kalerkantho


বেদখলে কমছে বংশী-ধলেশ্বরী ও তুরাগের প্রশস্ততা

তায়েফুর রহমান, সাভার   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বেদখলে কমছে বংশী-ধলেশ্বরী ও তুরাগের প্রশস্ততা

নদী দখলকারীদের দৌরাত্ম্যে সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে সাভারের বংশী-ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদ। বেপরোয়া এই দখলদারদের লোভের থাবা থেকে বাদ পড়ছে না নদীগুলোর সংযোগ খালগুলোও। শুষ্ক মৌসুমে নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন নদীর দুই তীরের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয় নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কেউ আবার নির্মাণ করেছে বসতঘর। বালু ব্যবসায়ীরা নদীতীরের বিভিন্ন স্পটে বালু জমিয়ে নদীর প্রশস্ততা অনেকখানিই কমিয়ে ফেলেছে। আবার বিভিন্ন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে নদীর পানি হয়ে পড়ছে বিষাক্ত। নানা রকম আইনি জটিলতা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতা এবং কখনো কখনো দখলদারদের সঙ্গে তাদের গোপন আঁতাত পুরো পরিস্থিতি করে তুলেছে উদ্বেগজনক। পরিবেশ আন্দোলনের নেতা মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ম হামিদ রনজু কালের কণ্ঠ’র ঢাকা৩৬০ ডিগ্রিকে বলেন, ‘বংশী নদীর কালিয়াকৈর এলাকায় উজানে বাঁধ দিয়ে প্রভাবশালীরা নদীপ্রবাহ বন্ধ করে মাছের খামার গড়ে তুলেছে। নয়ার হাটের কাছে পাথালিয়ায় নদীর তীর ভরাট করে পাকা রাস্তা নির্মাণ এবং এলাসিন-চৌহাট হয়ে আসা বংশী নদী দিন দিন ভরাট হয়ে গেছে। সে কারণে এ নদীতে এখন আর স্রোত নেই। যেটুকু থমকে আছে, তা মূল জায়গায় নেই। একসময় সাভার থানাটি ছিল বংশী নদীর তীর ঘেঁষে। এখন বংশী থানা থেকে আধাকিলোমিটার দূরে। বালু ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু ও শিল্পমালিকদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নদী, খাল, বিল, বাইদ, জলাশয় এখন বিলীনপ্রায়। যেটুকু এখন দৃশ্যমান তা-ও মিল-কলকারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্যের এক বিরাট আধার। দুর্গগন্ধযুক্ত পানি মানুষসহ সব ধরনের জীবের জন্য অনুপযোগীই শুধু নয়, তার গন্ধে দুই কূলের লাখ লাখ মানুষ দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে।

সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন খান নঈম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সাভারে নতুন করে ভিএস জরিপ যখন হয়, তখন আমরা আশা করেছিলাম, সঠিকভাবে জরিপ হচ্ছে কি না তা দেখাশোনার জন্য অন্তত প্রশাসন একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করবে। সরকারি স্বার্থ এবং নদী-নালা, খাল-বিল, পরিবেশদূষণ ও জলাবদ্ধতা রক্ষার্থে যেন সঠিক জরিপটি হয়, সেটাই ছিল এলাকাবাসীর দাবি; কিন্তু প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। তাই নদী দখলও রোধ করা সম্ভব হয়নি। এই ভিএস জরিপটি যখন কার্যকর হয়ে যাবে, তখন আমাদের আরো বেশি বিপদগ্রস্ত হতে হবে এবং সরকার ও বেসরকারি অনেককেই আদালতমুখী হতে হবে। আমাদের একটা অনুরোধ—সাভারকে রক্ষা করতে হলে একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যে উদ্যোগের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করে ভবিষ্যৎ একটি সম্ভাবনাময় সাভার গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, সাভারের জনগণের স্বার্থে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের স্বার্থে জাতীয় উদ্যোগ এবং ভিএসে যা থাকা উচিত নদী-নালা, খাল-বিল, বনায়ন, রাস্তাঘাট যেন সঠিকভাবে দেখানো হয়, সেই উদ্যোগ সরকারকে গ্রহণ করতে হবে।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, বংশী-ধলেশ্বরী নদীর দুই তীরেই অবৈধভাবে নদীর জায়গা দখল করছে প্রভাবশালী মহল। কেউ কেউ নদীর জায়গা দখল করে মিল-কলকারখানাসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নদীতীরে ব্যক্তির বৈধ জায়গায় প্রথমে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। পরবর্তী সময়ে খুব ধীরে ধীরে তারা নদীর দিকে তাদের সীমানা বাড়াতে থাকে। সাভারের হেমায়েতপুরের শহীদ রফিক সেতুর কাছে, পৌর এলাকার ভাগলপুর বালুঘাটে এবং নয়ারহাট ব্রিজের দুই তীরে বালু ব্যবসায়ীরা নদীটিকে ভরাট করেই চলেছে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা যত প্রসার লাভ করছে, নদীর প্রশস্ততা ততই কমে আসছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় সাভার পৌর এলাকার মধ্যেও বংশী নদী ও এর সংযোগ খালগুলোর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে প্রভাবশালী মহল শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

ধামরাইয়ের ফোর্ডনগর এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী জানান, নদী থেকে বালু তুলে নিয়ে চলছে জমজমাট বালু ব্যবসা। বংশী নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার বালুদস্যু-পুলিশ ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তার পরও অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু লুটের মহোৎসব চলছেই।

এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বংশী নদীর ধামরাইয়ের শরীফবাগ, দক্ষিণ দেপাশাই, নওগাঁও, চাপিল, গোয়ালদি, কান্দিকুল, কালামপুর, ভালুম, বাসনা, টোপেরবাড়ি, কুশুরা এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধভাবে বংশী নদীর পাড়ে ড্রেজার বসিয়ে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালুমাটি। এই বালু বংশী-ধলেশ্বরী নদীর বিভিন্ন স্পটে জমা করে বিক্রি করা হয়। এতে একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে আবাদি জমি, খেলার মাঠ, টোপেরবাড়ি সরকারি আবাসন প্রকল্প, কালামপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প, বালিয়া ওদুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, মন্দির, ধানের চাতাল, সোমভাগ মসজিদ, কান্দিকুল, টোপেরবাড়ি মন্দির, শরীফবাগ, নওগাঁও, ভালুম, দেপাশাই, কালামপুর, কুশুরা এলাকার সাতটি সেতু ও পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। এ নদীর ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এলাকাবাসী বালুখেকোদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রায়ই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করলেও তারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সাভার নামাবাজার এলাকায় ব্যবসায়ীরা দিন দিন বংশী নদীকে গ্রাস করে ফেলছে। অনেকে আবার কৌশলে নদীর খাসজমি লিজ নিয়ে এসে শুষ্ক মৌসুমে নদীর জেগে ওঠা চরে পিলার গেড়ে দখল করছে। বংশী নদীর মতো একইভাবে বেপরোয়া দখল হচ্ছে তুরাগ তীর। ভূমিখেকোদের গ্রাসে রাজধানীর সন্নিকটে আমিনবাজারের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে তুরাগ নদ। সরেজমিন দেখা যায়, এ নদীর দুই তীরে আমিনবাজার ও গাবতলী প্রান্ত বালু ও পাথর ব্যবসায়ীরা দখল করে ফেলেছে। এখন তুরাগের শীর্ণ একটি বাঁক শুধু চোখে পড়ে। এ ছাড়া নদীর পাশে শত শত অবৈধ ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মহাজনখানা গড়ে তুলেছে বালু ও পাথর ব্যবসায়ীরা। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব অপকর্ম করে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গাবতলীর আমিনবাজারের ব্রিজের নিচে আড়াই কিলোমিটাির এলাকায় বালু উত্তোলন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে নদী দখল হয়ে গেছে। আমিনবাজারের পাশে নদীর দুই তীরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ নদীপাড়ের সীমানা নির্ধারণ করে দিলেও এ নদী দখলের প্রক্রিয়া কিছুতেই মানছে না প্রভাবশালী মহল। নদী দখলের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসান বলেন, ‘নদী দখলের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’



মন্তব্য