kalerkantho


স্মৃতির শহর

আলোকিত সমাজের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ

ড. এম অহিদুজ্জামান
উপাচার্য, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আলোকিত সমাজের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ

রাজধানী ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য শহরকেও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ বিপুল কর্মক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পরিকল্পিতভাবে শহরগুলো গড়ে তুলতে পারলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। আমাদের সম্পদ আর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

 

আমার বাবা কলকাতায় পড়াশোনা করতেন। আমার জানা মতে, স্বাধীনতার আগে আমার বাবাও ঢাকায় আসেননি। আমি ঢাকায় থাকা শুরু করি একেবারে আশির দশকের প্রথম দিকে। ঢাকায় প্রথম এসেছিলাম রাজনৈতিক কারণে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার জন্য। সেই থেকে নিয়মিত ঢাকা আসা এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। গুলশান, বনানী, গোপীবাগ ও বাড্ডার ওদিকে অনেক চেনা-জানারা থাকত। তাদের সঙ্গে দেখা করতে ওদিকটায় মাঝেমধ্যে যেতাম। পুরান ঢাকার নবাবপুর পার্টি অফিসে তো হরহামেশা যাওয়া হতো। এরপর ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি করার ফলে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় থেকে রাজনীতি করেছি। বিশেষ করে ধানমণ্ডি, মতিঝিল, টিকাটুলি এলাকায় বেশি থাকতাম। সেই সময় দলের অনেকের সঙ্গে মিলে দলীয় নানা কর্মসূচি পালন করতাম। ১৯৮২ সালে যেদিন সামরিক আইন জারি করা হলো, আমার মনে আছে, সেদিন সকালবেলা উঠে হেঁটে টিকাটুলিতে আমার এক কাজিনের বাসায় গেলাম। ওখানে দুপুরে খেলাম, বিকেলবেলা নবাবপুর পার্টি অফিসে গেলাম। থমথমে ভাব। সে সময় নানা আতঙ্কে দিন কাটাতাম। যা হোক, এভাবেই ঢাকা শহরের সঙ্গে আমার পরিচয়।

আমার ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল জাতির পিতার হত্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও প্রতিরোধ আন্দোলনে আরো বেশি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা। তারই ধারাবাহিকতায় ডাকসুতে নির্বাচিত হই। ছাত্রাবস্থায় সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজি, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমার সৌভাগ্য হয়েছে সে সময়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার।

ঢাকায় সে সময়ে যানবাহনের সংখ্যা বেশ কম ছিল। হেঁটে, রিকশায় কিংবা বাসে চলাফেরা করতাম। সেই সময়ে যাঁরা আওয়ামী লীগ করেছেন, তাঁরা খুবই সৎ, ত্যাগী মানুষ ছিলেন। বাড়ি থেকে টাকা এনে অর্থাৎ পকেটের টাকায় রাজনীতি করতেন। গবেষণা করলে দেখা যাবে, খুব কম লোকই ছিল, যারা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

সেই সময়ের ঢাকা আর এখনকার ঢাকার মধ্যে বিস্তর ফারাক। এখন তো অনেক প্রশস্ত রাস্তাঘাট, তার পরও কী অস্বাভাবিক জ্যাম। মিরপুরে শেওড়াপাড়া রোড ছিল না। রামপুরার রাস্তাটা কাঁচা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে গেছে। মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এসেছে। নানামুখী ব্যবসা বেড়েছে, জনজীবনে উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামকে তো নজরেই নেওয়া হয় না।

যা-ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের কথা বলি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ছোট ছোট টং দোকান ছিল। বিশেষ করে নীলক্ষেত তো ছিলই। ১৫ পয়সায় লুচি, ১০ পয়সায় চা খেতাম। এখন তো ভাবাই যায় না। গুলিস্তান থেকে তিন টাকা রিকশাভাড়া দিয়ে আসতাম। এখন তো ১০০ টাকার নিচে যায় না। রাজনীতি, রাজপথ, গ্রেপ্তার, পুলিশি নির্যাতন, নির্বাচিত হওয়া, এরশাদের পতন ঘটানো—এসব স্মৃতিই বেশি নাড়া দেয়। মনে পড়ছে, আমি যখন গ্রেপ্তার হলাম ১৯৮৩-৮৪ সালে, তখন টর্চারে আমার পা ভেঙে যায়। মুক্তি পাওয়ার পর ডাক্তার পা ব্যান্ডেজ করে দিলেন। আমি একদিন সেই অবস্থায় ক্লাসে গেলাম। একজন পার্টটাইম শিক্ষক ক্লাসে এলেন, ক্লাসটা একটু অন্ধকার ছিল। তিনি বলে উঠলেন, ‘এখানে না!’ মনে করেছেন কোনো ভিক্ষুক। তখন আমার বন্ধুরা খুব রিঅ্যাক্ট করল। ‘স্যার, ও আমাদের বন্ধু।’

তখনকার ঢাকা ছিল মূলত পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। সাংস্কৃতিক আবহাওয়াটা ভালো ছিল। ডাকসু ছিল। সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ড চলত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও কালচারাল টিম ছিল। হলে, ডিপার্টমেন্টে, টিএসসিতে দিবসকেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠান হতো। নাটক হতো। রাজনৈতিক আন্দোলন আর সাংস্কৃতিক আন্দোলন, দুটি পাশাপাশি সমান তালে চলত। একটা স্তব্ধ জনসমাজকে জাগ্রত করতে সাংস্কৃতিক জাগরণের কোনো বিকল্প নেই। একটি আলোকিত সমাজের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ। তখনকার সাংস্কৃতিক আবহাওয়াটা তেমনই ছিল। সবাই মিলে তখন আমরা দেশের জন্য কাজ করেছি। তখন অবসরে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। বলাকায় যেতাম। গুলিস্তান সিনেমা হল, পুরান ঢাকার সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। তখন টেলিভিশন চ্যানেল বলতে এক বিটিভি। টেলিভিশনে সাপ্তাহিক নাটকের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল।

মনে পড়ে, ১৯৮৮ সালের বন্যার সময়ের কথা। আমরা তখন অনেকে মিলে ত্রাণ নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছেছিলাম। আজিমপুর এলাকা ছিল আমার নেতৃত্বে। আমার নেতৃত্বে বিভিন্ন নেতাকর্মী কাজ করেছে। প্রথম দিন আমরা বাসায় বাসায় গিয়ে বলেছি, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আপনারা যে নাশতা বানান তাতে একটা রুটি বেশি বানাবেন, আমরা দুর্গম অঞ্চলে তা পৌঁছে দেব। সব ছাত্র রুটিগুলো প্যাকেট করে মধুর ক্যান্টিনে নিয়ে আসত। আমরা মানবতার জন্য কাজ করেছি। তখন শহর অনেক মানবিক ছিল। সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল। অনেক বেশি গ্রামীণ আবহাওয়া ছিল। পরস্পর পরস্পরকে চিনত। আড্ডা দেওয়া, নাটক করা, আবৃত্তি করা। ষাটের দশকে আন্দোলনের সময়টা খেয়াল করলে দেখা যায়, অনেক ছাত্রনেতা, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী তৈরি হয়েছে। আমাদের সময়ও তার একটা ধারাবাহিকতা ছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগতভাবে আধুনিকায়ন হয়েছে ঠিকই। আমরা কিন্তু আধুনিক হইনি। ওপর থেকে ময়লা ফেলে দেয় নিচে। আগে আমাদের ছাত্রদের শেখানো হতো কিভাবে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। এখন সেটা নেই। ঢাকা শহরে যত্রতত্র পার্কিং করা হয়। পৃথিবীর কোনো শহরে এমনটি নেই। বাসার হোল্ডিং নাম্বার—তার কোনো সিস্টেম নেই। এতে বোঝা যায়, আমাদের সভ্য হতে সময় লাগবে। আবার সিস্টেম হলে অনেক কিছু হয়। যেমন—ঢাকা শহরে সিটিং সার্ভিস দেওয়ার পর লাইন দিয়েই মানুষ গাড়িতে উঠেছে। অর্থাৎ আমাদের দ্বারাও সম্ভব। এ ক্ষেত্রে যথাযথ আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। আমাদের প্রতিটি জায়গায় আইনের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। একসময় মালয়েশিয়ার অবস্থা খারাপ ছিল। ঘুষ, দুর্নীতি চলত। এখন বন্ধ হয়েছে। ফলে তারা রাষ্ট্র হিসেবেও অনেক উন্নতি করেছে।

আমি দেখেছি, তরুণ ছেলে-মেয়েরা ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে পারাপার হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছে, তবু ব্রিজের ওপর দিয়ে যাবে না। এটা ঠিক নয়। আমাদের আইন মানতে হবে। আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে, বড় অঙ্কের জরিমানা করতে হবে। এই জরিমানার একটা অংশ ডিউটিরত পুলিশকে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও ভূমিকা রাখতে হবে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন তো হরহামেশা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এ রকম অপমৃত্যু রোধ করতে হবে। পথচারী দায়ী হলে তার বিচার করতে হবে। চালক দায়ী হলে তারও বিচার করতে হবে। বাসে জ্যাম হচ্ছে না, ট্যাক্সিতেও জ্যাম হচ্ছে না, হচ্ছে প্রাইভেট কারের কারণে। গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ট্রেনের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। দেশের প্রতিটি শহর, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য দিতে হবে। রাজধানী ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য শহরকেও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও বিপুল কর্মক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এভাবে পরিকল্পিতভাবে শহরগুলো গড়ে তুলতে পারলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। আমাদের সম্পদ আর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।



মন্তব্য