kalerkantho


রাজধানীতে মহাজোট প্রার্থীরা এগিয়ে

নিখিল ভদ্র   

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানীতে মহাজোট প্রার্থীরা এগিয়ে

নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন ঢাকা-৮ আসনের মহাজোটের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ছবি : মঞ্জুরুল করিম

নির্বাচনী উত্তেজনায় কাঁপছে পুরো রাজধানী। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রার্থীরা। রাজপথ থেকে অলিগলি—সর্বত্র চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। সবার মধ্যে একই আলোচনা, কে হচ্ছেন আগামী দিনের সংসদ সদস্য। আগামী ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে রাজধানীর ২০টি আসনে মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে মহাজোট প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমনটিই তথ্য পাওয়া গেছে।

এলাকাবাসী জানায়, ঢাকা-২০ আসনে বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় সেখানে মহাজোট সমর্থিত আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। ধামরাই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে নৌকা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ। তাঁর বিপরীতে বিএনপি প্রার্থী তমিজ উদ্দিনের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তবে সাভার ও আশুলিয়া নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনে জয়লাভ করতে রীতিমতো বেগ পেতে হবে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমানকে। তাঁর বিপরীতে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন। অন্যদিকে ঢাকা-১৮ আসনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন সহজ জয় পাবেন বলে এলাকাবাসী মনে করেন। সেখানে ধানের শীষ নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) শহীদ উদ্দীন মাহমুদ। তবে অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাসানটেক নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসনে জমজমাট লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। একসময়ের জনপ্রিয় নায়ক ফারুক নির্বাচনে নেমেই রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ (ধানের শীষ) মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মিরপুর এলাকার ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ আবারও বিজয়ী হবেন বলে আশাবাদী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপির প্রার্থী আহসান উল্লাহ হাসান। তবে মিরপুর এলাকার ডিএনসিসির ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৫ আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে মহাজোট প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার। তাঁর সঙ্গে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। মিরপুর এলাকার ডিএনসিসির ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড ও সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসনেও জমজমাট লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে নৌকার প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেকের ছেলে এস এ সাজু।

রাজধানীর ২০টি আসনে মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আপাতদৃষ্টিতে মহাজোট প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। তবে কে বিজয়ী হবেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলানগর নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুজনই নতুন প্রার্থী। তবে এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানের। তিনি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম। ডিএনসিসির ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনে এবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। তিনি মহাজোটের মনোনয়নে নৌকা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাইফুল ইসলাম নিরব। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। ঢাকা-১১ আসনেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নৌকা মার্কার প্রার্থী ঢাকা উত্তর সভাপতি আওয়ামী লীগের এ কে এম রহমতউল্লাহ। এ আসনে ঢাকা উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হতে পারেননি। তবে তাঁর স্ত্রী শামীম আরা বেগম প্রার্থী হয়েছেন।

রাজধানীর কলাবাগান, ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগের একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ আসনে এবারও নির্ভয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে তাপস মহাজোটের মনোনয়নে নৌকার হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। তাঁর বিপরীতে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান। তিনি এখনো মাঠে নামতে না পারলেও মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস। রাজধানীর খিলগাঁও ও সবুজবাগ থানার নাসিরাবাদ ইউনিয়ন, দক্ষিণগাঁও ইউনিয়ন ও মাণ্ডা ইউনিয়ন এবং ডিএসসিসির ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনের মহাজোটের প্রার্থী সাবের হোসেন চৌধুরী। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও বিশ্বের আইন প্রণেতাদের সংগঠন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সাবেক এই সভাপতি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে ডিএসসিসির ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসনে। এই আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবারও মহাজোটের প্রার্থী। তাঁর সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস, যিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মেয়র। আর ঢাকা-৭ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাজি সেলিম ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও এবার আওয়ামী লীগের হয়ে নৌকা প্রতীকে লড়ছেন। তাঁর বিপরীতে ধানের শীষে লড়ছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মোস্তফা মহসীন মন্টু। তিনি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক। এই আসনের মতো ঢাকা-৬ আসনেও জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। রাজধানীর ওয়ারী, গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর থানা এবং কোতোয়ালি ও বংশালের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ। বর্তমান এই সংসদ সদস্য লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বিপরীতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী।

ডিএসসিসির ৪৮, ৪৯ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ড এবং ডেমরা, দনিয়া, মাতুয়াইল ও সারুলিয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনে কে বিজয়ী হবেন, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এই আসনে নৌকার প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা। এখানে ধানের শীষে লড়ছেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা নবীউল্লা নবী। একই অবস্থা ঢাকা-৪ আসনেও। ডিএসসিসির ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এবং শ্যামপুর থানার শ্যামপুর ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী লাঙ্গল মার্কার সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। বর্তমান সংসদ সদস্য বাবলার বিপরীতে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহম্মেদ।

কেরানীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-৩ আসন বেশির ভাগ সময় বিএনপির দখলে থাকলেও এবার সুবিধাজনক স্থানে বর্তমান সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ (বিপু)। তিনি বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ওই আসনের মতো জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ঢাকা-২ আসনে। কেরানীগঞ্জের সাতটি ও সাভার উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ও কামরাঙ্গীর চর নিয়ে গঠিত এই আসনে নৌকার প্রার্থী খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। তাঁর বিপরীতে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমানের ছেলে ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি।

ঢাকার বেশির ভাগ আসনে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও ব্যতিক্রম ঢাকা-১ আসন। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেশের দুই শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপের কর্ণধার। বর্তমান সংসদ সদস্য যমুনা গ্রুপের সালমা ইসলাম। গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এবার মোটরগাড়ি (কার) মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আর মহাজোট থেকে নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারীকরণ উপদেষ্টা ও দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেক্সিমকোর কর্ণদ্বার সালমান এফ রহমান। দুজনই প্রচার-প্রচারণায় নির্বাচনী এলাকা সরগরম করে রেখেছেন। তবে কে বিজয়ী হবেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।



মন্তব্য