kalerkantho


পরিকল্পিত ঢাকা : বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পরিকল্পিত ঢাকা : বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

নানা ধরনের বৈপরীত্যে ভরা ঢাকা শহর। দেখলে মনেই হবে না, এই শহরে কখনো কোনো পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অথচ দেড় শ বছরের চেয়েও বেশি পুরনো এই নগরের পরিকল্পনার ইতিহাস। তাহলে এ অবস্থা কেন? কিভাবেই বা ঢাকায় বসবাসের এই অনুপযোগী পরিবেশ থেকে পরিত্রাণ মিলবে? আগামীকাল ৮ নভেম্বর বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস। দিবসটি সামনে রেখে এসব প্রশ্নেরই জবাব খোঁজার চেষ্টা করেছেন আবুল হাসান রুবেল

যানজট ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবনে এতটাই দুর্বিষহ প্রভাব ফেলেছে যে ঢাকার সমস্যা নিয়ে আলোচনায় যে কেউ প্রথম যে কথা বলবেন, সেটি হলো যানজট। এ বিষয়ে এত অসংখ্যবার বলা হয়েছে, এত অসংখ্য প্রস্তাব এসেছে যে তার তালিকা করাও একটা বিরাট সময়সাপেক্ষ কাজ। কিন্তু যত পরামর্শই আসুক, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সামান্যই। বরং বেশির ভাগ নগর পরিকল্পনাবিদ উড়াল সেতুর বিপক্ষে থাকলেও হয়েছে উড়াল সেতুই। একের পর এক খাল ভরাট করে আবাসন প্রকল্প হয়েছে এবং এখনো চলছে। সঙ্গে খাল রক্ষার আওয়াজ এমনকি সরকারের পক্ষ থেকেও দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। এ রকম নানা ধরনের বৈপরীত্যে ভরা ঢাকা শহর। দেখলে মনেই হবে না, এই শহরে কখনো কোনো পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অথচ দেড় শ বছরের চেয়েও বেশি পুরনো এই নগরের পরিকল্পনার ইতিহাস। তাহলে এই অবস্থা কেন? সেই প্রশ্নেরই জবাব খোঁজার চেষ্টা করব এই লেখায়।

লোকালয় হিসেবে ঢাকা বেশ প্রাচীন। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকেও এর অবস্থিতি ছিল বলে জানা যায়। পৃথিবীর সব প্রাচীন জনপদের মতো ঢাকাও অতীতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠেছিল। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ কর্তৃক সোনারগাঁয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল দুই শ বছরব্যাপী বাংলার স্বাধীন সুলতানি রাজ্যের। এই সময়কাল থেকেই একটি ছোট্ট শহর হিসেবে ঢাকার অস্তিত্ব ইতিহাসের সূত্রে পাওয়া যায়। সতেরো শতকের শুরুতে ঢাকায় মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠার আগে এ যুগের আকর গ্রন্থ বাহারিস্তান-ই-গায়েবিতে মির্জা নাথান ঢাকার যে অবস্থার বর্ণনা করেছেন তা অনেকটা এমন, শহরটি বুড়িগঙ্গার পূর্ব তীরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তা প্রলম্বিত ছিল বর্তমান বাবুবাজারের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে কয়েক মাইল পর্যন্ত। রাজধানী সোনারগাঁয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় বাণিজ্য অঞ্চল বিস্তার করতে গিয়ে ঢাকার এই অঞ্চলে ক্রমে নাগরিক জীবনের বিকাশ ঘটে। সোনারগাঁ  থেকে ঢাকার নগরায়ণের পথ প্রশস্ত হয় নদীপথে যোগাযোগ থাকায়। প্রাক-মোগল যুগে ঢাকার দক্ষিণ ও পূর্ব সীমা নির্ধারণ করেছে যথাক্রমে বুড়িগঙ্গা ও ধোলাইখাল।

মোগল আমল পর্যন্ত একটা দীর্ঘ সময় ঢাকা কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠেছিল। মোগল আমলে, ১৬০৮ সালে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর মযার্দা পায়। তবে এ সময় কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ছাড়া ঢাকা শহরের সমৃদ্ধি ও সম্প্রসারণে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানা যায় না। ব্রিটিশ আমলে বর্তমান ঢাকা সিটি করপোরেশন ‘ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি’ নামে যাত্রা শুরু করে ১৮৬৪ সালে। এর আগে ১৮২৩ সালে ঢাকার তৎকালীন কালেক্টর ওয়াল্টার সাহেবের অধীনে শহরের দেখভাল করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকার নবাবরা এ সময় ঢাকার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তবে এ সময় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির কাজ ছিল মূলত রক্ষণাবেক্ষণমূলক। ঢাকার জন্য আধুনিক নগর পরিকল্পনা বিষয়ক প্রথম রিপোর্ট প্রণীত হয় ১৯১৭ সালে। বিখ্যাত স্কটিশ বিজ্ঞানী ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডেস প্রণীত এ রিপোর্টে প্লাবনভূমির ওপর অবস্থিত ঢাকা শহরের জন্য একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে এ সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ড জড়িয়ে পড়ায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রচুর অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে ব্রিটিশ রাজ এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর অগ্রসর হয়নি।

এখানে যে উড়াল সেতু ভিত্তিক পরিকল্পনা গড়ে উঠেছে, তা অধিক গাড়ির ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশদূষণের কারণ হবে

পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর, পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার জন্য ১৯৫৯ সালে রাজউকের পূর্বসূরি ডিআইটির তত্ত্বাবধানে প্রথম মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, টাউন ইম্প্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩-এর আওতায় ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি। কী ছিল সেই মাস্টারপ্ল্যানে? মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই মাস্টারপ্ল্যানে যেসব সুপারিশ ছিল, কমবেশি এখনো প্রস্তাব করে যাওয়া হচ্ছে ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে, বাঁচাতে। সেখানে বলা হয়েছিল—

১. পরিকল্পনার সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের উপশহর মিলিয়ে জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখের মতো। ২৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনাকারীরা উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলোতে রাজধানীকেন্দ্রিকতা বিষয়ে সচেতন ছিলেন। বিশেষত আমলাতন্ত্র, শিল্প-কলকারখানা ও মানুষজনের রাজধানীমুখী প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন করে তারা প্রস্তাব দিয়েছিলেন—প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক কারণে অপরিহার্য নয় এমন সব ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানা ও অফিস-আদালত ঢাকার বাইরে স্থাপন করতে হবে।

২. দ্বিতীয় বিষয়টা ছিল জলাভূমি প্রসঙ্গ। তারা বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নগরীর প্রাকৃতিক পয়োনিষ্কাশনরেখার সঙ্গে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খালগুলো যুক্ত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছিল। নগরীর আবাসন ও স্থাপনা পরিকল্পনা যাতে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ক্ষতি না করে, তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

৩. আরেকটি বিষয়ে তারা বিশেষ জোর দিয়েছিল, সেটি হলো—নগরীর খোলা জায়গা রক্ষা। তারা প্রতি এক হাজার লোকের জন্য তিন-চার একর ফাঁকা জায়গার প্রস্তাব করেছিল। এর জন্য বিভিন্ন স্থাপনা ঢাকার আশপাশে সরিয়ে ফেলার নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবও তারা দিয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এই প্ল্যান অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলা হলেও এটা প্রায় ৪০ বছর ধরে থেকেই যায়। ১৯৭৯ সালে মহাপরিকল্পনাটির মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পর ইউএনডিপির অর্থায়নে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান শাংকল্যান্ড কক্স ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’ নামে আরেকটি নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছিল; কিন্তু সে পরিকল্পনা কখনো গৃহীত এবং বাস্তবায়ন হয়নি।

১৯৯৭ সালে সরকার ‘রাজউকের’ (ডিআইটির নাম ১৯৮৭ সালে পরিবর্তন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ‘রাজউক’ রাখা হয়) তত্ত্বাবধানে প্রণীত ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ বা ডিএমডিপি অনুমোদন করে। এই পরিকল্পনার মেয়াদকাল ২০ বছর (১৯৯৫-২০১৫)। প্রায় তিন বছর (১৯৯২-৯৫) সময় ব্যয় করে লেখা এ পরিকল্পনার রিপোর্টগুলো পড়লে প্রথমেই যেটা মনে হয় তা হলো—এতে প্রায় কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা মহানগরীর আবাসনব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ১৯৯২ সালে এই প্রজেক্ট যখন হাতে নেওয়া হয়, তার আগে থেকেই গার্মেন্ট ঢাকার প্রধানতম অর্থনৈতিক শিল্প। দলে দলে গ্রাম থেকে নিম্নবিত্ত গার্মেন্ট শ্রমিকদের যে ঢল ঢাকায় আসছে; তারা কোথায় থাকবে, গার্মেন্টগুলোতে কিভাবে যাবে, গার্মেন্টগুলো কোথায় গড়ে উঠবে—তার কোনো নির্দেশনা এ পরিকল্পনায় পাওয়া যায় না। ফলে আমরা দেখি, ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে বস্তির পর বস্তি, গার্মেন্ট ও নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বর্তমানে রাজউকের মূল ভূমিকা হলো—বিভিন্ন এলাকায় প্লট উন্নয়ন করে সমাজের উচ্চবিত্তদের মাঝে বণ্টন করা—যা এটিকে উচ্চবিত্ত পদলেহনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

১৯৯৩-৯৫ সালে ঢাকার উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর প্রথম দুই ধাপ ছিল পরীক্ষামূলক। এরপর  ২০০০ সালে ডিএমডিপির তৃতীয় ধাপ হিসেবে ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) কাজ শুরু করা হয়। এতে জমি ব্যবহারের মূল পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। রাজউকের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করতে পুরা চার বছর সময় লেগেছে। যেসব জমি ড্যাপে সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে, সেসব জলাশয় ও খোলা জায়গার প্রায় পুরোটাই আবাসন ব্যবসায়ীরা জবরদখল করেছে এই চার বছরে। অনেক ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমতিও ছিল। ২০০৮ সালে ড্যাপ চূড়ান্ত করা হয়।

২০১০ সালে আবাসন ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ সরকারের ভেতরে থাকায় নিজেদের ভাগে তালগাছটা রেখেই দুই হাজার আটের ড্যাপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। কাজেই নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশকর্মীরা এর পরিকল্পনাটি পর্যালোচনার দাবি করেন। ২০০৯ সালে সরকার একটি পর্যালোচনাপরিষদ গঠন করে। কমিটি ড্যাপের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে। এবং সংশোধনের লক্ষ্যে একটি সুপারিশমালা ২৬ মার্চ রাজউকের কাছে জমা দেয়। সংশোধন শেষে সরকার চূড়ান্ত পরিকল্পনাটির প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১০-এর ২২ জুন।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্য পুত্রাজায়ায় প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটা ভালো উদাহরণ হতে পারে

এখন বলা হচ্ছে, এই পুরো পরিকল্পনা ঘরে বসে করা হয়েছিল, যা যথেষ্ট বাস্তবসম্মত নয়। নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। এবার তৈরি হয়েছে নতুন কাঠামোগত পরিকল্পনা এডিবির সহায়তায়। যার মেয়াদকাল ২০১৬-২০৩৫—অর্থাৎ ২০ বছর। এই পরিকল্পনায় ১৬২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। একই ধরনের জলাধার সংরক্ষণ, খোলা জায়গা সংরক্ষণ ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি আছে সেখানেও। নতুন যেটা করা হয়েছে, তা হলো—ঢাকার চারপাশ ঘিরে একটি রিং রোডের পরিকল্পনা এবং প্লটভিত্তিক আবাসনের বদলে অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক আবাসনের পরিকল্পনা। কিন্তু বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আসলে অর্থ কী?

অর্থ কিছুটা বোঝা যাবে গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮-তে বণিক বার্তার এক রিপোর্ট থেকে। যেখানে উল্লেখ রয়েছে, ‘নগর উন্নয়ন মূল কাজ হলেও রাজউকের সেদিকে মনোযোগ কম। সংস্থাটির আবাসন প্রকল্পে লটারির মাধ্যমে ভাগ্যবান কিছু ব্যক্তি প্লট বরাদ্দ পাচ্ছেন। কম মূল্যে বরাদ্দ পাওয়া এসব প্লট তাঁরা বিক্রি করছেন উচ্চমূল্যে। এভাবে উচ্চমূল্যে প্লট বিক্রির মাধ্যমে  কিছু মানুষকে বিত্তবান হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে সংস্থাটি।

ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপনের সাইট থেকে শুরু করে দৈনিক পত্রিকাগুলোয় রাজউকের বরাদ্দপ্রাপ্ত জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায় প্রায়ই। এ ধরনের একাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত জমির উচ্চমূল্যের কারণে তাঁরা জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। জমি ফেলে রাখলে দখলসহ অন্যান্য হয়রানিতে পড়তে হতে পারে। রাজউক পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের লটারিতে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন ঊর্ধ্বতন একজন সরকারি কর্মকর্তা। বরাদ্দ থেকে লিজ দলিল পেতে তিনি ব্যয় করেন ১৫ লাখ টাকার মতো। ১৭ নম্বর সেক্টরের পাঁচ কাঠা প্লটের জমিটি তিনি বছর দুয়েক আগে কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা দরে আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন। আবাসন খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘রাজউক সরকারি দামে জমি বরাদ্দের মাধ্যমে অল্প কয়েকজনকে সুবিধা করে দিচ্ছে। বরাদ্দপ্রাপ্তদের সে জমিতে বসবাসের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। আবার সেখানে আবাসন প্রকল্প তৈরির সংগতি বেশির ভাগেরই থাকে না। ফলে কম মূল্যে জমি বরাদ্দ দিয়ে বরাদ্দপ্রাপ্তদের তা উচ্চমূল্যে বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছে রাজউক।’

ঢাকা বিমানবন্দর এবং মিরপুরের মধ্যস্থিত জলাভূমি একচেটিয়া ভরাট করে নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প বানানো হয়েছে। তুরাগ তীরের জলমগ্ন এই এলাকার কোনো প্রকল্পেই স্থলের সঙ্গে জলের আনুপাতিক হার সমন্বয় করা হয়নি। বলতে গেলে পুকুর আকৃতির কয়েকটি অতি নগণ্য জলাশয় ছাড়া একচেটিয়া ভরাটের আওতায় পড়েছে এলাকাটি।

ঢাকা নগরীর পরিবেশগত প্রধানতম সমস্যাগুলোর একটি হলো এর ভূগর্ভস্থ পানির অতি ব্যবহার। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গভীরে চলে যাওয়া, ঢাকার ভূমির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূমিতে ওয়াটার ফিল্ট্রেশন মাত্রাতিরিক্ত কমা এবং খুব বেশি আরবান রান অফ—অর্থাৎ পর্যাপ্ত জলাশয়ের অভাবে বৃষ্টির পানির গড়িয়ে পড়া এবং ফ্ল্যাশ ফ্লাড। এই সমস্যাগুলোর কোনো একটিও যদি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আমলে নিত, তাহলে একটি শহরের চারপাশে অবস্থিত এত বৃহৎ জলমগ্ন অঞ্চল নির্বিচারে ভরাটে পড়তে পারে না। এখানে যে উড়াল সেতু ভিত্তিক পরিকল্পনা গড়ে উঠেছে, তা অধিক গাড়ির ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশদূষণের কারণ হবে। শুধু তা-ই নয়, ঢাকা শহরের আয়তন ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায়ও এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ফলে এ ধরনের উড়াল সেতু ভিত্তিক পরিকল্পনা আজকালের নগর পরিকল্পকরা বাতিল করে দিচ্ছেন। কিন্তু লোক দেখানো উন্নয়নে আমরা সেধে ঝামেলা ঘাড়ে ডেকে আনছি।

মানুষ ঢাকায় আসে কাজের জন্য, শিক্ষার জন্য, বাণিজ্যের জন্য, চিকিৎসার জন্য এবং আরো নানাবিধ প্রয়োজনে। প্রশাসনের কারণে আমাদের অর্থনীতি, বাণিজ্যও ঢাকাকেন্দ্রিক। আমরা গার্মেন্টগুলো তৈরি করতে দিয়েছি ঢাকায়। গ্রাম থেকে নদীভাঙা মানুষ তাই সেখানে কাজ করতে আসে, শহরে বস্তি গড়ে ওঠে। দেশের সব সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমরা ঢাকায় তৈরি করে রেখেছি। আমাদের সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঢাকাকেন্দ্রিক। আমাদের রাজনীতি ঢাকাকেন্দ্রিক। মোট কথা নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবে বাংলাদেশের সব কিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গড়ে উঠেছে এবং দ্বিতীয় কোনো শহর ঢাকার কাছাকাছি দাঁড়াতে পারেনি। নগর পরিকল্পনার পরিভাষায়—একটি দেশে এককভাবে নানাবিধ কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠা একটি শহর, যার ওপর পুরো দেশ নির্ভরশীল থাকে; ঢাকার মতো এ ধরনের শহরগুলোকে বলা হয় প্রাইমেট সিটি। কোনো দেশে প্রাইমেট শহরের অস্তিত্ব মূলত দেশটিতে উন্নয়নের অসাম্যই নির্দেশ করে এবং আমাদের মতো জনসংখ্যাবহুল উন্নয়নশীল দেশে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাইমেট শহর সাধারণত বিপর্যয় ডেকে আনে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কী করতে হবে, তা মোটামুটি আমরা সবাই জানি। যত দ্রুত সম্ভব দেশের অন্য শহরগুলোতে উন্নয়ন ঘটিয়ে ঢাকার ওপর থেকে নির্ভরশীলতা অন্য শহরগুলোতে স্থানান্তর করতে হবে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যেটি সহজেই করা যায় তা হলো প্রশাসনকে রাজধানী থেকে সরিয়ে নেওয়া। কিছুদিন আগে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্য পুত্রাজায়ায় প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটা একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে, যেখানে ঢাকার অবস্থা কুয়ালালামপুরের চেয়ে অনেক শোচনীয়। কিন্তু এগুলো আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ যদি দস্যুদের হাতে থাকে, তাহলে বড় কোনো পরিবর্তন আশা করা বৃথা।



মন্তব্য