kalerkantho


ঢাকায় ভোটার বেশি ভোট কম!

রুদ্র রাজ   

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকায় ভোটার বেশি ভোট কম!

প্রায় দেড় কোটি মানুষের শহর ঢাকা। জাতীয় নির্বাচন মানেই নির্বাচনের আগে-পরে রাজধানী থাকে সরগরম। এ সময় নাগরিকদের মধ্যে চলে রাজনীতি নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশের আলোচনা। দেশের মানুষ নির্বাচনের সময় তাকিয়ে থাকে রাজধানীর পরিবেশ পরিস্থিতির দিকে। মিত্রদেশগুলোও নির্বাচনী শান্ত পরিবেশ বলতে অনেক ক্ষেত্রে বিচার করে রাজধানীর হালচাল দেখে। তবে যে রাজধানী নিয়ে এত প্রচার-প্রচারণা, যেখানে নির্বাচন শেষে বেশির ভাগ এমপি-মন্ত্রীর বসতবাড়ি গড়ে ওঠে। সেই রাজধানীতেই নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে সঠিক ভোটার খুঁজে পেতে একটু সমস্যাই হয় প্রার্থীদের। দেখা যায়, রাজধানীতে থাকলেও বেশির ভাগ মানুষই নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটার। তাই প্রার্থীদের প্রচারণা বা ভোটারের ভালো লাগা বা খারাপ লাগায় তেমন কিছু একটা আসে যায় না! নির্বাচনের সময় রাজধানীতে বসবাসরত তিন ভাগের দুই ভাগ মানুষই থাকে না। তবে কিছুসংখ্যক ভোটার কর্মব্যস্ততার কারণে যেতে না পারলেও বেশির ভাগ ভোটারই ভোটদানের জন্য চলে যান নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায়।

অবশ্য ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, দেশের নাগরিক হলেই তো চলে। নির্দিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়ার কি দরকার। একটি স্বনামধন্য করপোরেট হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রিয়াজুল রশিদ বলেন, ‘আমি যেখানেই থাকি, যে কেন্দ্র থেকেই ভোট দিই, আমার আসনে ভোট যোগ করলেই তো ভেজাল শেষ। তাহলে এত ঝামেলা হয় না। আমার ভোট দেওয়ার জন্য এলাকায় যাওয়া লাগে। আর বিদেশে অবস্থানরত আমাদের পরিবারের অনেক সদস্য তো ভোটই দিতে পারছে না। পদ্ধতির পরিবর্তন সময়ের দাবি।’

সরেজমিনে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রার্থীরা যে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাতে করে একজন মানুষের কাছে একই দলের প্রার্থী বা প্রার্থীর সমর্থক কয়েকবার যাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা-৮ আসনের নৌকার প্রার্থী রাশেদ খান মেননের সমর্থকরা শাহবাগ এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। সড়কে ও পাশের ফুটপাত থেকে দোকান ও সব জায়গার মানুষের কাছেই ভোট চাচ্ছিলেন তাঁরা। ভোট চেয়ে চলে গেছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগই এই আসন বা ঢাকার কোনো আসনেরই ভোটার না। এক ওষুধের দোকানি বলছিলেন, ‘আমি কুমিল্লার ১০ আসনের ভোটার, কিন্তু কী করব, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ওনারা এসে ভোট চাচ্ছেন। বলতেও পারছি না যে আমি এখানকার ভোটার নই। তবু একটু হাসি দিয়ে কোনো মতে চুপ থেকেই বিদায় করলাম।’ পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলে উঠলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোটাররা যেকোনো আসনের, যেকোনো ভোটকেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন। আমাদের সেই সুযোগ নেই। আমরা না হয় নিজের এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে পারছি; কিন্তু যাঁরা দেশের বাইরে আছেন, তাঁদের ভোট কে পাচ্ছেন! কিভাবে দিচ্ছেন! অথচ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অন্যতম।’

‘বর্তমানে দেশের প্রায় এক কোটি বাঙালি বিদেশে বসবাস করছেন। তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন’

রাজধানীতে অবস্থানরত দেশের বিভিন্ন এলাকার ভোটার এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের ভোট দেওয়া প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী বলেন, ‘আসলে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজধানীতে ভোট না দিতে পারলেও প্রচারণাটা দলীয় কাজে আসে। দেশের নাগরিকদের যেকোনো ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে ভালো হতো; কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় হয় না। পাকিস্তান আমলে পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা ছিল। তার মাধ্যমে যেকোনো জায়গা থেকে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। আগের এই ব্যবস্থা আবার চালু করা গেলে ভোটার সংখ্যা বাড়বে। এই ব্যবস্থার একটা চাহিদা আছে। যতটুকু জানি বিদেশি নাগরিকরা সব সময় ভোটব্যবস্থার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে।’ ঢাকা-৭ আসনে বসবাসকারী ব্যবসায়ী সালমান শিকদার বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী বেশ কয়েক জায়গায় হতে পারছেন; কিন্তু আমরা যাঁরা তাঁদের নির্বাচিত করব, তাঁদের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে হয়, যা অনেকের জন্য ভোগান্তির।’ বিষয়টি নিয়ে কথা বললে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, ‘একই ভোটার তালিকা দিয়ে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ভোট দিয়ে থাকি। তাই আসলে পরিবর্তন বা যেকোনো জায়গা থেকে ভোট দেওয়া সম্ভব হবে না। আমরা যাঁরা ঢাকায় অবস্থানরত আছি, তাঁরাও ততটা শহুরে হয়ে উঠিনি। তাই অনেকেই গ্রামে গিয়ে ভোট দিতে চান।’ তথ্য-প্রযুক্তির বর্তমান বিপ্লবের সময় আমরা যেকোনো জায়গা থেকে কেন ভোট দিতে পারছি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে তো আমরা ইভিএমই চালু করতে পারলাম না। সেটা হলে হয়তো প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে পরিবর্তনের কাজ করা যেত। এটা করা সম্ভব, আমি যেখান থেকেই ভোট দিই না কেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় ভোট চলে যাবে। তবে এর আগে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে এবং প্রযুক্তির প্রতি আস্থা বাড়াতে হবে। শুধু তাই নয়, পরিবর্তন করা গেলে, প্রার্থীদের ভোটারদের কাছেও যাওয়া দরকার হয় না। সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিজের স্মার্টফোন দিয়েই প্রচারণা চালাতে পারেন। আমরা যদি বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারি। তবে ভোট কেন দিতে পারব না। এটা প্রযুক্তির বিকাশ ও আস্থার সংকটের কারণে হয়ে উঠছে না।’

জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশনের ২০১৮ সালের এক তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ঢাকার বর্তমানে জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। আর নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে ঢাকার ১৫টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫৪ লাখ ১৭ হাজার ৭৭৫ জন, যা রাজধানীতে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগও না! বিষয়টি সম্পর্কে কথা বললে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীতে প্রচার করলে সারা দেশেই এক ধরনের প্রচারণা হয়ে যায়। কারণ ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় এসে বসবাস করেন। এবং ভোটের সময় বেশির ভাগই নিজ নিজ এলাকায় চলে যান, যা বিভিন্ন অঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলে। তবে বর্তমানে দেশের প্রায় এক কোটি বাঙালি বিদেশে বসবাস করছেন। তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন করা এবং সেই আইনের মাধ্যমে ভোটদানের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন।’



মন্তব্য