kalerkantho


মুসলিম মনীষী

শাহ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (রহ.)

আবদুল মতিন   

২৩ জানুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০



মানবের শাশ্বত স্পৃহা খোদার সান্নিধ্য অর্জন। সান্নিধ্য অর্জনের মূল নিয়ামক হলো প্রেম তথা অধ্যাত্মপ্রেম। যুগ-যুগান্তর ধরে নবী-রাসুল, অলি-আবদালগণ খোদায়ী প্রেম সাধনায় সাধিত হয়ে খোদার নৈকট্য হাসিলে সমর্থ হন এবং মানবকুলে তার প্রতিফলন ঘটান। এরূপ মহান খোদাই প্রেমের আধার হচ্ছেন রাসুলে মকবুল (সা.)-এর বেলায়েতের তাজধারী বাদশাহ মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের অধ্যাত্ম শরাফতের মূল ব্যক্তিত্ব হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) প্রকাশ হজরত ছাহেব কেবলা কাবা।

জন্ম ও বংশপরিচয় : বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত রাসুলে করিম (সা.)-এর পবিত্র বংশেত হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (রহ.) চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডার গ্রামে ১৮২৬ ইংরেজি, ১২৪৪ বাংলা, ১ মাঘ, রোজ বুধবার শুভ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ মতিউল্লাহ এবং মায়ের নাম সৈয়দা খায়রুন্নেছা বিবি।

নামের বৈশিষ্ট্য : রাসুলে করিম (সা.) কর্তৃক স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে বাবা তাঁর নাম রাখেন 'আহমদ উল্লাহ'। এ পবিত্র নামখানি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আহমদ নামের সঙ্গে আল্লাহ শব্দ সংযুক্ত 'আহমদ উল্লাহ'। আল্লাহপাকের গুণাবলি ও রাসুলেপাক (সা.)-এর আদর্শ তাঁর মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়।

শিক্ষাজীবন : গ্রামের মক্তবে তাঁর বাল্যকালীন শিক্ষাক্রম শুরু হয়। দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণার্থে তিনি ১২৬০ হিজরি সনে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ১২৬৮ হিজরিতে সমাপনী পরীক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন এবং কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক, বালাগাত, উছুল, আকায়িদ, ফলসফা, ফরায়েজ প্রভৃতি শাস্ত্রে তিনি বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন।

বায়াত গ্রহণ : তিনি পীরানে পীর দস্তগির (ক.)-এর বংশধর এবং ওই তরিকার খেলাফতপ্রাপ্ত হজরত শায়খ সৈয়দ আবু শাহামা মুহাম্মদ ছালেহ আল কাদেরি লাহোরি সাহেব (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে 'গাউছিয়াতে'র ও পরবর্তী সময়ে পীরে তরিকতের নির্দেশক্রমে হজরত শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওয়ার আলী পাকবাজ (রহ.) থেকে 'কুতুবিয়তে'র ফায়েজ হাসিল করেন।

কর্মময় জীবন : ১২৬৯ হিজরি সনে যশোর জেলায় কাজি পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর মহিমামণ্ডিত কর্মময় জীবন সূচিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১২৭০ হিজরিতে ওই পদ থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়ে তিনি কলকাতা মাটিয়া বুরুজে মুনশি বুআলী সাহেবের মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। অধ্যাপনায় নিয়োজিত থাকাকালে নিজেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় সম্পৃক্ত করেন এবং পীরে তরিকতের নির্দেশক্রমে পরে স্বদেশে ফিরে এসে অধ্যাত্ম সাধনায় নিমগ্ন থেকে খোদায়ি প্রেমের আধারে পরিণত হন। তিনি অনাড়ম্বর নির্বিলাস ও নির্মোহ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। বিশ্বমানবতার কল্যাণই ছিল তাঁর মহিমামণ্ডিত কর্মময় জীবনের অনুপম দৃষ্টান্ত।

তাঁর মূল্যবান উপদেশাবলি : জীবনে চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনে 'কবুতরের মতো বাছিয়া খাও', 'হারাম খাইও না, নিজ সন্তানসন্ততি নিয়া খোদার প্রশংসা করো', 'ফেরেশতা কালেব বনিয়া যাও'- অর্থাৎ ফেরেশতার ন্যায় খোদার হুকুমমতো কাজ করো। অবাধ্য হইও না। 'কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করিও', 'ছালাতুত তছবীহ ও তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ো', 'নিজের হাতে পাকাইয়া খাও, পরের হাতে পাকানো খাইও না' তাঁর ইত্যাদি অমিয় বাণী আদর্শবান মানবজাতি গঠনে অতীব তাৎপর্য বহন করে।

তিনি কোরআন ও সুন্নাহর ভাবাদর্শের ভিত্তিতে মানবকলাণমূলক নিখুঁততম ও সহজসাধ্য জীবনধারণ প্রণালির অনুসরণ-অনুকরণ এবং মানব অন্তরে ঐশী প্রেমধারা সৃষ্টি এবং তাজকিয়ায়ে নাফস- অর্থাৎ মানবীয় সত্তার সজাগ বা কুপ্রবৃত্তি ধ্বংস করে সুপ্রবৃত্তির উন্মেষ ঘটানোর লক্ষ্যে ১. সাত প্রকারের জিকির এবং ২. উসুলে সাবয়া বা সপ্ত পদ্ধতি অনুশীলনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের এক হেদায়েতের ধারা সূচনা করেন, যা মাইজভাণ্ডারী ওজিফা নামে আজ সুফি পরিমণ্ডলে আদৃত ও স্বীকৃত।

ওফাত : খোদায়ি প্রেমের আধার যুগশ্রেষ্ঠ এ মহান অলিয়ে কামেল হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) ছাহেব অসংখ্য খোদাপ্রেমিক অলি কুতুব তৈরি করে ১৯০৬ ইং, ২৩ জানুয়ারি; ১৩১৩ বাংলা, ১০ মাঘ; হিজরি ১৩২৩, ২৭ জিলকদ, রোজ সোমবার আল্লাহর সঙ্গে শুভ মিলনার্থে পবিত্র ওফাত লাভ করেন। তাঁর পবিত্র ওফাত দিবস স্মরণে দেশ-বিদেশ থেকে আগত অগণিত আশেক-মুরিদের অংশগ্রহণে ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে সাজ্জাদানশিনে দরবারে গাউছুল আজম আলহাজ হজরত মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.) ছাহেবের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর ১০ মাঘ মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে ওরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

 

 



মন্তব্য