kalerkantho


৩৩ বছরে উধাও ঢাকার ১৯০০ পুকুর

রাতিব রিয়ান   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



৩৩ বছরে উধাও ঢাকার ১৯০০ পুকুর

বিলুপ্তির মুখে টিকে থাকা গুটিকয়েক পুকুরের একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল পুকুর

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখলদারি ও আবাসন চাহিদার কারণে ১৯৮৫ সাল থেকে এই পর্যন্ত গত ৩৩ বছরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঢাকার এক হাজার ৯০০ সরকারি-বেসরকারি পুকুর ও জলাধার। এসব পুকুরের মোট জমির পরিমাণ ৭০ হাজার হেক্টর। এই পুকুরগুলো একসময় ছিল পানি ধরে রাখার অন্যতম মাধ্যম। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে এগুলোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, ১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকায় মোট পুকুর ছিল দুই হাজার। বেসরকারি হিসাবমতে, এ বছর পর্যন্ত তা এসে ঠেকেছে এক শতে। যদিও ঢাকায় পুকুরের প্রকৃত সংখ্যা কত সে হিসাব নেই দুই সিটি করপোরেশনের কাছে।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডাব্লিউএম) এক সমীক্ষা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত সাড়ে তিন দশকে হারিয়ে গেছে ঢাকার ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি, খাল ও নিম্নাঞ্চল। জলাশয় ভরাটের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৯৫২ হেক্টর এবং নিম্নভূমি ১৩ হাজার ৫২৮ হেক্টর। একই সময়ে খাল ও নদী ছিল দুই হাজার ৯০০ হেক্টর। রাজধানীর বৃষ্টির পানি এসব খাল দিয়েই পড়েছে নদীতে। ২০১৪ সালে ঢাকা ও আশপাশে জলাভূমি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৩৫ হেক্টর, নিম্নভূমি ছয় হাজার ১৯৮ হেক্টর এবং নদী-খাল এক হাজার দুই হেক্টর। অর্থাৎ ৩৫ বছরে জলাশয় কমেছে ৩৪.৪৫ শতাংশ। এ সময়ের ব্যবধানে নিম্নভূমি কমেছে ৫৪.১৮ এবং নদী-খাল ৬৫.৪৫ শতাংশ।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরে বড় বড় ভবন গড়ে উঠছে; কিন্তু এগুলো নির্মাণের পেছনে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা নেই। ফলে পুকুর-খাল-বিল-জলাধার একের পর এক বিলীন হচ্ছে। জলাধার রক্ষায় আইন থাকলেও সেগুলো না মানায় একের পর এক ভরাট হয়ে সেখানে গড়ে উঠছে আবাসন। এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘পুকুরগুলো থাকলে সেগুলো পানি ধরে রাখতে পারত। এর ফলে জলাবদ্ধতার চাপ অনেকাংশে কমানো যেত। প্রাকৃতিক এসব মাধ্যম না থাকায় অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা নগর ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলছে। নগরবাসীর সুবিধার জন্য এসব পুকুর সংরক্ষণ বা টিকিয়ে রাখা দরকার ছিল।’

পুরান ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিক। জন্মসূত্রে ঢাকার আদি বাসিন্দা। বয়স এখন তাঁর ৮০-এর ঘরে।

নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘ঢাকার যেখানেই যেতাম, সেখানেই কোনো না কোনো পুকুর চোখে পড়ত। মানুষ ওই সব পুকুরে গোসল করত, সাঁতার কাটত।’ তিনি আরো বলেন, ‘শাহবাগ এলাকায় পাশাপাশি তিনটি পুকুর ছিল। একটি পুকুর ভরাট করে আজিজ সুপার মার্কেট করা হয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি পুকুর ভরাট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল করা হয়েছে। তৃতীয় পুকুর ভরাট করে বিদ্যুৎ স্টেশন বানানো হয়েছে অনেক আগেই।’ তিনি জানান, তাঁর এলাকা জিগাতলা, রায়েরবাজার, হাজারীবাগেও অনেক পুকুর-ডোবা ছিল, সময়ের ব্যবধানে যেগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এখানে বড় বড় ভবন গড়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুকুর ভরাট হয়েছে। ভরাট হয়েছে রেলস্টেশনের পূর্ব দিকের পুকুর। এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের পুকুর ভরাট করায় সেটি হয়েছে এখন খেলার মাঠ। এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর, জহুরুল হক হলের পুকুরটি টিকে আছে। এ ছাড়া রমনা পার্কের বিশাল দিঘি পার্কের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে আজও। টিকে আছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরটি। কদমতলা-রাজারবাগের গঙ্গাসাগর দিঘিটি এখনো আছে। সবুজবাগের বৌদ্ধবিহারের পুকুরও উন্মুক্ত রয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী-ইসলামপুরের নবাববাড়ির পুকুর আগের মতোই আছে। পুরান ঢাকার বংশাল পুকুরে রয়েছে সিঁড়িসহ দুটি ঘাট। বংশালের পুকুরটি ছয় বিঘা জমির ওপর কাটা। আছে নওয়াব আবদুল বারীর পুকুর। আহসান মঞ্জিল পরিবারের নওয়াব আবদুল বারীর খননকৃত বিশাল পুকুর। ১৮৩৮ সালে এটি খনন করা হয়।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে পুণ্যার্থীরা স্নান সারতে আসেন নিয়মিত। কদমতলা-রাজারবাগের কালীমাতা মন্দিরে রয়েছে গঙ্গাসাগর দিঘি। এই দিঘিটিতেও বহু লোক প্রতিদিন আসেন গোসল করতে। এ ছাড়া পুরান ঢাকা সিক্কাটুলী পুকুরটি দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে ভূমিদস্যুরা।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি দখলের পাঁয়তারায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন জানিয়েছে, ঢাকার অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদার ৯০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে গভীর নলকূপের ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। গবেষণামতে, প্রতিবছর পানির স্তর পাঁচ-ছয় মিটার নামছে। যদি ঢাকার পুকুর ও খাল সংরক্ষণ করা হতো, তাহলে পানির জন্য মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। ঢাকায় যেসব পুকুর অবশিষ্ট আছে, সেগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। দখলদারির বিরুদ্ধে ভয়াবহ শাস্তি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি হয়ে পড়েছে।

শুধু ঢাকা শহর নয়, ঢাকার বাইরেও পুকুরগুলো একের পর এক দখল হয়ে যাচ্ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী বসিলা, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার, টঙ্গী—এসব এলাকার পুকুরগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ ঢাকার ইতিহাস বলছে, একসময় ঢাকার খালগুলোর সঙ্গে আশপাশের চারটি নদীর মিলন ছিল। সূত্রাপুর থেকে লোহারপুল হয়ে বুড়িগঙ্গা, মোহাম্মদপুরের বসিলা হয়ে বুড়িগঙ্গা, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর হয়ে তুরাগ, উত্তরখান হয়ে তুরাগ, খিলক্ষেত ডুমনি হয়ে বালু ও মানিকনগর হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচল করা যেত। বুড়িগঙ্গা নদীর বসিলা থেকে ধানমণ্ডি, তেজগাঁও, রামপুরা হয়ে তুরাগে মিলেছিল শুক্রবাদ খাল। মোহাম্মদপুর ও পিসিকালচার হাউজিংয়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কাটাসুর খালটি ঝিমিয়ে টিকে আছে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের প্রধান নির্বাহী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান বলেন, ‘সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে জলাভূমিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের ভেতরে একসময় বড় বড় জলাধার ছিল। সেগুলো ভরাট কিংবা দখল হয়ে গেছে। আগে অনেক পুকুর থাকলেও এখন তার অস্তিত্ব নেই। একমাত্র হাতিরঝিল ছাড়া আর কোনো জলাধার রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ঢাকার অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত জলাধার না থাকায় নিম্নভূমিগুলো প্লাবিত হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ শতাংশ জলাশয় থাকা প্রয়োজন, সেটা ভুলে গেলে চলবে না।’



মন্তব্য