kalerkantho


আসন্ন ডাকসু নির্বাচন

এখনো অযত্ন ও বেদখলে হল সংসদ কক্ষগুলো

আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের হাওয়া লেগেছে কলা ভবনের পাশের ডাকসু ভবনেও। ধুয়ে-মুছে নতুন করা হচ্ছে ভবনটি। তবে হল সংসদের কক্ষগুলো সংস্কার বা অন্য সংগঠনের দখলমুক্ত করতে তেমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে

হাসান মেহেদী   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



এখনো অযত্ন ও বেদখলে হল সংসদ কক্ষগুলো

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের একসময়ের ঐতিহ্যবাহী হল সংসদের কক্ষটি এখন যেন আস্তাকুঁড়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন আবাসিক হল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। হলের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই প্রশস্ত খেলার মাঠ। মাঠের পাশেই কোনায় দোতলা ভবনের নিচে হলের ক্যান্টিন। ক্যান্টিনের পাশেই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে দোতলায় উঠতেই চোখে পড়ে ব্যবহৃত সিগারেটের ফিল্টার। ফিল্টার মাড়িয়ে দোতলায় উঠলেই ঐতিহ্যবাহী হল সংসদের কক্ষ। যে কক্ষটি একসময় মেতে থাকত হলের সংসদের নেতাকর্মীদের পদচারণে। দীর্ঘদিন ধরে হল সংসদ অকার্যকর থাকায় সেই কক্ষটি ভর্তি ময়লা-আবর্জনা, শেওলা ও মাদকদ্রব্যের খালি বোতলে। খসে পড়েছে পলেস্তারা। এখন আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের পদচারণ সেখানে না থাকলেও রাত হলেই বসে মাদকের আড্ডা।

স্যার এ এফ রহমান হল। হলের মূল ফটক দিয়ে এগোলেই হলের অফিসকক্ষ। অফিসের দোতলায় ছিল হল সংসদের অফিসকক্ষ। প্রায় তিন দশক ধরে নির্বাচন না হওয়ায় কক্ষটি ব্যবহৃত হয় হলের বিতর্ক অনুশীলন ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমের কাজে। তবে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হলেও কক্ষগুলোর বিষয়ে হল প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের গেটের পাশেই স্টেশনারির দোকান। তার পাশেই রয়েছে হল সংসদের কক্ষ। তবে বছরের পর বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে কক্ষটি। সংস্কার করতে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের মূল ফটকের পরই অতিথিকক্ষ। কক্ষের পাশ দিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই হলের কোনায় হল সংসদের কক্ষ। তবে সেটি ব্যবহার করছে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ইংলিশ লার্নারস’ নামের একটি সংগঠন। ইংরেজি চর্চায় ব্যবহৃত হচ্ছে হল সংসদের কক্ষটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটের বাইরে হল মসজিদ। তিন দশক আগে মসজিদের দোতলায় ছিল হল সংসদের কক্ষ; কিন্তু কক্ষটি এখন ব্যবহৃত হয় হল ডিবেটিং সোসাইটির বিতর্ক আয়োজনের কাজে। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের অতিথিকক্ষের পাশেই হল সংসদের কক্ষ। তবে হলের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার কক্ষ হিসেবে সেটি ব্যবহার করছেন। গণরুমে জায়গা না পেয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা রাত কাটাচ্ছেন প্রতিনিয়তই। জসীমউদ্দীন হলে প্রবেশমুখের পাশেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে কক্ষটি। পুরনো একটি টিভি সেট সেখানে থাকলেও শিক্ষার্থীদের পদচারণ তেমন একটা চোখে পড়ে না। ধুলাবালিতে ভরা থাকে বেশির ভাগ সময়। তবে মাঝেমধ্যে ডিবেটিং সোসাইটির কার্যক্রম সেখানে হয়। হলগুলোর মধ্যে হল সংসদের কক্ষের অবস্থা অবকাঠামো ভালো মাস্টারদা সূর্যসেন হলে। তবে কক্ষটি ব্যবহৃত হয় শিক্ষার্থীদের হরেক কাজে। কখনো ব্যবহৃত হয় বিতর্কে, কখনো ব্যবহৃত হয় আঞ্চলিক শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর মাসিক আলাপচারিতায়।

আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের সব আয়োজন সম্পন্ন করতে জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নির্বাচনের আমেজ এখন বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা, শিক্ষার্থীদের আলাপচারিতা—সবখানেই আলোচনা ডাকসু নিয়ে। প্রশাসন এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের খসড়া তালিকা, ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে কয়েক দফায় গঠনতন্ত্র নিয়ে বৈঠক, হল প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সভা, গঠনতন্ত্র সংশোধন, আচরণবিধি প্রণয়ন, চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে প্রশাসন। শুধু বাকি তফসিল ঘোষণা। ছাত্রসংগঠনগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্যানেল নির্বাচন ও দাবিদাওয়া আদায়ের আন্দোলন কর্মসূচি পালনে। নির্বাচনের হাওয়া লেগেছে কলা ভবনের পাশের ডাকসু ভবনেও। ধুয়ে-মুছে নতুন করা হচ্ছে ভবনটি। তবে হল সংসদের কক্ষগুলো সংস্কার বা অন্য সংগঠনের দখলমুক্ত করতে তেমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনের আমেজ চললেও উপেক্ষিত রয়েছে হল সংসদগুলোর কক্ষ সংস্কারের বিষয়টি। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি হল সংসদের বেলায়। এখনো হলগুলোতে হল সংসদের কক্ষগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক হলে ডিবেটিং সোসাইটি, বাঁধন দখল করে রয়েছে। কিন্তু সেটি নিয়ে হল প্রশাসনের মাথাব্যথা নেই। আমরা অচিরেই কক্ষগুলোর সংস্কার করতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই।

অভিযোগ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠের ঢাকা৩৬০ ডিগ্রিকে বলেন, ‘আর মাত্র কয় দিন পরই ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব ধরনের উদ্যোগ নিলেও উদাসীন শুধু হল সংসদের বেলায়। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হল সংসদের কক্ষ এখনো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রাত হলেই সেখানে বসে মাদকের আড্ডা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেখানে যাওয়ার কোনো পরিবেশ নেই। আমি চাই হল প্রশাসন যেহেতু হল সংসদের সভাপতি, তিনি খুব দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন।’

এ বিষয়ে কথা বলতে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুল আলম জোয়ার্দারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি পরিচয় পেয়ে ক্লাসে আছেন বলে জানান। তার দেড় ঘণ্টা পর ফের ফোন করা হলে তিনি আর রিসিভ করেননি। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও হল সংসদ নির্বাচনের পদপ্রার্থী সিরাজুল ইসলাম রুবেল বলেন, ‘দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়েই একটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। তার প্রতিফলন আমরা কক্ষগুলো সংস্কারের ক্ষেত্রেও দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের ভোটারতালিকার কাজও তারা সেভাবে করতে পারেনি। তাই আমরা চাই চূড়ান্ত ভোটারতালিকা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে হল সংসদের সব কাজ অবিলম্বে সম্পন্ন করা হোক।’ হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে হল সংসদ কার্যকর না থাকায় হলের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কাজে কক্ষটি ব্যবহার করত। তবে আমরা খুব দ্রুতই পাশাপাশি থাকা হল সংসদ, বাঁধন ও ডিবেটিং সোসাইটির কক্ষগুলোর সংস্কারের কাজ শুরু করব। যাতে নির্বাচিত হল সংসদের প্রতিনিধিরা ব্যবহার করতে পারেন। হল সংসদের কক্ষগুলো সংস্কার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠের ঢাকা৩৬০ ডিগ্রিকে বলেন, ‘হল সংসদ সংস্কার করার উদ্যোগ নেবেন হল সংসদের সভাপতি প্রাধ্যক্ষরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়েছে।’



মন্তব্য