kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সমস্যা যখন কিশোরীদের

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সমস্যা যখন কিশোরীদের

বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তাই এ নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত নয়

বয়ঃসন্ধিকালে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে মেয়েদের শরীরে কিছু পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু বহু কারণে অস্বস্তিবোধ করে তারা। নিকটজনের কাছেও কিছু সমস্যা বলতে সংকোচ করে সে।

ফলে কিছু অসুখবিসুখ ও কুসংস্কার সে বহন করে। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. নাদিরা হক ।

 

বয়ঃসন্ধিকাল হচ্ছে কিশোরকালীন সময়ের শুরুতে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যখন বড় হওয়ার লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশই কিশোর-কিশোরী। বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক নিয়মেই ঘটে, এতে ভয় অথবা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তাই এই সময়ে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত ধারণা থাকা প্রয়োজন, যেন তাদের মধ্যে সুস্থ ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে, নিজেদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে সচেতন হয়, পরবর্তী প্রজন্মের সুস্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

পরিবর্তনগুলো কেন হয়?

মেয়েরা যখন শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হয়, তখন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে কিছু হরমোন নিঃসরিত হয়। এগুলো রক্তের সঙ্গে মিশে দেহের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করে। এই হরমোনের প্রভাবে শারীরিক পরিবর্তনগুলো হয়। বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের প্রভাবে মেয়েদের জরায়ুর দুই পাশে অবস্থিত দুটি ডিম্বাশয় থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ডিম্বস্ফুটন। এই ডিম্বাণু ডিম্বনালি হয়ে জরায়ুতে আসে। জরায়ুর ভেতরের আবরণের নাম এন্ডোমেট্রিয়াম। যদি ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণুর মিলনে ভ্রুণ তৈরি না হয়, তবে এন্ড্রোমেট্রিয়ামের ওই মাসে আর কোনো কাজ থাকে না। তখন তা অকেজো হয়ে জরায়ু থেকে খসে পড়ে। এ কারণে রক্তক্ষরণ হয়, আর এটাই ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড।

 

ঋতুস্রাব

বয়োপ্রাপ্ত মেয়েদের প্রতি মাসে, সাধারণত ২৮ দিন পরপর ঋতুস্রাব হয়ে থাকে। যা পাঁচ-সাত দিন স্থায়ী হয়। আমাদের দেশে সাধারণত ১০-১৪ বছর বয়সের মধ্যে মেয়েদের ঋতুস্রাব শুরু হয়। তবে নানা কারণ যেমন—বংশগত, অপুষ্টি, শারীরিক, মানসিক সমস্যার কারণে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার সময়টা কারো কারো ক্ষেত্রে পিছিয়েও যেতে পারে। প্রথমদিকে ঋতুস্রাব কিছুটা অনিয়মিত হতে পারে, যা কারো কারো ক্ষেত্রে নিয়মিত হতে দুই-তিন বছরও লাগতে পারে। সাধারণত ৪৫-৪৯ বছর পর্যন্ত ঋতুস্রাব হয়।

 

ঋতুস্রাবের সময় করণীয়

প্রথমবার শুরু হলে ভয় না পেয়ে মা বা বয়সে বড় বোনকে জানাতে হবে। ঋতুস্রাব চলাকালে অন্তর্বাসের সঙ্গে স্যানিটারি প্যাড, তুলা ব্যবহার করতে হয়। স্যানিটারি প্যাড তিন-চার ঘণ্টা পরপর পরিবর্তন করতে হবে। ঋতুস্রাব চলাকালে নিয়মিত গোসল করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। পরিষ্কার জামাকাপড় পরতে হবে। ঋতুস্রাব চলাকালে স্বাভাবিক জীবন যাপন—স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা, বেড়ানো সব কাজ করা যায়। তবে কঠিন কোনো পরিশ্রমের কাজ করা উচিত নয়। পাশাপাশি নিয়মিত বিশ্রাম নিতে হবে। অনেক সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়, তাই পুষ্টিকর, আয়রনসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হবে। প্রতি মাসে ঋতুস্রাব চক্রের হিসাব রাখার জন্য ক্যালেন্ডারে ঋতুস্রাবের প্রথম দিনটি চিহ্নিত করে রাখতে হবে এবং পরবর্তী মাসে সেই তারিখের দু-তিন দিন আগে থেকেই স্যানিটারি প্যাড সঙ্গে রাখতে হবে। ঋতুস্রাব চলাকালে প্রায় ৮০ শতাংশ মেয়ে কিছু না কিছু শারীরিক অসুবিধার সম্মুখীন হয়। এ ধরনের অসুবিধার মধ্যে আছে অবসন্নতা, দুর্বলতা, শরীর ব্যথা, জ্বর অনুভব করা, স্তনে ব্যথা ও স্তন ভারী বোধ করা, মাথাব্যথা, বমির উদ্রেক হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, তলপেটে হালকা ব্যথা অনুভব করা ইত্যাদি।

 

তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া

ঋতুস্রাব চলাকালে জরায়ুর ভেতরের আবরণ বেরিয়ে আসার সময় জরায়ুর পেশিতে সংকোচন প্রসারণের কারণে তলপেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। সাধারণত কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে, তলপেটে গরম পানির সেক নিলে এই ধরনের ব্যথা চলে যায়। তবে যদি কারো ঋতুস্রাব চলাকালে তলপেটে এমন অসহ্য ব্যথা হয়, যা তার স্বাভাবিক কাজকর্মকে ব্যাহত করে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করতে হবে।

 

যখন ডাক্তার দেখাতে হবে

►        ১৬ বছর বয়সের মধ্যে ঋতুস্রাব শুরু না হলে

►         স্বাভাবিক স্থায়িত্বের চেয়ে বেশি দিন ধরে ঋতুস্রাব চলতে থাকলে

►        ঋতুস্রাবে রক্তের পরিমাণ অনেক বেশি গেলে

►         এক মাসে একাধিকবার ঋতুস্রাব হলে

►         পুরো মাসে অল্প অল্প ঋতুস্রাব হলে

►        রজঃনিবৃতি বা মেনোপজ ছাড়া ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে

 

অপুষ্টিজনিত সমস্যা

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভের সমীক্ষায় দেখা গেছে ২৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী অপুষ্টির শিকার। জাতীয় পুষ্টি কার্যক্রমের আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১১-১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর ৪০ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। বয়স অনুযায়ী শরীরের যে বৃদ্ধি অথবা ওজন থাকা উচিত, সেটা অর্জন না করাই সাধারণভাবে অপুষ্টি বলে বিবেচিত। একজন কিশোরীর শারীরিক উচ্চতা ও গঠন কেমন হবে তা কিছুটা বংশগত হলেও সঠিক পুষ্টিরও বেশ প্রভাব রয়েছে। একজন কিশোরীর শারীরিক উচ্চতা ও গঠন কেমন হবে তা কিছুটা বংশগত হলেও সঠিক পুষ্টিরও প্রভাব রয়েছে। দেহের চাহিদা অনুযায়ী পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে কিশোরী বয়সে শারীরিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়।

সুষম খাদ্য গ্রহণ না করলে প্রোটিনের ঘাটতি, ক্যালরি ঘাটতি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি, আয়রন, আয়োডিন, ভিটামিন এ ইত্যাদির ঘাটতি হতে পারে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ, ডিম, ডাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ফলমূল রাখতে হবে। খাবারের মেন্যুতে ক্য্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ জাতীয় খাবারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। চর্বি জাতীয় খাবার, ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড কম খেতে হবে বা বাদ দিতে হবে।

কিশোরীদের শরীরের বহিরাঙ্গ ও অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বিকাশের পেছনে মূলত কাজ করে হরমোন। সুস্থ শরীরে হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত কিশোরীর দেহে স্বাভাবিকভাবেই হরমোন নিঃসরণ গ্রন্থিগুলো কম কাজ করায় শারীরিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অপুষ্ট কিশোরীরা রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকে। ঋতুস্রাবের শুরু বিলম্বিত হয়। ঋতুস্রাব নিয়মিত হয় না। সাদা স্রাব/লিউকোরিয়ার প্রবণতা থাকে।

 

ওজনজনিত সমস্যা

স্থূলতা মানেই কিন্তু সুস্বাস্থ্য নয়। বহু স্থূল মানুষ অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগে। বাড়তি ওজন  কিশোরীদের একটি বড় সমস্যা। সাধারণত ফাস্টফুড আসক্তি, অধিক মাত্রায় শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাদ্যগ্রহণ স্থূলতার জন্য দায়ী। অপর্যাপ্ত শারীরিক ব্যায়াম ও হরমোনের প্রভাবজনিত কারণেও স্থূলতা দেখা দিতে পারে। স্থূলতার কারণে ঋতুস্রাব অনিয়মিত হতে পারে। পরবর্তী জীবনে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হাইপোথায়রয়ডিজম, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

 

মূত্রনালি ও মূত্রথলিতে প্রদাহ

প্রধান উপসর্গ প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া। মেয়েদের মূত্রনালি ছেলেদের তুলনায় অনেক ছোট এবং মূত্রনালি পায়ুপথের খুব কাছে থাকে বলে সংক্রমণ বেশি হয়। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া সৃষ্টির প্রধান জীবাণু ইকলাই নামের ব্যাকটেরিয়া। এ ছাড়া কিছু ছত্রাক ও ভাইরাসও এ ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে।

আরো লক্ষণ হিসেবে থাকে প্রস্রাবের বেগ ধরে রাখতে না পারা, ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব পড়া, প্রস্রাবের রং ধোঁয়াটে, দুর্গন্ধযুক্ত ও পরিমাণে কম হওয়া, তলপেটে ব্যথা হওয়া, শরীরে জ্বর থাকা, মাঝেমধ্যে বমি হওয়া।

এ ধরনের সমস্যা থেকে বাঁচতে দিনে কমপক্ষে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে। দিনে দুই-তিন ঘণ্টা পরপর প্রস্রাব করতে হবে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং সকালে ঘুম থেকে জেগে প্রস্রাব করতে হবে। প্রস্রাবের বেগ হলেই প্রস্রাব করতে হবে। মূত্রথলিতে দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব জমিয়ে রাখা উচিত নয়। প্রস্রাবের পর প্রস্রাবের স্থান ভালোভাবে পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মলত্যাগের পর শৌচকার্যে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যেন পানি প্রস্রাবের রাস্তায় না যায়।

 

সাদা স্রাব বা লিউকোরিয়া

অনেকের ক্ষেত্রেই ঋতুস্রাবের আগে বা পরে সাদা স্রাব হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। এটা কোনো রোগ নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় ডিম্বস্ফুটনের সময় বা নিয়মিত ঋতুস্রাবের আগে, পরে সাদা স্রাব হতে পারে। অনেক সময় অবশ্য অপুষ্টিজনিত কারণে সাদা স্রাব হতে পারে। অপরিষ্কার থাকলেও সাদা স্রাব হতে পারে। অতিরিক্ত সাদা স্রাব, দুর্গন্ধময় ফেনাযুক্ত সাদা স্রাব, যৌনাঙ্গে চুলকানি, তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা, শরীরে জ্বর আসা—এই লক্ষণ থাকলে ইনফেকশন আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

 

শারীরিক পরিবর্তন

►        দ্রুত উচ্চতা ও ওজন বেড়ে যায়

►         স্তন বড় হয়

►         গলার স্বর পরিবর্তিত হয়

►        হাত-পায়ের লোম বড় ও গাঢ় হয়

►         বগল ও প্রজনন অঙ্গে লোম ওঠে

►         কোমর চওড়া হয়

►         যৌনাঙ্গ, জরায়ু ও ডিম্বাশয় বড় হয়

►         ডিম্বস্ফুটন শুরু হয়

►         ঋতুস্রাব শুরু হয়

►         ত্বক তৈলাক্ত হয়, মুখে ব্রণ ওঠে

 

আছে মানসিক পরিবর্তনও

►         অজানা বিষয়ে জানার কৌতূহল বেড়ে যায়

►         আবেগপ্রবণতা ও চঞ্চলতা দেখা দেয়

►        মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়, সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করে

►        নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চলাফেরা করতে ইচ্ছা করে

►        অনেকেই আবার উল্টো ঘরমুখী, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায়

►         অপরিচিত কারো সামনে যেতে লজ্জা পায়

►         নিজের শরীর, নারী-পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক বিষয়ে কৌতূহল জন্মায়

মানসিক এই পরিবর্তনগুলোও স্বাভাবিক। এগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার ঠিক হয়ে যায়। এই সময় থেকেই নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত বুঝতে হবে। পরিবারে মা-বাবার সঙ্গে খোলামনে আলোচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিবারই সবচেয়ে আপন ও নিরাপদ স্থান। বিশেষ করে মা, বোন এবং বাবা। প্রয়োজনে আলাপ করতে হবে ডাক্তারের সঙ্গেও।


মন্তব্য