kalerkantho


ফোবিয়া : অযৌক্তিক ভীতি

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ফোবিয়া : অযৌক্তিক ভীতি

অনেক কিছুতে আমরা ভয় পাই, এর মধ্যে কিছু অমূলক ভয় আছে। কিন্তু অনেকেই তাতে ভীষণভাবে ভোগেন। অনেক সময় এই অযৌক্তিক ভয়ের মাত্রা এত বেশি হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনযাপনে তার প্রভাব পড়ে। অনেক সময় দরকার হয় চিকিৎসার। লিখেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. আহমেদ হেলাল

 

 

শায়লার বয়স একুশ। ছোটবেলা থেকেই তার মাকড়সার ভীতি। যে ঘরে একটি ছোট্ট মাকড়সা দেখা যাবে সেই ঘরে তাকে কোনভাবেই ঢোকানো যাবে না। এমন হয়েছে যে সে কারো বাসায় বেড়াতে গিয়ে মাকড়সার জাল দেখে ছিটকে বেরিয়ে চলে এসেছে। এমনকি মাকড়সার ছবি দেখেও সে প্রায়ই চিৎকার করে ওঠে।

সাব্বিরের সমস্যা অন্য ধরনের। তার বয়স প্রায় তিরিশ।

সে উঁচু  জায়গা থেকে নিচে তাকাতে ভয় পায়। বড় বিল্ডিংয়ের ছাদ তো দূরের কথা, জানালার কাছেও সে যায় না। চার-পাঁচতলার ওপর কারো বাসায় সে দাওয়াত খেতে যায় না- চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে অফিস ১২ তলায় দেখে সে ইন্টারভিউ না দিয়ে নিচ থেকেই ফেরত এসেছে।

ভয় বা ভীতি কিন্তু মানুষের একেবারে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই ভীতি যদি অযৌক্তিক হয়, তখন সেটাকে বলা হয় ফোবিয়া বা অযৌক্তিক ভীতি। ফোবিয়ার লক্ষণ হচ্ছে উপযুক্ত কারণ নেই, তবু্ও বিশেষ কিছু পরিস্থিতি বা বস্তু বা প্রাণী থেকে অযৌক্তিক ভয় পাওয়া। যেমন—টিভিতে সাপ দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করা, উঁচু জানালা থেকে বাইরে তাকালে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়া ইত্যাদি।   আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে, যেসব বিষয়ে ব্যক্তিটির অযৌক্তিক ভয় আছে সেই বিষয় বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। যেমন—যিনি মানুষের ভিড় বা খোলা জায়গা ভয় পান, তিনি দাওয়াতে যান না, বাজারে যান না, প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়াতে যান না। যিনি বদ্ধ জায়গায় ভয় পান তিনি সব সময় ঘরের দরজা খোলা রাখেন, লিফটে ওঠেন না। আর কখনো যদি এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়েই যান তখন তাঁর মধ্যে উৎকণ্ঠা বা উদ্বিগ্নতার লক্ষণগুলো তৈরি হয়। যেমন—রক্তচাপ পরিবর্তিত হওয়া, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসা, বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া, মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, চিৎকার করা, অস্বাভাবিক আচরণ করা, মুখের ভেতরটা শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

কেন হয় ফোবিয়া? কোনো কারণ ছাড়া সাধারণত এটা হয় না।  

শৈশবের ঘটনা-দুর্ঘটনা, একজন মানুষের বেড়ে ওঠা, তার মনের গড়ন, পরিবার, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি কারণে ফোবিয়া হতে পারে। সাধারণভাবে ফোবিয়া কয়েক ধরনের হতে পারে।

সুনির্দিষ্ট ফোবিয়া: বিশেষ বস্তু বা বিশেষ পরিস্থিতির প্রতি অহেতুক  অযৌক্তিক ভয়। যেমন—কোনো বিশেষ প্রাণী বা পোকার প্রতি ফোবিয়া, অন্ধকার দেখে উদ্বিগ্ন হওয়া, উঁচু জায়গায় উঠে পড়ে যাওয়ার ভয় পাওয়া ইত্যাদি। অনেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে নিজেকে প্রকাশ করতে ভীষণভাবে অস্বস্তিবোধ করে। এটাও কিন্তু ফোবিয়া।

প্রকৃতপক্ষে ভয় পাওয়ার মতো কোনো কারণ না থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ ভয় পায় সেটাই ফোবিয়া। যেমন—সাপ কাছে এলে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক কিন্তু সাপের ছবি বা ভিডিও দেখে ভয় পাওয়াটা অযৌক্তিক বা ফোবিয়া। ফোবিয়ার চিকিৎসায় প্রধানত সাইকোথেরাপি, কগনিটিভ থেরাপি, বিহেভিয়ার থেরাপি ইত্যাদির সাথে উৎকণ্ঠাবিরোধী ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। একটু ধৈর্য ধরে চিকিৎসা করালে ভালো ফল পাওয়া যায়। যে বিষয় বা পরিস্থিতির প্রতি ফোবিয়া আছে সেটিকে এড়িয়ে না চলে ধাপে ধাপে সেটির সয়েঙ্গ নিজেকে পরিচিত করাতে হবে। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।  

 

বিশেষ কিছু ফোবিয়া

উচ্চতাভীতি—অ্যাক্রোফোবিয়া: উঁচু স্থানে উঠতে ভয় পান বা ওপর থেকে নিচে তাকাতে পারেন না। যাদের এ ধরনের ভীতি রয়েছে তারা বিনোদনকেন্দ্রের বিভিন্ন রাইডে উঠতেও ভয় পান। অতিমাত্রায় এ ভীতি থাকলে কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

বদ্ধ জায়গার ভীতি—ক্লস্ট্রোফোবিয়া : এ ধরনের অসুখে যাঁরা ভোগেন তাঁদের সব সময় মনে হয় ছোট কোনো ঘরে তাঁরা আটকে যাবেন বা দম বন্ধ হয়ে যাবে। জানালা খোলা রাখেন। অনেক সময় তাঁরা ঘরের দরজা বন্ধ রাখতেও ভয় পান। অপরিচিত জায়গার কোনো ঘর হলে এ ভয় আরো বেশি হয়। এঁরা লিফটে উঠতেও ভয় পান।

পানিভীতি—অ্যাকুয়াফোবিয়া: এ ধরনের ভীতিতে যাঁরা ভোগেন তাঁরা সমুদ্রে যাত্রা করতে পারেন না, সমুদ্রে গোসলও করতে পারেন না, নদীতেও তাঁদের সমান ভীতি। এমনকি অনেকে বাথটাবের পানিকেও ভয় পান।

মাকড়সাভীতি—অ্যারাকনোফোবিয়া: মেয়েদের মধ্যে এই ভীতি বেশি। মাকড়সা না দেখলেও হঠাৎ করে তাঁরা ঘরের কোণে, বাথরুমে, রান্নাঘরে ইত্যাদি জায়গায় মনে করেন মাকড়সা আছে। মাকড়সার জাল বা মাকড়সা দেখলে তো এই ভীতি আরো বেশি মাত্রায় হয়।

সাপভীতি—অফিডিয়ো ফোবিয়া: আরেক নাম হার্পেটট্রোফোবিয়া। এরা সাপ নিয়ে এমন ভীত থাকে যে গ্রামের বা মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতে ভীষণ ভয় পায়। কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশে সাপ আছে ভেবে ও ধরনের পরিবেশ এড়িয়ে চলেন।

কুকুরভীতি—সাইনোফোবিয়া: কমবেশি বহু মানুষের মধ্যে এটি আছে। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কুকুর মানুষকে আগে আক্রমণ করে না কিন্তু এ রোগে আক্রান্তরা মনে করে কুকুর বুঝি তাকে আক্রমণ করার জন্যই অপেক্ষা করছে।

সামাজিকভীতি—সোশ্যাল ফোবিয়া: এটি উদ্বিগ্নতাজনিত একটি রোগ। এতে আক্রান্তরা পরিচিত মানুষের সমাগম হয় এমন স্থান এড়িয়ে চলে। তারা মনে করে অন্যরা তার কেবল দোষত্রুটি বের করছে আর তাকে ক্ষুদ্র মনে করছে বা অবজ্ঞা করছে।

বড় খোলা জায়গা বা ভিড়ের প্রতি ভীতি— এগোরাফোবিয়া: এটিও উদ্বিগ্নতাজনিত অসুখ। এতে আক্রান্তরা খোলা জায়গায় যেতে ভয় পায়। বড় মাঠ বা বিশাল সমতলভূমি বা সমুদের পাড়— সব জায়গাতেই নিজেকে অনিরাপদ ভাবে।

বজ্রপাতভীতি—অ্যাস্ট্রাফোবিয়া: ব্রনটোফোবিয়া, কেরানোফোবিয়া, টোনিট্রোফোবিয়া নামেও পরিচিত। বজ্রপাতের শব্দ হলেই এরা আতঙ্কবোধ করে। বজ্রপাতের ভয়ে ঘরের বাইরে যেতে চায় না। এটাও চিকিৎসাযোগ্য অসুখ।

মাইসোফোবিয়া : এটা একধরনের শব্দভীতি। কিছু কিছু মানুষ বিশেষ তরঙ্গের শব্দ শুনে ভয় পায়। সাধারণত মুখ দিয়ে উচ্চারিত শব্দ থেকেই এরা ভয় পায়। এ ধরনের শব্দের মধ্যে আছে হাইতোলা, শিস, খাবার চিবানো, খাবার খাওয়া ইত্যাদি থেকে তৈরি শব্দও।

মানুষের সামনে কথা বলার ভীতি— গ্নসোফোবিয়া: উদ্বিগ্নতা থেকেই এই ভীতি তৈরি হয়। বিশেষ করে বহু মানুষের সামনে কথা বলতে গেলে এরা শব্দ জড়িয়ে ফেলে, বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারে না, হাত-পা ঘামতে থাকে, অনেক সময় আবোল তাবোল ও অস্পষ্ট শব্দও বলে।

যেকোনো পাখিভীতি— অর্নিথোফোবিয়া: ছোট বা বড় পাখি যেমনই হোক, এ রোগে আক্রান্তরা পাখিকে শত্রু মনে করে এবং ভীষণ ভয় পায়।

রক্তভীতি—হেমোফোবিয়া: অনেকের মধ্যেই আছে। এরা রক্তদান করতে পারে না, এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অল্প রক্ত দিতে ভীষণ ভয় পান। এমনকি অন্য কারো রক্ত ঝরছে এটা দেখতেও পারেন না। অনেক সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

অন্ধকারভীতি—নিক্টোফোবিয়া: মস্তিষ্কের চিন্তা করার ক্ষমতাজনিত একটি অসুখ। এতে আক্রান্তরা অন্ধকারকে ভীষণ ভয় পান। সামান্য সময়ের জন্যও অন্ধকার সহ্য করতে পারেন না।

চুলভীতি- চ্যাটোফোবিয়া: এরা মানুষের চুল বা পশুর লোম—সব দেখেই ভয় পান। এতে আক্রান্তের সংখ্যা কম।

 


মন্তব্য