেলেও ভেতরের মাংসটি ভালোভাবে সিদ্ধ হয়নি। ভেতরে কিছুটা কাঁচা রয়ে গেছে। এখানে কিন্তু অনেক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। এটা খুবই বিপজ্জনক। তাই কখনোই এ ধরনের অর্ধেক সিদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে শিশুদের বেলায়।

রান্না করা ফ্রেশ খাবার : শিশুদের যা কিছুই খাওয়ান না কেন, ভালোভাবে সিদ্ধ করা এবং টাটকা খাবার খাওয়ানো ভালো।

ফ্রিজে খাবার বেশি দিন নয় : চিকেন বা বিফ বেশি দিন ফ্রিজে রাখা উচিত নয়। এতে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়।

ভালোভাবে হাত-মুখ ধোয়া : শুধু ডায়রিয়া নয়, অন্যান্য জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে বা সুস্থ থাকতে হ্যান্ডওয়াশ বা হাত ধোয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাত ধোয়ার নিয়ম হলো, সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাতের সব বাঁক বা ভাঁজগুলো ধুইতে হবে। নখগুলো কেটে ফেলতে হবে। বাজারে প্রচলিত সাবানগুলো মোটামুটি ব্যাকটেরিয়ামুক্ত।

স্যালাইন বানানোরও নিয়ম আছে : যদি ডায়রিয়া হয়েই যায়, তবে শিশুকে বেশি বেশি স্যালাইনের পানি খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি বুকের দুধ ও স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যেতে হবে। অনেকে স্যালাইন প্যাকেটের পুরোটা না মিশিয়ে কিছুটা অংশ পানির সঙ্গে গুলিয়ে খাওয়ান। এটা একেবারেই ঠিক নয়। পুরো স্যালাইনের প্যাকেটটি গুলিয়ে যেভাবে নিয়ম লেখা রয়েছে সেভাবেই খাওয়াতে হবে। অর্ধেক বা কিছু পরিমাণ নিয়ে খাওয়ালে শরীরে লবণের পরিমাণ বেশি চলে যায়। এতে শিশুর মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হয়। শিশুর খিঁচুনি হয়। অনেক সময় ডায়ালাইসিসও করতে হয়। স্যালাইন সঠিকভাবে না খাওয়ানোর কারণে আইসিইউতে চিকিৎসা দিয়েও অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

পরীক্ষা করে ওষুধ সেবন : ডায়রিয়া হলে পায়খানা কালচার করে যদি দেখা যায় রক্ত বা আম যাচ্ছে, তবে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে। কী ধরনের জীবাণু সেটার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন। কোনোভাবেই চিকিৎসক শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিত নয়।

 

গ্রন্থনা : আতাউর রহমান কাবুল


মন্তব্য