kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেনিনজাইটিস : প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা

মেনিনজাইটিস হতে পারে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক দিয়ে। শুরুর দিকে সামান্য জ্বর, মাথা ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ থাকে। মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হলে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সা না করালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিণতি ভালো হয় না। লিখেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আহমেদ হোসেন চৌধুরী হারুন

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মেনিনজাইটিস : প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা

মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের (স্নায়ুরজ্জু) আবরণ বা মেনিনজেসের আচ্ছাদনের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশনের কারণে মস্তিষ্ক ও শরীরের বিভিন্ন অংশে নানা রকম উপসর্গ দেখা দেয়। এটাই মেনিনজাইটিস নামে পরিচিত।

 

কিভাবে রোগ ছড়ায়

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্য কোনো জীবাণু সরাসরি রক্তপ্রবাহে ঢুকে (দুর্ঘটনা, আঘাত/নাক, কান, মাথার অপারেশন/সাইনাসের ইনফেকশন ইত্যাদি) মেনিনজাইটিস করতে পারে। এমনকি খাবারের মাধ্যমে জীবাণু পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে সেখান থেকে রক্তে চলে গিয়েও মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের আবরণীতে প্রদাহ বা মেনিনজাইটিস করতে পারে। সাধারণত রোগীর সরাসরি সংস্পর্শ থেকে রোগ ছড়ায় না। রক্তে যখন জীবাণুর সংক্রমণ বা সেপটিসেমিয়া হয়, তখন তা দ্রুত মেনিনজাইটিসে রূপান্তরিত হতে পারে।

 

ধরন

যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিস অতি অল্প সময়ে হয়ে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদি মেনিনজাইটিসও হতে পারে। তাই বলা হয়, মেনিনজাইটিস দুই ধরনের:

অ্যাকিউট মেনিনজাইটিস বা দ্রুত ইনফেকশন, যা জীবাণু প্রবেশের দুই সপ্তাহের মধ্যে হয়।

ক্রনিক মেনিনজাইটিস বা ধীরগতির ইনফেকশন, যা জীবাণু শরীরে প্রবেশের চার সপ্তাহ বা তার বেশি সময় পরে প্রকাশ পায়।

 

কারণ

ভাইরাস দিয়েই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিস হয়ে থাকে, তবে ব্যাকটেরিয়াঘটিত মেনিনজাইটিস বেশি মারাত্মক হয়। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে ছত্রাক, প্রটোজোয়া দিয়েও মেনিনজাইটিস হতে পারে। আবার ক্যান্সার, সারকয়ডোসিস, মোলারটাস ইত্যাদিতে আক্রান্ত হলে বা কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও মেনিনজাইটিস হতে পারে।

এন্টারোভাইরাস, হারপিস, এইচআইভি, ভেরিসিলা, এপিসটিনবার, মাম্পস, মিসেলস ও রেবিস ভাইরাস।

দায়ী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে আছে স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি, নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, স্টেফাইলোকক্কাস, মাইকোব্যাকটেরিয়াম, সিফিলিস, মাইকোপ্লাজমা, সিউডোমোনাস ইত্যাদি। আর ছত্রাকের মধ্যে আছে ক্যানডিডা, হিস্টোপ্লাজমা, বাসটোসাইটোসিস, এসপারজিলাস ইত্যাদি।

 

লক্ষণ

প্রথম দিকে ফ্লু বা সর্দিকাশির মতো সাধারণ জ্বরের উপসর্গ থাকে। দুই বছরের বেশি বয়সীদের সাধারণত এই উপসর্গগুলো থাকে :

►        হঠাৎ তীব্র জ্বর হয়।

►        প্রচণ্ড মাথা ব্যথা হয়, যা সাধারণ মাথা ব্যথার মতো নয়।

►        ঘাড় শক্ত হয়ে যায়; এদিক-ওদিক নাড়ানো কঠিন হয়।

►        প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগীর অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা থাকে।

►        খিঁচুনি দেখা দেয়।

►        ক্রেনিয়াল স্নায়ু আক্রান্ত হয়ে স্নায়বিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

►        ঘুম-ঘুম ভাব হয়, হাঁটতে অসুবিধা হয়।

►        আলোর দিকে তাকাতে তীব্র অস্বস্তি বোধ হয়।

►        ক্ষুধা ও পিপাসার অনুভূতি কমে যায় বা হয় না।

►        কানের মধ্যে সংক্রমণের ফলে বধিরতা সৃষ্টি হয় (সেন্সরি নিউরাল ডেফনেস)।

►        হাত-পা অবশ হয়, একই বস্তু একাধিক দেখা যায়, কথা বলতে অসুবিধা হতে পারে।

►        মস্তিষ্কের সমস্যা ছাড়াও শরীরের অন্যান্য স্থানেও সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন—ফুসফুসের ইনফেকশন ও শ্বাসকষ্ট হওয়া, সেফটিসেমিয়ার কারণে গিঁটে গিঁটে ব্যথা।

►        থ্রম্বোসাইটেপেনিয়া বা অনুচক্রিকা রক্ত উপাদান কমার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত ঝরতে পারে।

►        শরীরের বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট দানার মতো দাগ বা র‍্যাশ হতে পারে।

নবজাতকের ক্ষেত্রে—

►        উচ্চ জ্বর।

►        ঘাড় ও শরীর শক্ত হয়ে আসা।

►        অনবরত কান্না করা।

►        দুর্বল হয়ে যাওয়া।

►        সারাক্ষণ ঘুম-ঘুম ভাব।

►        শরীর সাদা হয়ে যাওয়া।

►        খিটখিটে মেজাজ হওয়া।

►        খিঁচুনি।

►        জন্ডিস।

►        নড়াচড়া কম করা।

►        বমিভাব বা বমি করা।

►        মাথার তালুর নরম জায়গা ফুলে ওঠা।

►        অজ্ঞান হওয়া ইত্যাদি।

 

যাদের বেশি হয়

মেনিনজাইটিস প্রতিরোধযোগ্য না হলেও কিছু মানুষ আক্রান্ত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এর মধ্যে আছে—

►        যারা টিকা নেয়নি বা টিকা নিয়েছে কিন্তু ডোজ সম্পূর্ণ করেনি।

►        শিশু—সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সীরা বেশি আক্রান্ত হয়।

►        গাদাগাদি করে বা নোংরা পরিবেশে বসবাসকারী কিশোর-তরুণ।

►        গর্ভবতী।

►        অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগী, যেমন—এইডস, ডায়াবেটিস ইত্যাদি।

 

জটিলতা

►        ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস যথাসময়ে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে চিকিত্সা করা না হলে রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি।

►        বধির হওয়া।

►        স্মৃতিশক্তি হারানো।

►        নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হারানো।

►        কিডনি বিকল।

►        খিঁচুনি।

 

রোগ নির্ণয়

মূলত উপসর্গ দেখেই চিকিৎসকরা রোগটি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে থাকেন। তার পরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে; যেমন—

►        ব্লাড কালচার বা রক্তের কালচার। এর মাধ্যমে কোন জীবাণু দিয়ে সংক্রমণ ঘটেছে তা নির্ণয় এবং ওই জীবাণুটির বিরুদ্ধে কোন ওষুধ কার্যকর হবে তা বের করা হয়।

►        ব্লাড কাউন্ট। এর মাধ্যমে দেখা হয় রক্তে শ্বেতকণিকার সংখ্যা ঠিক আছে কি না। যদি তা বাড়ে তাহলে মেনিনজাইটিস হিসেবে শণাক্ত করা হয়।

►        সিটিস্ক্যান ও এমআরআই করে দেখা হয় মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের আবরণীতে প্রদাহ হয়েছে কি না।

►        সেরাম ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা। মেনিনজাইটিসে হাইপোনেট্রোমিয়া হয়।

►        সিএসএফ পরীক্ষার মাধ্যমে জীবাণুর উপস্থিতি ও জীবাণু শনাক্তকরণ।

►        এমটি টেস্ট বা টিবি টেস্ট। প্রায়ই মেনিনজাইটিসের রোগীর শরীরে টিবির জীবাণু পাওয়া যায়।

►        এক্স-রে। এর মধ্যে আছে বুকের এক্স-রে, সাইনাসের এক্স-রে, স্কালের এক্স-রে, প্রেট্রাস   এক্স-রে ইত্যাদি।

 

চিকিৎসা

রোগের লক্ষণ দেখামাত্রই চিকিত্সা শুরু করে দিতে হয়; তা না হলে মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। ওষুধ প্রয়োগে যদি কার্যকর ফল পাওয়া যায়, যেমন— জ্বর কমে যায়, তার পরও ৭ থেকে ১০ দিন ওষুধ ও চিকিত্সা চালিয়ে যেতে হয়। ব্যাকটেরিয়াঘটিত মেনিনজাইটিসে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক শিরাপথে প্রয়োগ করতে হয়। যেমন—শিশু ও নবজাতকের ক্ষেত্রে অ্যামপিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন, বড়দের ক্ষেত্রে পেনিসিলিন জি, অ্যামপিসিলিন, ভ্যানকোমাইসিন, সেফালোস্পোরিন লাগতে পারে। টিবিজনিত মেনিনজাইটিসে অ্যান্টিটিবি ওষুধ ও স্টেরয়েড দিতে হয়।

ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস সাধারণত ওষুধ ছাড়াই চিকিত্সা করা হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ, যেমন—অ্যাসাইক্লোভির বা ফোসাইক্লোভির দিতে হয়। ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিসে পরিপূর্ণ বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল পান ও জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল সেবন করতে হয়।


মন্তব্য