kalerkantho

নাকডাকা ভালো নয়

নাকডাকা বা নাসিকা গর্জন সুখনিদ্রার, স্লিপ অ্যাপনিয়া নামের মারাত্মক এক নতুন রোগের লক্ষণ। এতে ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাকে রোগী মারাও যেতে পারে। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির (বিএসএমএমইউ) নাক-কান-গলা বিভাগের অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান অধ্যাপক মনজুরুল আলম

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নাকডাকা ভালো নয়

অ্যাপনিয়া মানে দম বন্ধ হওয়া। আর স্লিপ অ্যাপনিয়া মানে ঘুমে দম বন্ধ হওয়া। সাধারণত ঘুমের মধ্যে ১০ সেকেন্ডের বেশি শ্বাস বন্ধ হওয়া ও তা প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ বা তার অধিক হলে তাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া সিনড্রোমের রোগী বলে ধরা হয়। সব নাকডাকাই ক্ষতিকর নয়। তবে যখন বাতাস চলাচলের রাস্তা কমে যাওয়ার ফলে শরীরের অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়, তখন এটা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অক্সিজেন সঠিকভাবে না পেলে মস্তিষ্কের বা শারীরিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই যেকোনো বয়সেই হোক স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত, যাতে ভালো হয়ে যায়।

 

প্রকারভেদ

সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া : কেন্দ্রীয় বা মস্তিষ্কজনিত কারণে শ্বাসনালি বাধাপ্রাপ্ত হলে।

অবসট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া : উচ্চ শ্বাসনালিতে শ্বাস বাধাপ্রাপ্ত হলে।

মিক্সড স্লিপ অ্যাপনিয়া : উভয় কারণ বিদ্যমান থাকলে।

 

কারা আক্রান্ত হয়

• পাঁচ থেকে ১২-১৩ বছর বয়সী শিশুসহ যেকোনো বয়সেই হতে পারে।

তবে নারীদের চেয়ে পুরুষদের সমস্যাটা বেশি হয়।

• স্থূলকায় ও ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি

• ধূমপায়ী, মদ্যপায়ী

• প্রশস্ত ঘাড়, সরু গলা, তালুতে ফাটল, বড় এডিনয়েড থাকলে

• নিদ্রাহীনতার পারিবারিক ইতিহাস থাকলে

• গ্যাস্ট্রোফাগিয়েল রিফ্লাক্স বা GERD হলে

• নাসারন্ধ্র বাধাপ্রাপ্ত হলে

• চোয়ালের হাড় সরু হলে

• পর্যাপ্ত পানি পান না করলে

• নাকের অ্যালার্জি বা সাইনাস সমস্যা থাকলে

• চিত হয়ে শোবার অভ্যাস

• কম ঘুমানো, ঘুমের ওষুধ বা সিডেটিভ গ্রহণ করলে

• অতিরিক্ত আহার

• ঘরে বা বালিশে অ্যালার্জেন থাকলে।

 

নাকডাকার কার্যপ্রক্রিয়া

ঘুমের সময় গলবিলের মাংসপেশি প্রসারিত হয়, ফলে শ্বাসনালির রাস্তা সরু হয়ে যায়। এই সরু রাস্তার বিপরীতে বাতাস যাওয়ার সময় আলাজিহ্বা, টনসিলের প্রাচীর ও জিহ্বার পেছনের অংশের কম্পনের জন্য নাকডাকার শব্দ হয়। এই শব্দ ৯০ ডেসিবেল তীব্রতা পর্যন্ত হতে পারে।

 

প্রভাব

ঘুমে দম বন্ধ হলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয় ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের আধিক্য দেখা যায়। ফলে হার্টে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়ে হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। হার্টের গতি অস্বাভাবিক হয়ে হঠাৎ মৃত্যুও ঘটতে পারে।

নাকডাকার চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেমন—

• মাথাব্যথা

• অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব বা ক্লান্তি

• সকালের দিকে মাথাব্যথা

• রাতে ফ্রেশ ঘুম না হওয়া

• অবসাদ

• স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া

• খিটখিটে মেজাজ

• মানসিক বিষণ্নতা

• হার্টের অসুখ, অনিয়মিত হৃত্স্পন্দন

• ডায়াবেটিস

• ডিপ্রেশন বা হতাশা

• যৌনশক্তি হ্রাস

• উচ্চ রক্তচাপ

• স্ট্রোকের ঝুঁকি।

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

• কারোর যদি উচ্চ শব্দে নাকডাকার অভ্যাস থাকে (যা পাশের ঘর থেকে শোনা যায়) এবং ঘুমে পাঁচ বা তার অধিকবার দম বন্ধ হয়।

• কেউ যদি অফিসে, বাসে, নির্জনে বা টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যায়।

• কারো মুখ হাঁ করলে তালু ও আলজিহ্বা সহজে না দেখা গেলে বুঝতে হবে তারা এ সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। এ জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। যেমন—

পালস অক্সিমিটার : এই যন্ত্র ঘুমের মধ্যে নাড়ির গতি ও রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা মাপে।

পলিসোমনোগ্রাফি : রাতে স্বাভাবিক ৫-৬ ঘণ্টা ঘুমের সময় পলিসোমনোগ্রাম শরীরে লাগিয়ে রাখলে প্রয়োজনীয় তথ্য রেকর্ড হয়। এর দ্বারা পুরো রাতের ঘুম পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন পর্যায়ের স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগ নির্ধারণ করা যায়।

স্লিপ এমআরআই অ্যান্ড ড্রাগ ইনডিউসড স্লিপ এন্ডোসকোপি : এই যন্ত্র বাধার পরিমাণ শনাক্ত করে। সে অনুযায়ী অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

করণীয়

• নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওজন আয়ত্তে আনা

• নিয়মিত ব্যায়াম, যেমন-হাঁটা, সাঁতার কাটা ইত্যাদি

• অ্যালার্জি, সর্দি বা ঠাণ্ডা লাগায় সতর্কতা

• বালিশ একটু উঁচু (৪ ইঞ্চি পরিমাণ) রাখা

• যথাসম্ভব মুখ বন্ধ করে ঘুমানো

• ঘুমানোর আগে ক্যাফেইন, দুধ বা অন্য কোনো ভারী খাবার না খাওয়া

• ঘুমের পজিশন পরিবর্তন করা (একটু নড়েচড়ে বাঁ দিকে অথবা ডান দিকে শোয়া)

• নাসারন্ধ্রের পথ পরিষ্কার রাখা

• প্রচুর পানি, শাকসবজি, ফলমূল খাওয়া

• ধূমপান, মদপান পরিহার

• ঘুমানোর দুই ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খাওয়া

• ঘুমের ওষুধ বা সিডেটিভ গ্রহণের অভ্যাস পরিত্যাগ।

 

চিকিৎসা

থেরাপি : সি-প্যাপ (CPAP) নামক এক প্রকার ডিভাইস মাস্ক রয়েছে, যা নাকে লাগিয়ে ঘুমালে মৃদু স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীরা বেশ ভালো ফল পায় ও সুস্থ জীবন যাপন করে। এটা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

সার্জারি : যাদের উচ্চ শ্বাসনালিতে বিভিন্ন লেভেলে নিঃশ্বাস বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং যাদের ঘুমের সময় সি-প্যাপ ব্যবহারে অস্বস্তি লাগে, তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে নাক, তালু, জিহ্বা এমনকি মুখের নিচের চোয়াল সার্জারি করা হয়।


মন্তব্য