kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

হাঁটু প্রতিস্থাপন

আর্থ্রাইটিস, আঘাতসহ বহু কারণে হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে সাধারণ কাজকর্মসহ হাঁটাচলার অসুবিধাও হয়। এমনকি বসে বা শুয়ে থাকলেও ব্যথা অনুভূত হয়। তখন প্রয়োজন পড়ে অপারেশন করে হাঁটু প্রতিস্থাপনের। পরামর্শ দিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড রিহ্যাব (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতাল ঢাকার সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হাঁটু প্রতিস্থাপন

হাঁটু প্রতিস্থাপন অপারেশন প্রথম হয় ১৯৬৮ সালে। তখন এ ধরনের সার্জারি খুব কম হলেও এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর বহু সার্জারি হচ্ছে।

বাংলাদেশেও এখন হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারি হয়। আমেরিকান অর্থোপেডিক সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু আমেরিকায়ই বছরে ছয় লাখ হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারি হয়।

 

হাঁটু

শরীরের সবচেয়ে বড় অস্থিসন্ধি এটি। দাঁড়ানো থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে এই সন্ধি। ঊরুর হাড় বা থাইবোন বা ফিমারের নিচের প্রান্তের সঙ্গে শিনবোন বা টিবিয়ার ওপরের প্রান্ত ও নিক্যাপ বা প্যাটেলা সম্মিলিতভাবে এই সন্ধিটি তৈরি করে।

 

কেন লাগে হাঁটু প্রতিস্থাপন?

অনেকভাবে হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে বড় কারণ আর্থ্রাইটিস বা বাত। এর মধ্যে তিন ধরনের আর্থ্রাইটিস সন্ধির বেশি ক্ষতি করে। এগুলো হচ্ছে—

অস্টিওআর্থ্রাইটিস : সাধারণ বয়সজনিত অসুখ এটি। এতে সন্ধি ক্ষয়ে যায়, সন্ধির চারপাশের লিগামেন্টগুলো আংশিক বা পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়। অস্টিওআর্থ্রাইটিস সাধারণত ৫০ বছরের পর হয়; তবে যেকোনো বয়সেও এ রোগ হতে পারে। এতে সাধারণত হাঁটু ক্রমেই শক্ত হয়ে যায় ও ব্যথা করে।

রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস : হাঁটু সন্ধির চারপাশে থাকা সাইনোভিয়াল মেমব্রেন মোটা হয়ে যায় ও প্রদাহে আক্রান্ত হয়। প্রদাহের কারণে সন্ধির ভেতরের কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ক্ষয়ে যায় ও ব্যথা শুরু হয়।

আঘাতজনিত আর্থ্রাইটিস : হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার কিছুদিন পর এ রোগ শুরু হয়। অনেক সময় আঘাতে হাঁটু সন্ধির চারপাশের হাড়ে চিড় ধরে, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়।

 

প্রতিস্থাপন

হাঁটু প্রতিস্থাপন নি-আর্থোপ্লাস্টি নামেও পরিচিত। সহজভাবে বললে, এ সার্জারিতে হাঁটুর সব হাড় সরানো হয় না। সন্ধির কিছু অংশ সরিয়ে সেখানে ধাতব অংশ বসিয়ে আবার ব্যবহারযোগ্য একটি অস্থিসন্ধি তৈরি করা হয়। এ জন্য প্রথমে সন্ধির ক্ষতিগ্রস্ত কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ছেঁচে উঠানো হয়, এরপর ওই স্থানে মেটাল বা ধাতব অংশ প্রতিস্থাপন করা হয়। তারপর প্যাটেলার কিছু অংশও ছেঁচে সেখানে প্লাস্টিক প্রতিস্থাপন করা হয়। সবশেষে সন্ধির অভ্যন্তরে উন্নতমানের প্লাস্টিক দিয়ে গ্লাইডিং সারফেস তৈরি করা হয়।

 

কখন হাঁটু প্রতিস্থাপন জরুরি?

♦          আর্থ্রাইটিস বা আঘাতের কারণে হাঁটুতে তীব্র ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া, হাঁটাচলার অসুবিধা হলে। যেমন—সিঁড়ি ভাঙতে না পারলে, চেয়ারে উঠতে ও বসতে অসুবিধা হলে, লাঠি বা অন্য কিছুর সাহায্য নিয়ে হাঁটতে হলে।

♦          শুয়ে-বসে থাকলেও মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার হাঁটু ব্যথা থাকলে।

♦          হাঁটুর ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, যা ওষুধ প্রয়োগের পরও ভালো হয় না।

♦          হাঁটুর গঠনগত ত্রুটি।

♦          ওষুধ, ইনজেকশন, ফিজিক্যাল থেরাপি ও অন্যান্য সার্জারিতেও যখন হাঁটুর সমস্যা ভালো হয় না, তখন।

 

সার্জারির আগে

♦          সার্জারির আগে সাধারণ কিছু পরীক্ষা করে দেখা হয় রোগী সার্জারির জন্য উপযুক্ত কি না। এ ছাড়া সার্জারির পরে

রোগী কতখানি কর্মক্ষম হতে পারে সে বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়।

♦         হাঁটু সন্ধির নাড়াচাড়া, শক্তি, লিগামেন্ট ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

♦          এক্স-রেসহ আরো কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। যেমন— এমআরআই।

♦          রোগীর হার্টের অসুখসহ অন্যান্য মারাত্মক রোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়।

♦         রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা, ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রামও করে দেখতে হয়।

 

সার্জারির খরচ

খরচ নির্ভর করে কোন হাসপাতালে করা হচ্ছে, কী ধরনের ধাতব ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, রোগীর হাঁটুর অবস্থা কেমন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর। বাংলাদেশে মূলত খরচ বেশি হয় হাঁটুর কৃত্রিম সন্ধির জন্য। যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই সন্ধি সাধারণত এক লাখ ৪০ হাজার টাকার মতো দাম। বাকি খরচ হাসপাতাল, ডাক্তার ও ওষুধের।

 

ফল

সাধারণত হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারির সফলতার হার ৯০ শতাংশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী সার্জারির পর আগের চেয়ে সহজে হাঁটাচলা করতে পারে। ব্যথা কমে যায়। কিন্তু একেবারে সুস্থ মানুষের মতো হাঁটু আর কখনোই হয় না। যেমন—খেলাধুলা করার মতো ভালো হাঁটু হয় না। আবার হাঁটু প্রতিস্থাপনের পরও যত্ন করতে হয়, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সার্জারির পর দৌড়ানো, জগিং, লাফানো ইত্যাদি নিষেধ করা হয়।

 

জটিলতা

সার্জারির পরও কিছু কিছু জটিলতা হতে পারে। দুই থেকে তিন ভাগ ক্ষেত্রে মারাত্মক কিছু জটিলতাও দেখা দিতে পারে। জটিলতার মধ্যে আছে ইনফেকশন, রক্ত জমাট বাঁধা, ইমপ্ল্যান্ট জটিলতা, ব্যথা, স্নায়ু ইনজুরি ইত্যাদি। এর মধ্যে বেশি ঘটে সার্জাার করা সন্ধির ভেতর রক্ত জমাট বাঁধা। যদি হাঁটুর নিচের মাংসপেশিতে ব্যথা বাড়তে থাকে, সন্ধির ওপরে বা নিচে লালচে বর্ণ ধারণ করে, নতুন করে হাঁটু বা গোড়ালি বা পায়ের কোথাও ফুলে যায়, তাহলে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা হচ্ছে বলে অনুমান করা হয়।

অনেক সময় রক্তনালিতে জমাট রক্ত ফুসফুসে গিয়ে মারাত্মক জটিলতাও তৈরি করে। এর মধ্যে আছে হঠাৎ শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব, কাশির সঙ্গে বুকে ব্যথা ইতাদি। এ ধরনের যেকোনো অসুবিধা দেখা দেওয়া মাত্র ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

ইনফেকশনের লক্ষণের মধ্যে আছে শরীরে অল্পমাত্রায় জ্বর, যা প্রায় সব সময় থাকে। হঠাৎ শরীর ঠাণ্ডা হয়ে জ্বর কমে যাওয়া, হাঁটুতে লালচে ভাব, চাপ দিলে ব্যথা বা ফুলে যাওয়া, অপারেশনের স্থান থেকে রস বা পুঁজ বের হওয়া, সন্ধিতে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি।

 

সার্জারির পর

সার্জারির পর বাড়িতে এসে রোগীর কিছু বিষয় মেনে চলতে হয়। হাঁটু প্রতিস্থাপনের সফলতা নির্ভর করে রোগীর ওপরও। কারণ বাড়তি যত্ন নিতে হয় তাকেই। যেমন—খুব ধীরে ধীরে হাঁটাচলা শুরু করতে হয়, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় হাতল বা লাঠির সহায়তা নিতে হয়, ভারী কিছু বহন করা যায় না, ওজন কম রাখতে হয়, ডাক্তারের নির্দেশিত কিছু ব্যায়াম করতে হয়। এ ধরনের ব্যায়ামের মধ্যে হাঁটা ও ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ। কোনো অবস্থায় পড়ে যেন না যেতে হয় সে বিষয়টি সার্জারির পর বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হয়। পরে অন্যান্য চিকিৎসা গ্রহণ, এমনকি ডেন্টাল চিকিৎসার সময়ও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তাই ডাক্তারকে হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারির কথা আগেই জানানো উচিত।


মন্তব্য