kalerkantho


৬৫ প্রভাবশালীর দখলে সাভারের বংশী নদ

তায়েফুর রহমান, সাভার   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



৬৫ প্রভাবশালীর দখলে সাভারের বংশী নদ

ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে বংশী নদের বিরাট এলাকা এখন প্রভাবশালীদের দখলে। নদের তীরবর্তী এলাকার বেদখল হয়ে যাওয়া সে জায়গা উদ্ধারে দৃশ্যত প্রশাসনিক কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারিভাবে নদী দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দেওয়া হলেও তাঁরা রয়েছেন বহাল তবিয়তে। বরং নদীর দুই পাশে সমান তালে চলছে দখল, দূষণ ও ভরাট প্রক্রিয়া। নির্মাণ করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। বাধাহীনভাবে নদীতীরের মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে দেদার। বংশী নদের সাভার থানাঘাট থেকে শুরু করে নামাবাজার হয়ে বাঁশপট্টি পর্যন্ত এখন দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। এসব নিয়ে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করলেও কার্যত কোনো সুফল মিলছে না। গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর সাভার ভূমি অফিসের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত ৬৫ জন নদী দখলদারের তালিকায় সাভার থানা মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি, সাভার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, আওয়ামী লীগ নেতা, জনপ্রতিনিধির নিজের ও তাঁর সন্তানের নাম রয়েছে। তালিকাটি ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য ২০১৪ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে অনুরূপ একটি তালিকা তৈরি করে দখল-সংশ্লিষ্টদের শোকজ নোটিশ দেওয়া হলেও কেউ তা আমলে নেয়নি। পরে ঢাকা জেলা প্রশাসক অফিসে তালিকার ওই ফাইল চাপা পড়ে যায়।

সম্প্রতি সাভারের খাল-বিল, জলাশয় রক্ষাসহ আমিনবাজারে ওয়েস্ট ডাম্পিং সাইট কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যা ও দূষণ রোধে করণীয় শীর্ষক এক আলোচনাসভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এমবাসি অব দ্য ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মান ও সিটিজেনস মুভ টু প্রটেক্ট আরবান ওয়েটল্যান্ডের সহযোগিতায় পৌরসভার আনন্দপুরে ভার্ক মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন ফর র‌্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), নিজেরা করি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) যৌথ উদ্যোগে এ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোচনায় বলা হয়, নদী-নালা, খাল-বিল, কৃষি ও মৌসুমি ফলে সমৃদ্ধ সাভার এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দূষণের ফলে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে নদী ও খালের পানি। এর প্রভাবে চর্ম, হাঁপানিসহ নানা ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। অস্তিত্ব হারিয়েছে বংশী, তুরাগ, ধলেশ্বরী নদীসহ খাল-বিল। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল আর যত্রতত্র গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা এ জন্য দায়ী।

ওই সভায় বেলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা অননুমোদিত হাউজিং প্রকল্প, কল-কারখানা ও বিনোদনকেন্দ্র সাভারের তুরাগ নদকে দখল করে চলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্রটিযুক্ত সীমানা নির্ধারণ নদী দখলদারদের দখলের পথ আরো প্রশস্ত করেছে। বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘সাভারে ৫০টি কারখানা সরাসরি পরিবেশদূষণের সঙ্গে জড়িত। এই এলাকার খাল-বিল ব্যাপক দূষণের শিকার হচ্ছে এবং আমিনবাজার ওয়েস্ট ডাম্পিং সাইটের ফলে সৃষ্ট দূষণ জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ সমস্যাগুলো ও দূষণসৃষ্ট দুর্ভোগ থেকে স্থানীয় জনগণকে রক্ষায় সরকার, শিল্প-কারখানার মালিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশবাদীদের সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।’ ৫০টির মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তাদের হাতে রয়েছে।

সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠাণ্ডু মোল্লা বলেন, ‘এক শ্রেণির প্রভাবশালী সাভারের নদী-নালা ও খাল দখল করে চলেছে। এদের উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দখল বন্ধ হবে না।’ সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, ‘একসময় সাভার ছিল নদী-নালা, খাল-বিল, কৃষি ও মৌসুমি ফলে সমৃদ্ধ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্প-কারখানার কারণে সেই সাভার এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।’ সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম শামসুল হক বলেন, ‘দখলের কারণে সাভারের অন্তত ১২টি খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া বংশী, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদী দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বড় বড় ভবন। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নামেও দখল করা হয়েছে বংশী নদ।’



মন্তব্য