kalerkantho


যদি লাগে হিয়ারিং এইড

কম শোনা বা শ্রবণশক্তি হারানো যেকোনো বয়সে হতে পারে। শব্দদূষণ, ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া-ফাঙ্গাসের ইনফেকশন থেকেই সাধারণত শ্রবণশক্তি হ্রাস বা লোপ পায়। তখন হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে দৈনন্দিন জীবনযাপন সহজ করা যায়। লিখেছেন আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের নাক কান গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



যদি লাগে হিয়ারিং এইড

তিনি পেশায় ব্যবসায়ী, বয়স ৬০। কিছুদিন ধরে শুনতে অসুবিধা বোধ করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর শ্রবণশক্তি লোপ পায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় তিনি ভাইরাস ইনফেকশনের কারণে দুই কানে ৬০ শতাংশ ডেসিবল শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। তাঁকে কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি হিয়ারিং এইড ব্যবহার করতে লজ্জা পান, ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চান। কিন্তু তাঁর জন্য হিয়ারিং এইডের চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায় এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে কোনো অসুবিধা হয় না। চোখে যেমন চশমা ব্যবহার করি, সে রকম কম শোনার চিকিৎসা হিসেবে এটি ব্যবহার করা যেতেই পারে।  

 

শ্রবণশক্তি হারানো

প্রতিনিয়ত এমন কিছু পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়, যাতে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে শোনার ক্ষমতা লোপ পায়।

আর এই শ্রবণশক্তি হারানোর ঘটনা যেকোনো বয়সেই হতে পারে।

আবার বয়স বাড়লে শারীরবৃত্তীয় অনেক পরিবর্তন হয়, তার মধ্যে শ্রবণশক্তি হ্রাস অন্যতম। শ্রবণশক্তি হারানো মানে শুধু উচ্চ শব্দ শুনতে না পারা নয়। এর অর্থ হলো কোনো কিছু বোঝা ও বিভিন্ন কথার শব্দকে পার্থক্য করতে না পারা।

যদি শ্রবণশক্তি হারানোর চিকিৎসা না করা হয় অথবা দেরি হয়, তাহলে শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো কিছু জানার ক্ষমতা, ভাষা দক্ষতা ও বুদ্ধি বিকাশ ক্ষমতা কমে যায়।

শ্রবণশক্তি হারানো মানুষ বিচ্ছিন্ন, দুর্বল, একাকিত্বে ভোগে। কানে শোনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি ও মানসিক ত্রুটি দেখা যায়। যা শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুলে অথবা যেকোনো বয়সের মানুষের কর্মস্থল ও সামাজিক কার্যকলাপে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

 

শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ

►  অধিক বয়স

►  ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস দিয়ে বারবার সংক্রমণ

►  দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের ভেতর বসবাস বা কাজ করতে থাকা

►  কানে ময়লা জমা হয়ে কান বন্ধ হয়ে যাওয়া

►  কানে ফাংগাল ইনফেকশন হওয়া।

 

অন্যান্য কারণ

►  জন্মগত ত্রুটি

►  কানে আঘাত

►  বংশগত কারণ

►  কানে ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগ

►  কান বা ব্রেইনের টিউমার।

 

কখন উচ্চ শব্দ ক্ষতিকর

কখন শব্দ উচ্চ শব্দ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়, তা নির্ভর করে একেকজনের শ্রবণশক্তির ওপর। যখন শব্দ অস্বচ্ছন্দ হয় বা কানে অস্বস্তি লাগে, তখনই সে শব্দ কানের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। আবার যেসব শব্দযুক্ত স্থানে কানে কম শোনা যায় বা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে ও শুনতে অসুবিধা হয়, ধরে নিতে হবে, ওই স্থানের ওই শব্দ কানের জন্য ভালো নয়। শোনার ক্ষমতা ঠিক রাখতে উচ্চ শব্দের উৎস থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। অনেক সময় সরে আসা সম্ভব না হলে প্লাগ ব্যবহার করে কান রক্ষা করতে হবে। যেমন গানের অনুষ্ঠান, বিয়েশাদির ব্যান্ডবাদ্যির শব্দ ইত্যাদিতে। এয়ারফোনে উচ্চ শব্দে গান শোনাও কানের জন্য ক্ষতিকর।  

 

শ্রবণশক্তি হারানোর ধরন

কনডাকটিভ বধিরতার জন্য বহিঃকর্ণ থেকে অন্তঃকর্ণে শব্দ যেতে যেতে এর তীব্রতা কমে যায়। সাধারণত মেডিসিন অথবা সার্জারি চিকিৎসার মাধ্যমে কনডাকটিভ বধিরতার চিকিৎসা করা যায়।

যদি সার্জারি করা সম্ভব না হয় সেখানে হিয়ারিং এইড সবচেয়ে ভালো মাধ্যম বলে মনে করা হয়। অন্তঃকর্ণের সেনসরি কোষ ও নার্ভ ফাইবারের ক্ষতির কারণে সেনসরি নিউরাল শ্রবণশক্তি হারায়। অন্যদিকে মধ্যকর্ণ ইয়ার ক্যানাল ও বহিঃকর্ণের ক্ষতির কারণে কনডাকটিভ শ্রবণশক্তি কমে যায়।

অনেকের ক্ষেত্রে দুই ধরনের শ্রবণশক্তিই একসঙ্গে লোপ পায় বা কমতে থাকে। একে বলা হয় মিক্সড হিয়ারিং লস বা মিশ্র শ্রবণশক্তি হ্রাস।

 

হিয়ারিং এইড

কানের পেছনে (বিটিই) : এগুলো ব্যবহারকারীর কানের পেছনে আটকে রাখতে হয় ও কানের ভেতরের সঙ্গে একধরনের প্লাস্টিক দিয়ে সংযুক্ত করা হয়। সাধারণত সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানো লোকের ক্ষেত্রে বিটিই ব্যবহার করা হয়।

কানের ক্যানেলের ভেতরে (আইটিই) : এ ধরনের মডেল কানের ক্যানেলের ভেতরে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। সাধারণত আকারে ছোট হয়। একেকজনের জন্য একেক আকারের যন্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।

সম্পূর্ণ কানের ভেতর (সিআইসি) : এগুলো সবচেয়ে ছোট ও সর্বশেষ আবিষ্কৃত হিয়ারিং এইড। এটা কানের ক্যানেলের ভেতর কানের পর্দার কাছে স্থাপন করা হয়। যেসব রোগী হিয়ারিং এইড দেখাতে চান না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সিআইসি হিয়ারিং ব্যবহৃত হয়। সিআইসি হিয়ারিং এইডের দাম খুব বেশি এবং এটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। এগুলো সাধারণ থেকে মাঝারি শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের জন্য এটা ততটা উপযোগী নয়।

বডি ওর্ন হিয়ারিং এইড : এই হিয়ারিং এইডগুলো মাইক্রোফোন এমপ্লিফায়ার একটি কর্ডবিশিষ্ট রিসিভার এবং ইয়ার মোল্ড। এগুলো সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানোদের জন্য ব্যবহার করা হয়। অথবা অন্যান্য হিয়ারিং এইড যদি কেউ ব্যবহার করতে না পারেন তখন এই হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেন।

 

হিয়ারিং এইড আসলে কী?

হিয়ারিং এইড আসলে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যেখানে মিনি মাইক্রোফোনসহ একটি লাউড স্পিকার ও একটি রিসিভার থাকে। এটার কাজ হলো কানে শব্দ এনটিনসিফাই ও এমপ্লিফাই করা। মাইক্রোফোনের কাজ হলো শব্দতরঙ্গকে ইলেকট্রনিক সিগন্যালে পরিণত করা।

এমপ্লি ফিটারের কাজ হলো এই ইলেকট্রনিক সিগন্যালকে এমপ্লিফাই করা। এই এমপ্লিফাই ভলিউম কন্ট্রোল দিয়ে কন্ট্রোল করা যায়। রিসিভার এমপ্লিফাই ইলেকট্রনিক সিগন্যালকে শব্দে রূপান্তরিত করে। ইয়ার মোল্ড কানের ভেতরে থাকে; আর এটা এমনভাবে ব্যবহারকারীর কানে প্রতিস্থাপন করা হয়, যাতে শব্দ ঠিকমতো কানে পৌঁছে।

 

কখন দরকার?

অনেক সময় রোগী বুঝতে পারেন না তাঁর হিয়ারিং এইড দরকার। কারণ অনেক সময় কানে শোনার শক্তি ধীরে ধীরে লোপ পায় বলে রোগী টের পান না। কিন্তু আশপাশের মানুষ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারেন, স্বাভাবিকের চেয়ে জোরে কথা বলতে হচ্ছে এবং তিনি ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছেন না। এ জন্য পরিবার ও সহকর্মীরা হিয়ারিং এইড ব্যবহারের বিষয়ে তাঁকে বলতে পারেন। আর যখন শ্রবণশক্তি বেশি লোপ পায় তখন রোগী নিজেও বোঝেন, অনেক সময় তিনি টিভির শব্দ ঠিকমতো শোনেন না, নিজেও জোরে কথা বলেন। তখন উচিত হলো নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হিয়ারিং এইড ব্যবহার শুরু করা।

কতটুকু শ্রবণশক্তি হারিয়েছে তার ওপর নির্ভর করে কী ধরনের হিয়ারিং এইড দরকার। কখনো একটি ও কখনো দুটি হিয়ারিং এইডও ব্যবহার করা দরকার হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, শ্রবণশক্তি কমে গেলে দুই কানেই হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা ভালো। কারণ এতে কম পাওয়ারের এইড লাগে, রোগী শব্দ ভালো শুনতে পান, উচ্চ শব্দ টের পান এবং সেখান থেকে সরে যেতে পারেন, শব্দের উৎস সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন।  

 

শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেয়?

না, হিয়ারিং এইড সাধারণ শ্রবণশক্তি ফেরাতে পারে না। এটি কানের ভেতরে শব্দের মাত্রা বাড়ায়। এ ছাড়া এটি শব্দের উৎস সম্পর্কে ধারণা দেয়।

 

ফলোআপ

ফলোআপের দরকার আছে। কারণ শ্রবণ পরিবর্তন হতে পারে ও শ্রবণক্ষমতা কমবেশি হতে পারে। এগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হবে, যাতে শ্রবণশক্তি হারানো প্রতিরোধ করা যায়। হিয়ারিং এইড নেওয়ার পর নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। আপনার হিয়ারিং এইডও পরীক্ষা করতে হবে। এই চেকআপ প্রতিবছর করতে হবে।


মন্তব্য