kalerkantho


ইতিহাসের খেরোখাতা

সেকালের ঢাকায় নিত্যদিনের হিসাব-নিকাশ

হোসাইন মোহাম্মদ জাকি   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সেকালের ঢাকায় নিত্যদিনের হিসাব-নিকাশ

বিভিন্ন সময়ের নানা ধরনের মুদ্রা

শহর ঢাকার সবচেয়ে পুরনো বাজার ‘পাদশাহীবাজার’, যা পরবর্তী সময় ‘চকবাজার’ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করে। এখানে এককালে বাজার করতে আসত ঢাকার বিত্তবান ও ক্ষমতাশালীরা। গনি মিয়ার হাট, নয়াবাজার, বাবুবাজার, বাদামতলী—এসব জায়গায়ও বড় বাজার বসত। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে শিল্পপণ্য বলতে শুধু হস্তশিল্পজাত ও কুটির শিল্পজাত পণ্যেরই দেখা মিলত বাজারগুলোতে। কুমাররা মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে নিজেরাই বিক্রি করত। মহাজনরা করত শিংজাত শিল্পদ্রব্য, পাট, ঢাকাই বস্ত্র ও চামড়ার ব্যবসা। এসব ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন ধরনের মুদ্রার প্রচলন ছিল। মোগল আমলের মুদ্রা ছিল ‘মোহর’। এটি ছিল স্বর্ণমুদ্রা। মোহরের মূল্য সময় সময় পরিবর্তন হতো; কখনো ২৪, কখনো ১৭ আবার কখনো ১৬ টাকা হতো। এ ছাড়া ঢাকায় বিভিন্ন ধাতব মুদ্রার প্রচলন ঘটে সময়ে সময়ে। ব্রিটিশ শাসনামলে ধাতব মুদ্রার পাশাপাশি কাগজের নোটের প্রচলন হয়। ঢাকায় পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাম্র ও রৌপ্য মুদ্রায় লেনদেন হতো হরহামেশা। প্রচলন ছিল পাই, আধাপয়সা, পয়সা ও ডাবল পয়সার। এগুলো ছিল তাম্রমুদ্রা। এ ছাড়া ছিল দুয়ানি, সিকি, আধুলি ও টাকা। এগুলো ছিল রৌপ্য মুদ্রা। রুপার মুদ্রাকে ঢাকাইয়ারা বলত ‘চান্দির টাকা’ বা ‘কাঁচা টাকা’। শামসুজ্জামান খানের ‘ঢাকাই রঙ্গ-রসিকতা’ বইয়ে ‘চান্দির টাকা’ নিয়ে সে সময়ের একটি ঢাকাই গল্প হলো এ রকম—‘গ্রামের এক ভদ্রলোক ফল কিনতে এসেছেন এক ঢাকাইয়া ফলের দোকানে। টাকার ভাংতি দেওয়ার সময় দোকানি ‘চান্দির টাকা’ থেকে ভারমুক্ত হওয়ার জন্য ওগুলো গছিয়ে দিতে চাইছিল ক্রেতাকে। ক্রেতা নাছোড়বান্দা। কোনোক্রমেই ‘চান্দির টাকা’ নেবে না। তার একটাই কথা, কাগজের নোট চাই। অবস্থা বেগতিক দেখে দোকানের মহাজন একপর্যায়ে বিক্রয়কর্মী ইখতিয়ারকে বললেন, ‘ওই হালা ইখতাইরা, মান্দারপুত তুই উজবুক নিহি। তুই হালায় কিছুই বুঝবার পারছ নাই। নাদান কাহেকা! ছাব বহুত উপরকা আদমি। হাওই জাহাজে চইড়া যাইব। কাঁচা ট্যাকা নিলে ওজন বাইড়্যা যাইব না? তহন হাওই জাহাজের পাইলট ছাবে যে বেছি ভাড়াডা চাইব হেইডা কি তুই তর বাপের জমিদারি বেইচা দিবি নিহি! ছাবরে জলদি কাগজের ট্যাকা দে। ছাব হালকা অইয়া উড়াজাহাজে চড়ব।’

ঢাকা ছিল তখন ষোলো আনার শহর। দুই আনা-চার আনা দিয়ে ক্রয় করা যেত অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী। এই ষোলোটি আনাকে পাঠ্যপুস্তকে সেকালে যেভাবে প্রকাশ করা হতো, তার লিপিবদ্ধ চিত্র ছিল নিম্নরূপ—

ব্যাবসায়িক লেনদেনের জন্য আঠারো শতকের শুরু থেকে গত শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকার জনজীবনে প্রচলিত ছিল শতকিয়া-কড়াকিয়া নামের গণনাপদ্ধতি। এ ছাড়া জনপ্রিয় ছিল সেরকষা, মণকষা ও কাঠাকালির আর্য্যা। সেরকষার একটি জনপ্রিয় আর্য্যা ছিল—

‘সের প্রতি দ্রব্য যত হইবেক দর,

টাকা প্রতি চল্লিশ টাকা মণ প্রতি ধর

সিকি প্রতি দশ টাকা ধরিয়া লইবে।

আনাতে আড়াই টাকা নিশ্চয় জানিবে

পাই প্রতি দশ আনা, গণ্ডায় দুয়ানি।

কড়া প্রতি পাই এইরূপ গণি’

কেউ যদি বলেন, আমার হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দাও। তাহলে বিষয়টি হলো—এক টাকার (১৬×৪×৫×৪)=১২৮০ ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে তাঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে। যেখানে ৪ কড়া = ১ গণ্ডা, ৫ গণ্ডা = ১ বুড়ি বা পয়সা, ৪ বুড়ি বা পয়সা = ১ পণ বা আনা, ৪ পণ বা আনা = ১ চৌক, ৪ চৌক বা ১৬ পণ = ১ টাকা বা কাহন।

শ্রী কেদারনাথ মজুমদার তাঁর ‘ঢাকার বিবরণ ও ঢাকা সহচর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৮৪০ সালে ঢাকা জেলার সর্বত্র জিনিসের ওজন সমান ছিল না। কাঁচা ও পাকা ওজন প্রচলিত ছিল। কাঁচা ওজনের মাপে ৬০ তোলায় এক সের ধরা হতো। অন্যদিকে পাকা ওজনে ৮০ তোলায় ধরা হতো এক সের। পিতল-কাঁসার দ্রব্যাদি কাঁচা হিসেবে এবং চাল-তেল প্রভৃতি পাকা হিসেবে পরিমাপ করা হতো। পাকা ওজনও সর্বত্র সমান ছিল না। কোথাও ৮০ তোলা, কোথাও ৮২ তোলা এবং কোথাও ৮২ তোলা ১০ আনায় পাকা ওজন ধরা হতো। মীরকাদিম বন্দরে গুড় কেনাবেচার সময় ৯০ তোলায় সের ধরা হতো। ফলে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আমজনতা প্রায়ই প্রতারণার শিকার হতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সদরঘাটকেন্দ্রিক বাজারে আসা লোকেরা প্রতারণার শিকার হতো তুলনামূলকভাবে বেশি।

ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন বিক্রি হতো ওজন দরে। ওজন করা হতো সিক্কা-গ্রেনে (১ সিক্কা=১৮০ গ্রেন এবং ১ গ্রেন=০.০৬৫ গ্রাম)। উৎকৃষ্ট মসলিন ‘মলমল খাস’ ওজনে যত পাতলা হতো, ততই তা অধিক দরে বিক্রি হতো। স্বর্ণকারদের দোকানে সোনা-রুপা মাপার ক্ষেত্রে প্রচলন ছিল ‘রতি’র। রক্তকুঁচের উজ্জ্বল লাল রঙের বীজ হচ্ছে এ ‘রতি’। সোনা-রুপা মাপার একক হিসেবে ধান-রতি-মাসা-আনা-তোলার ব্যবহার প্রচলিত ছিল। মণিমুক্তা, মসলা, ওষুধ, সুতা ইত্যাদিও তোলায় পরিমাপ করা হতো। তোলায় পরিমাপের ক্ষেত্রে পণ্যভেদে মাসার সংখ্যায় বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। সোনা-রুপা ছিল ১০ মাসায় এক তোলা, ওষুধ ও মসলা ছিল ১২ মাসায় এক তোলা এবং মণি, রত্ন, প্রবাল প্রভৃতির জন্য প্রচলিত ছিল সাড়ে বারো মাসা। শুধু সোনা-রুপাই নয়, ব্রিটিশ সাহেবদের মদ্যপানে আসক্তির কারণে—মদের পরিমাণ কিভাবে নির্ণয় করতে হয়, সে হিসাবও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের শিখতে হয়েছিল। মদ পরিমাপের এককগুলো ছিল জিলে, পাঁইট (৪ জিলে), কোয়ার্ট (২ পাঁইট) ও গ্যালন (৪ কোয়ার্ট)।

রক্তকুঁচের উজ্জ্বল লাল রঙের বীজ হচ্ছে ‘রতি’। সোনা-রুপা মাপার ক্ষেত্রে এর প্রচলন ছিল

ঢাকা জেলায় ভূমি পরিমাপের ক্ষেত্রে কাশুরী (কাঁচা) ও সাহী (পাকা)—দুই ধরনের মাপ প্রচলিত ছিল। কাঁচা মাপে জমির খাজনার হিসাব এবং পাকা মাপে জমির কেনাবেচার কাজ সম্পন্ন হতো। ভূমির পরিমাপ করা হতো নল দ্বারা। এ নলের পরিমাণও সব জায়গায় একই ছিল না। কোথাও কানি, কোথাও দ্রোণ, কোথাও পাখি, কোথাও খাদা, আবার কোথাও বিঘার মাপে জমির পরিমাপ হতো। ঈশা খাঁর শাসনামলে প্রজাদের প্রতি কানি জমির খাজনা চৌদ্দ পয়সার বেশি দিতে হতো না। রমনার ঘোড়দৌড়ের রেসে দূরত্ব পরিমাপ করা হতো ফার্লংয়ের (১/৮ মাইল) মাধ্যমে। এ ছাড়া দূরত্ব পরিমাপে ব্যবহৃত হতো মাইল (১.৬০৯ কিলোমিটার), নটিক্যাল মাইল (১.৮৫২ কিলোমিটার)। বস্ত্র পরিমাপের ক্ষেত্রে শহর ঢাকায় প্রথমে সুলতানি গজ প্রচলিত হয়। সেখানে গজ ধরা হতো সাড়ে ছত্রিশ ইঞ্চিতে। পরবর্তী সময়ে প্রচলিত হয় কম্পানি গজ, যা ধরা হতো সাড়ে উনচল্লিশ ইঞ্চিতে।

শহর ঢাকার সবচেয়ে পুরনো বাজার ‘পাদশাহীবাজার’ যা পরবর্তী সময় ‘চকবাজার’ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করে

‘এক দণ্ডও ফুরসত নাই’ বা ‘তিনি চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন’—এ শব্দগুলো আমাদের সেকালের প্রহর (৩ ঘণ্টা), দণ্ড (২৪ মিনিট), পল (২৪ সেকেন্ড), বিপল (০.৪ সেকেন্ড) ও অনুপল (১ সেকেন্ডের ১৫০ ভাগের এক ভাগ)-এর কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু নতুন প্রজন্ম হারিয়ে ফেলছে সেকালের ঢাকায় ব্যবহৃত নিত্যদিনের হিসাব-নিকাশের এই ইতিহাস। অন্য অর্থে আমরা হারাতে বসেছি আমাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি তথা সংস্কৃতির এ উল্লেখযোগ্য অংশটুকু। হিসাব-নিকাশের এ হারানো সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে নিশ্চয়ই।



মন্তব্য