kalerkantho


গণপরিবহন কমলেই বাড়ে রাইড শেয়ারিং ভাড়া

জাহিদ সাদেক   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গণপরিবহন কমলেই বাড়ে রাইড শেয়ারিং ভাড়া

রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে নিয়মিত কারওয়ান বাজার অফিসে যাতায়াত করেন রায়হান আরেফীন। রাস্তায় যানজট কিংবা গণপরিবহন কম থাকলে ব্যবহার করেন রাইড শেয়ারিং অ্যাপস। এতে সব সময়ই পাঠাও বা উবারে ১১৫ টাকা ভাড়ার বেশি আসে না; কিন্তু হঠাৎ কোনো কারণে রাস্তায় গণপরিবহন কমে গেলে ভাড়া বেড়ে যায় দেড় থেকে দ্বিগুণ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত অক্টোবর মাসে পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটে রায়সাহেব বাজার থেকে কারওয়ান বাজার যেতে ১১৫ টাকার পরিবর্তে ভাড়া আসে ২১৩ টাকা। এ ব্যাপারে উবারের ফেসবুক অফিসিয়াল পেজে অভিযোগ করেও তিনি কোনো সমাধান পাননি। এমন আরো বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। তাঁরা বলছেন, যখনই রাস্তায় গণপরিবহন কমে যায়, তখনই বেড়ে যায় তাঁদের রাইডের ভাড়া। এ ছাড়া বেশ কিছু অনিয়মের কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। অনেক চালক মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে অ্যাপস ছাড়াই পৌঁছে দেওয়ার কথা বলছেন। এতে যাত্রীরা রাজি হলে নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ ভাড়ায় যাচ্ছেন তাঁরা। এতে একদিকে যেমন কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তেমনি হুমকির মুখে পড়ছে যাত্রীদের নিরাপত্তা।

গত অক্টোবর মাসের পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট চলাকালে রাজধানীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে সরেজমিনে দেখা যায় উবার, পাঠাও, ওভাই, আমার রাইড, মুভ, বাহন, ইজিয়ার, চলোসহ বেশ কয়েকটি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর হয়রানির চিত্র। অন্যদিকে চালকরাও সুযোগ বুঝে দাম হাঁকিয়ে নিচ্ছেন অ্যাপ ব্যবহার না করেই। অনেকে আবার সিএনজি রিকশাওয়ালাদের মতো নির্দিষ্ট গন্তব্যের নাম ধরে হাঁক-ডাক দিচ্ছেন। রাস্তার মোড়ে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেই কেউ কেউ জিজ্ঞেসও করছেন উবার বা পাঠাওতে কোথাও যাবেন কি না। আবার যাঁরা অ্যাপ ব্যবহার করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও কোনো কোনো সময় আসছে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া। রাস্তায় গণপরিবহন না থাকায় প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই মুখ বুঝে সহ্য করেই চলাচল করছেন রাইড শেয়ারিংয়ে।

পরিবহন ধর্মঘট চলাকালে সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এহসান কবীর নামের এক পাঠাও ব্যবহারকারী বলেন, ‘প্রমোকোড থাকার পরও সূত্রাপুর থেকে বনানীর ভাড়া দেখাচ্ছে ২২০ টাকা, যেখানে একই প্রমোকোড দিয়ে আমি অন্যান্য দিন যাতায়াত করি ১৭০ বা ১৮০ টাকায়। এখান থেকে বনানীতে প্রমোকোড ছাড়াই ২৫০ টাকা ভাড়া আসে।’ এসব প্রতারণার শিকার হয়ে অভিযোগ না করার বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘আমি কাজের মানুষ, এসব করার সময় কোথায়। এটা আরেকটা বাড়তি ঝামেলা।’ রাকিবুল ইসলাম নামের আরেক উবার ব্যবহারকারী বলেন, ‘গুলিস্তান থেকে আমি প্রায়ই উবারে মিরপুরে যাতায়াত করি, প্রমোকোডে আমার ভাড়া আসে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা, অথচ গণপরিবহন কম থাকলেই তা বেড়ে ৩০০ টাকা হয়ে যায়।’ রাইড শেয়ারিং অ্যাপস ব্যবহারকারী অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যখনই রাস্তায় গণপরিবহন কমে যায় কিংবা যানজট থাকে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায় রাইডের দাম।

এদিকে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ে ভোগান্তির নতুন মাত্রা যোগ করেছে কন্ট্রাক্টে যাত্রী পরিবহন। সরেজমিনে রামপুরা-বাড্ডা লিংক রোড, কারওয়ান বাজার, গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট, গাবতলীতে দেখা গেছে বিপুলসংখ্যক পাঠাও-উবার রাইডার অ্যাপস ছাড়াই কন্ট্রাক্টে যাত্রী বহন করছে। রাস্তায় গণপরিবহন কম থাকার সুযোগ নিয়ে তারা বাড়তি ভাড়ায় সরাসরি যাত্রী বহন করছে। এতে বড় অঙ্কের টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কম্পানি ও সরকার। ফার্মগেট মোড়ে থাকা রাইসুল নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমি মহাখালী যাব। অনেক সার্চ করেও রাইডার পেলাম না। যেসব ড্রাইভার পাশে আছেন, সবাই কন্ট্রাক্টে যাত্রী নিচ্ছেন। ফার্মগেট থেকে বাইকে মহাখালী স্বাভাবিক ভাড়া ৬০-৭০ টাকার বেশি না হলেও তাঁরা চাইছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এভাবে বেশি দাম চেয়ে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এটা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো তো আরো বেশি ভাড়া চাইছে।’

এদিকে শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরির গেটে দাঁড়িয়ে থাকা একজন চালক বলেন, ‘অ্যাপসের মাধ্যমে যাত্রী নিতে গেলে মাঝেমধ্যে অনেক রিকোয়েস্ট আসে, আবার কখনো আসে না। আবার রিকোয়েস্ট এলেও অনেক সময় যাত্রী দূরে থাকে। এতে সময় বেশি লাগে; কিন্তু ইনস্ট্যান্ট যাত্রী নিলে সে সময় লাগে না। এ ছাড়া কন্ট্রাক্টে গেলে পুরো টাকাই তো আমার থাকল। এতে অ্যাপকেও কোনো টাকা দিতে হলো না, লাভও বেশি হচ্ছে।’ চালকদের অনেকেই বলছেন, ‘রাস্তায় গণপরিবহন কম থাকার সুবাদে আমাদের একটু লাভই হচ্ছে।’

যাত্রীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাঠাও লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা নাবিলা মাহবুব বলেন, ‘যেহেতু আমরা সব কাজই করছি অনলাইনভিত্তিক, তাই নির্দিষ্ট ভাড়ার বাইরে ভাড়া বেশি কাটার কোনো সুযোগ নেই। প্রমোকোডের ক্ষেত্রে পারসেন্টের হিসাব করে যা আসে, গ্রাহকদের সে অনুযায়ীই ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। তবে ইন্টারনেট কানেকশন জিপিএসের জন্য অনেক সময় দেখানো টাকা থেকে ভাড়া বেশি আসে, যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান করা হয়।’ যাত্রীদের ডাকাডাকি নিয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যাপস ব্যবহার ছাড়া রাইড শেয়ারের বিষয়ে অনেক অভিযোগ পেয়েছি। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আপনি যখন অ্যাপস ব্যবহার করবেন না, তখন আমরা কিন্তু এর দায় নিতে পারব না। তাই বিপদ এড়াতে গ্রাহকদেরই প্রথমে সতর্ক হতে হবে।’



মন্তব্য