kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ব্রেন টিউমার

নীরব ঘাতক

কিছু রোগ আছে, মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছার আগে নির্ণয় করা যায় না। মস্তিষ্কের অসুখ, বিশেষ করে ব্রেন টিউমার সেগুলোর একটি। যথাসময়ে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিলে ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে, তবে দেরি হওয়ার কারণে রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ে। পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সাবেক প্রধান, ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকার নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এহসান মাহমুদ

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নীরব ঘাতক

বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০ জন। সংখ্যাটি খুব বেশি মনে না হলেও দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, রোগটিতে আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই রোগ নির্ণয় হওয়ার আগেই মারা যায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে।

গ্রামাঞ্চলের দিকে বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় সেখানকার রোগীরা ভালো হাসপাতাল পর্যন্ত আসার আগেই এত বেশি সময় পার হয়ে যায় যে শেষ পর্যায়ে আর চিকিৎসা করা বা না করার মধ্যে পার্থক্য থাকে না।

 

ব্রেন টিউমার কী?

মাথার খুলি দেখতে মাত্র একটি হাড় মনে হলেও তা অনেক হাড় দিয়ে তৈরি। এর ভেতরে থাকে মস্তিষ্ক বা মগজ। খুলির নিচের অংশে একটি বড় ফুটো আছে, যাকে ফোরামেন ম্যাগনাম বলা হয়। এর ভেতর দিয়ে মূলত স্পাইনাল কর্ড নিচে নেমে গেছে। এটা ছাড়াও আরো অনেক ছোট ছোট ফুটো থাকে, যার ভেতর দিয়ে বিভিন্ন নার্ভ ও রক্তনালি যাওয়া-আসা করে। মগজ তিনটি পর্দা দিয়ে ঘেরা এবং ভেতরের দুটি পর্দার মধ্যে পানির মতো এক ধরনের তরল পদার্থ থাকে, যা সিএসএফ বা সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড নামে পরিচিত। শরীরের অন্যান্য অংশের টিউমারের সঙ্গে মগজের টিউমারের একটি বড় পার্থক্য হচ্ছে এই যে খুলির ভেতরে থাকার কারণে মগজের টিউমার খুলির হাড় ভেদ করে বাইরে যেতে পারে না। ফলে এটি সরাসরি মগজের ওপর চাপ দিতে থাকে।

 

ব্রেন টিউমারের উপসর্গ

♦    মাথার ভেতরে চাপ বৃদ্ধি করে, তাই সব সময় মাথায় চাপ চাপ অনুভূতি হতে পারে।

♦    ব্রেনের যে অংশে টিউমার হয়, সেই অংশের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় বা কমে যায় এবং এর আশপাশের মস্তিষ্কের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।

♦    ব্রেনের দূরবর্তী স্নায়ুগুলোতেও চাপ সৃষ্টি করে, কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়।

 

ব্রেনের ভেতর চাপ বৃদ্ধির কারণ

সাধারণ অবস্থায় মাথার খুলির ভেতর মগজ সেরেব্রো-স্পাইনাল ফ্লুইড, রক্ত ইত্যাদির উপস্থিতির কারণে চাপ থাকে। এটি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত স্বাভাবিক। একে বলা হয় ইন্ট্রাক্রেনিয়াল প্রেশার। মগজে টিউমার হয়ে বাড়তে শুরু করলে প্রথম অবস্থায় মগজ সেরেব্রো-স্পাইনাল ফ্লুইড বা সিএসএফ এবং মগজের ভেতর প্রবাহিত রক্তের পরিমাণ কমিয়ে কিছুদিন পর্যন্ত মাথার ভেতরের চাপ স্বাভাবিক রাখতে পারে। কিন্তু এই চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে একসময় মগজ আর এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না। তখন মাথার ভেতরের চাপ বাড়তে থাকে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মাথার খুলির হাড়গুলো খুলে ফাঁক হয়ে মাথার আকার বড় হয়ে গিয়ে বাড়তি কিছু চাপ সহ্য করতে পারে। সাধারণত চাপ বৃদ্ধি পেলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়।

মাথা ব্যথা : ব্রেন টিউমারে মাথা ব্যথা একটু আলাদা ধরনের হয়।

♦    মাথার সামনে, পেছনে বা পুরো মাথাই ব্যথা করবে।

♦    মাথা দপদপ করে ব্যথা করবে।

♦    সামনে ঝুঁকলে, কাশি বা হাঁচি দিলে ব্যথা বেড়ে যায়।

♦    প্রায় সব সময়ই মাথা ব্যথা থাকে, বিশেষ করে সকাল আর বিকেলে ব্যথার পরিমাণ বেশি হয়।

♦    ঘুমের মধ্যেও মাথা ব্যথা থাকে, তাই রোগী ঘুম থেকে জেগেও দেখে মাথা ব্যথা আছে।

♦    ব্যথা ক্রমে বাড়তেই থাকে।

♦    প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধে ব্যথা সাময়িক কমলেও আবার ফিরে আসে।

বমি : ব্রেন টিউমারের অন্যতম উপসর্গ, বিশেষ করে মগজের বমিকেন্দ্রে চাপ পড়লে সেটি উত্তেজিত হয়ে যায় এবং রোগীর বমি হয়।

দৃষ্টিশক্তি : মাথার ভেতরে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা চোখে চলে আসে এবং এই চাপ বেশি দিন থাকলে দৃষ্টি কমে আসে। এটা হয় চোখের অপটিক নার্ভ বা স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে। এভাবে চলতে থাকলে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে হতে রোগী একসময় অন্ধ হয়ে যেতে পারে। চোখের ভেতর অপথালমোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করলে প্যাপিলোইডিমা ও অপটিক অ্যাট্রফি দেখতে পাওয়া যায়। চোখের দৃষ্টি একবার কমে গেলে আবার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই মাথার ভেতরের চাপজনিত দৃষ্টিশক্তি হ্রাস হতে থাকলে প্রথম পর্যায়েই চিকিৎসা নেওয়া দরকার।

প্যারালাইসিস : মাথার ভেতরের চাপ বৃদ্ধির ফলে সহজেই অ্যাবডুসেন্স নামের একটি স্নায়ু প্যারালাইজড হয়ে যায়। এই নার্ভ ডান চোখ ডান দিকে আর বাঁ চোখ বাঁ দিকে নাড়াতে সাহায্য করে। এই নার্ভ প্যারালাইজড হলে রোগী চোখ দুই পাশে নাড়াতে পারে না। এ সময় এক বস্তু দুটি দেখে।

কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস : মাথার ভেতরের চাপ বৃদ্ধির জন্য মগজের উচ্চস্তরের কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মনোযোগ, চিন্তাশক্তি, স্মরণশক্তি ইত্যাদি কমে যায় এবং সেই সঙ্গে খিঁচুনি বা এপিলেপসি হতে পারে।

রক্তচাপ বাড়ে ও হৃদস্পন্দন কমে : মাথার ভেতরের চাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং হৃৎপিণ্ডের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়।

 

ব্রেন টিউমার সব কি একই?

গঠন ও অবস্থানের কারণে মগজকে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মগজ মূলত টেনটোরিয়াম দিয়ে ওপর ও নিচ দুটি অংশে বিভক্ত। ওপরে সেরেব্রাম এবং নিচে সেরিবেল্লাম অবস্থিত। টেনটোরিয়ামের সামনের ফাঁক দিয়ে মিডব্রেন, পনডস ও মেডালা নিচে নেমে স্পাইনাল কর্ডের আকারে মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে নেমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়। প্রতিটি সেরেব্রামকে চার ভাগে বা চারটি লোবে ভাগ করা হয়েছে। এ ধরনের ভাগের কারণে যেখানে টিউমার হয়, তার লক্ষণ আলাদ আলাদা হয়। সাধারণভাবে টিউমারকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। বিভিন্ন লোবের টিউমার শুধু নামেই পার্থক্য নয়, এগুলোতে লক্ষণও আলাদা আলাদা হতে পারে।

প্রি-ফ্রন্টাল টিউমার : এই টিউমার ফ্রন্টাল লোবের নিচে হয় এবং বেশ বড় না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত এর কোনো লক্ষণ টের পাওয়া যায় না। এরা মূলত ঘ্রাণবিষয়ক স্নায়ুর ক্ষতি করে। ফলে রোগীর ঘ্রাণ পাওয়ার ক্ষমতা কমতে থাকে। টিউমার পেছন দিকে ছড়িয়ে পড়লে চোখের দৃষ্টি কমতে পারে।

ফ্রন্টাল লোব টিউমার : এটাও অনেক বড় না হওয়া পর্যন্ত উপসর্গ প্রকাশ পায় না। প্রথম অবস্থায় রোগী ধীরে ধীরে বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে ফেলে। সব কিছুতে অনীহা প্রকাশ পায়, অনেকটা নির্লিপ্ত ভাব থাকে। মারাত্মক ব্যাপারকে গুরুত্ব না দেওয়া বা চোখের সামনে কিছু ঘটলেও নির্লিপ্ত থাকা এর উপসর্গ। রোগী ধীরে ধীরে প্রস্রাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফ্রন্টাল লোবের পেছন দিকে টিউমার হলে বিপরীত পাশের হাত বা পা উভয়ই দুর্বল হতে হতে সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে, সেই সঙ্গে মুখ বেঁকেও যেতে পারে। এটা হয় মগজের মটর এরিয়া আক্রান্ত হওয়ার ফলে। আবার সেন্সর এরিয়া আক্রান্ত হলে বিপরীত দিকের হাত-পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে, ভারী ভারী অনুভব করা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণভাবে ফ্রন্টাল লোব মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির কাজগুলো সম্পাদন করে। কাজেই ফ্রন্টাল লোব টিউমার হলে বুদ্ধিবৃত্তির কাজগুলো করার ক্ষমতা কমে যায়।

প্যারাইটাল লোব টিউমার : প্যারাইটাল লোবের সামনের দিকে টিউমার হলে মানুষ প্রথম অবস্থায় স্পর্শবিষয়ক জটিলতার সম্মুখীন হয়। চোখ বন্ধ অবস্থায় হাতে কোনো জিনিস দিলে তার আকৃতি বা ওজন সম্পর্কে বলতে পারে না। শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট ও পজিশন জ্ঞান নষ্ট হয়ে যায়।

ফলে হাঁটতে বা হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে অসুবিধা হয়। আর টিউমার যে অংশে হয়েছে, তার বিপরীত দিকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে রোগী অবহেলা করে থাকে। রোগী পরিচিত মানুষকে চিনতে পারে না। কিছু লিখতে বললে নিজ থেকে কিছু লিখতে পারে না। হিসাব করতে পারে না।

টেম্পোরাল লোব টিউমার : এতে প্রধানত খিঁচুনি হয়। খিঁচুনির আগে রোগী স্বাদ ও গন্ধজনিত হেলুসিনেশনে ভোগে।

টেম্পোরাল লোবের ভেতরের দিকে টিউমার হলে স্মরণশক্তি কমে যায়, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা মনে থাকে না।

অক্সিপিটাল লোব টিউমার : মূল উপসর্গ হলো, যে পাশে টিউমার হয়েছে, তার বিপরীত পাশের চোখের দৃষ্টি হ্রাস পাওয়া। যেহেতু প্রতিটি  অক্সিপিটাল লোব দুই চোখ থেকেই নিউরোন পায়, সেহেতু একদিকের টিউমারে দুই চোখেই আস্তে আস্তে দৃষ্টি হ্রাস পায়।

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

টিউমার নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষাসহ ব্রেনের সিটিস্ক্যান, এমআরআই, এক্স-রে ছাড়াও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেরিব্রাল এনজিওগ্রাম করা হয়।

 

চিকিৎসা

প্রাথমিকভাবে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দিতে হয়। কিন্তু মূল চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশনের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা। যেহেতু ব্রেন টিউমারের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি টিউমার সাধারণত ক্যান্সারজাতীয়, তাই অপারেশনের পর কেমো ও রেডিওথেরাপি দিতে হতে পারে।

 

গ্রন্থনা : সীমা আক্তার


মন্তব্য