kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন

উৎসবের এই সময়টাতে প্রোটিনযুক্ত খাবারের আধিক্য থাকে। অনেকের ধারণা, প্রোটিন বেশি খেলে ক্ষতি হয়।

কিন্তু বাস্তবে তা নয়। প্রোটিন শরীরের জন্য উপকার করে বেশি। তবে প্রাণিজ প্রোটিন খাওয়ার সময় চর্বি বাদ দিতে পারলে ভালো হয়। পরামর্শ দিয়েছেন ল্যাবএইড গুলশানের মেডিসিন বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট ও আশিয়ান মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. জুলহাস উদ্দিন। লিখেছেন মুজাহিদ আকাশ

 

আমাদের দেশের মানুষের যে খাদ্যাভ্যাস, তাতে প্রোটিনের চেয়ে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। তাই প্রোটিন ম্যালনিউট্রিশন বা অপুষ্টি এখানে একটি বড় সমস্যা।

প্রোটিন এমন একটি খাদ্য উপাদান, যা প্রতিদিনই মানুষের গ্রহণ করা উচিত। নিয়মিত প্রোটিন খেলে মেটাবলিজম ঠিক থাকে, শরীর যথেষ্ট শক্তি পায়, রক্তে চিনির মাত্রা ঠিক থাকে। হয়তো অনেকেই যথেষ্ট প্রোটিন খাই, কিন্তু যে ধরনের প্রোটিন যতটুকু খাওয়া উচিত, সেটা কি মেনে খাই?

মানবদেহের প্রতিটি কোষেরই সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। তা শরীরের মাংসপেশির গঠনের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি স্নায়ু ও হরমোনের কার্যক্রমের জন্যও। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রোটিন খাবার কিন্তু মানুষের ওজন স্বাভাবিক রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যাঁরা শরীরে মেদ ঝরিয়ে ফিট হতে চান, তাঁরা খাবারে প্রোটিনের হার বাড়ান, কার্বোহাইড্রেট কমান।

প্রোটিন আসলে কী? এটা রাসায়নিকভাবে অ্যামাইনো এসিডের একটা লম্বা চেইন। অ্যামাইনো এসিড অনেক ধরনের খাবারে পাওয়া যায়। এমনকি সবজিতেও আছে। কিন্তু প্রাণিজ প্রোটিনের মধ্যে থাকা অ্যামাইনো এসিড উচ্চমাত্রার; যেমন—মাংস, ডিম, দুধ, মাছ।

প্রোটিন কম খেলে কি শুধু অপুষ্টি হয়? না, প্রোটিন কম খেলে বা দৈনন্দিন চাহিদার চেয়ে কম প্রোটিন গ্রহণ করলে আরো কিছু অসুবিধাও হয়। যেমন—

•    মেটাবলিজম কমে যায়

•    শরীরের ওজন বাড়তে থাকে, ওজন কমানো সহজ হয় না

•    মাংসপেশি দৃঢ় হয় না। ফলে কাজকর্ম করার শক্তি কম পাওয়া যায়

•    দুর্বলতা বোধ হয়, অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়

•    মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়, নতুন কিছু শিখতে অসুবিধা হয়, মনে থাকে না

•    মেজাজ খিটখিটে হয়, হুটহাট মেজাজ পরিবর্তিত হয়

•    মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা অনুভূত হয়

•    রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যায়

•    সহজে ক্ষতস্থানের ঘা শুকায় না বা কোথাও ইনফেকশন হলে সহজে সারে না

•    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়

 

সব প্রোটিন কি ভালো

অ্যামাইনো এসিড আছে ২০ ধরনের। এর মধ্যে কিছু অ্যামাইনো এসিড কিন্তু শরীর নিজেও তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব অ্যামাইনো এসিড তৈরি করতে পারে না। ২০ ধরনের অ্যামাইনো এসিডের মধ্যে কয়েকটি অত্যাবশ্যকীয় বা এসেনশিয়াল অ্যামাইনো এসিড হিসেবে পরিচিত। এগুলো কিন্তু শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। তাই বাইরে থেকে এগুলো গ্রহণ করতে হয়। সব অ্যামাইনো এসিডেরই আলাদা কাজ আছে এবং এই কাজগুলো শরীরের জন্য খুব জরুরি। এ জন্যই প্রোটিন গ্রহণ জরুরি। কিন্তু প্রতিদিনই যদি একই ধরনের প্রোটিন খাওয়া হয়, তাহলে শরীরের প্রয়োজনীয় সব ধরনের অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যাবে না। তাই প্রোটিন খেতে হবে একেক দিন একেক ধরনের। সুস্থ শরীরের জন্য এ বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি।

যারা ভেজিটেরিয়ান বা শুধু সবজিভোজী, তাদের মধ্যে অনেক সময় কিছু অ্যামাইনো এসিডের স্বল্পতা দেখা যায়। কারণ প্রাণিজ উৎস থেকে আসলে পরিপূর্ণ অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো অ্যামাইনো এসিডের উৎস হলো গরুর মাংস; বিশেষ করে দেশি বা ঘাস খাওয়া গরু। এর মধ্যে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য বিশেষ উপকারী লিনোলিক এসিড, যা ক্যান্সার প্রতিরোধেও কাজ করে। মোটাতাজা করা গরুর মধ্যে বা ফার্মে বড় হওয়া গরুর মাংসে এর উপস্থিতি কম থাকে। ভালো অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায় দেশি মুরগির ডিম, ঘাস খাওয়া দেশি গরুর দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রী থেকে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত মাছ থেকেও। ফার্মের মুরগির ডিম, ফার্মে পালিত গরুর দুধ বা চাষের মাছে এগুলোর পরিমাণ কম থাকে।

 

কতটুকু প্রোটিন

প্রত্যেক মানুষেরই একই পরিমাণ প্রোটিন প্রয়োজন নেই। বয়স, লিঙ্গ, ওজন, পেশা বা শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রাভেদে একেকজনের প্রোটিনের চাহিদা আলাদা।

সাধারণ হিসাবে বলা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রতিদিন কমপক্ষে ৫৬ গ্রাম এবং প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের কমপক্ষে ৪৬ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। এটা হচ্ছে সবচেয়ে কম মাত্রা। প্রতিদিন অবশ্যই এর চেয়ে বেশি প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত। আপনার কতটুকু প্রয়োজন? সহজ একটা হিসাব করলে জানা যাবে। ওজন যত পাউন্ড, ঠিক তার অর্ধেকটা প্রোটিন কমপক্ষে প্রতিদিন প্রয়োজন। যেমন—কারো ওজন যদি ১৮০ পাউন্ড হয়, তাহলে তার কমপক্ষে ৯০ গ্রাম প্রোটিন প্রতিদিন খাওয়া উচিত। প্রয়োজনীয় এই প্রোটিনের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হওয়া উচিত উচ্চমাত্রার। প্রতি বেলাই কিছু না কিছু প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত। এক বেলায় সারা দিনের প্রয়োজনীয় প্রোটিন বা এক দিনে পুরো সপ্তাহের প্রয়োজনীয় প্রোটিন খাওয়া মোটেই কাজের কথা নয়। এতে প্রোটিন খেয়েও ওজন কমবে না, বরং বাড়বে। কারণ প্রয়োজনীয় প্রোটিনের অতিরিক্তটা শরীরে মেদ হিসেবে জমা হবে। তা ছাড়া প্রতি বেলায় প্রোটিন থাকলে কার্বোহাইড্রেট ও জাংক ফুড খাওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।

চিকিৎসকরা সব সময়ই বলেন বারবার কিন্তু অল্প পরিমাণে খেতে। প্রোটিনের ক্ষেত্রেও তা-ই করা উচিত।

 

যে ধরনের প্রোটিন থাকা উচিত

খাদ্যতালিকায় সব সময় প্রাণিজ প্রোটিন রাখতে হবে এমন নয়। আবার প্রতিদিন একই খাবার খেতেও বিরক্তির ব্যাপার আছে। তাই এমনভাবে প্রোটিন খাওয়া উচিত, যাতে এর চাহিদাও মেটে, খাবারে ভিন্নতাও আসে। এ জন্য নিচের খাবারগুলো তালিকায় রাখতে পারেন :

•    গরুর মাংস; দেশি, ঘাস খেয়ে বেড়ে ওঠা গরু বেশি ভালো। মাত্র ১৯ গ্রাম খেলেই দৈনন্দিন প্রোটিন চাহিদার ৪৬ শতাংশ পূরণ হতে পারে।

•    শিম, ডাল ও বীজজাতীয় খাবার। দৈনিক এক কাপ পরিমাণ খেলেই চলবে।

•    মাছ, বিশেষ করে নদী বা সমুদ্রের মাছ। মাত্র ১৭ গ্রাম খেলেই দৈনিক চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ হতে পারে।

•    মুরগির মাংস, বিশেষ করে দেশি মুরগি বা প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়া মুরগি। দৈনিক ১৫ থেকে ২০ গ্রাম খাওয়াই যথেষ্ট।

•    দুধ, প্রতিদিন এক কাপ পরিমাণ। দইও খুব ভালো উৎস। প্রতিদিন মাত্র ১০ গ্রাম খেলেই চলে।

•    ডিম, দৈনিক একটা ডিমই যথেষ্ট প্রোটিন জোগান দেবে।

•    চিজ বা পনির, এক স্লাইস পরিমাণ খেলেই প্রোটিনের চাহিদার ২০ শতাংশ মেটে।

 

বেশি প্রোটিন খাওয়া কি ঠিক

না, প্রোটিন চাহিদামতোই খাওয়া উচিত। বেশি প্রোটিন গ্রহণ করলে আবার বাড়তি কিছু বিপদ হতে পারে; বিশেষ করে যাদের লিভার ও কিডনির অসুখ আছে। অতিরিক্ত প্রোটিন খেলে তা শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে কৌষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে। পরিপাকতন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া ও ইস্টের সংক্রমণ করতে পারে। শুধু প্রোটিনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যান্য খাদ্য উপাদান যদি বাদ পড়ে যায়, সেটাও বিপদের। তাই প্রোটিনের পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে, শাকসবজি ও ফলমূলও খেতে হবে। কার্বোহাইড্রেট কমাতে হবে, তবে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই।


মন্তব্য