kalerkantho


‘এসটিএস’-এর দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ পুরান ঢাকাবাসী

জাহিদ সাদেক   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘এসটিএস’-এর দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ পুরান ঢাকাবাসী

এভাবেই সব সময় গেট খোলা থাকে এসটিএসগুলোর, যে কারণে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে (ডানে) এসটিএসের বাইরেও পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা, সরানো হয়নি কয়েক দিনের বর্জ্য

চারদিকে বর্জ্যের গন্ধ। মানুষজনও নাকে হাত দিয়ে এক প্রকার দৌড়ে পার হচ্ছে এসব স্থান। গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে কয়েক শ ফুট থেকে শত মিটার পর্যন্ত। এমন চিত্রই এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কিছু ‘সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে’ যা ‘এসটিএস’ নামেই পরিচিত। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য সংরক্ষণে রাস্তার মোড় কিংবা উড়াল সেতুর নিচে এসব নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম দিকে এসটিএসের সুফল পাওয়া গেলেও দিন দিন আশপাশে উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হচ্ছে মানুষজন, বিশেষ করে পুরান ঢাকায় যেসব এসটিএস নির্মাণ করা হয়েছে এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় অতিষ্ঠ হচ্ছে এর আশপাশের বাসিন্দাসহ পথচারীরা। 

পুরান ঢাকার কয়েকটি এসটিএসে সরেজমিনে দেখা যায়, এর বাইরেও পরে আছে ময়লা-আবর্জনা, সরানো হয়নি কয়েক দিনের বর্জ্য। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে কয়েক শ ফুট দূর পর্যন্ত। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে রাজধানী সুপার মার্কেট, কাপ্তানবাজার ও মুরগিপট্টি পর্যন্ত এক কিলোমিটারে সিটি করপোরেশনের ময়লার তিনটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। যে কারণে পচা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে এ সড়কটি দিয়ে চলাচল করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেখা যায়, বঙ্গভবনের দক্ষিণ পাশে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়সহ মুরগি, ছাগল, কবুতর ও কাঁচাবাজার থাকার কারণে এর দুর্গন্ধ দখিনা হাওয়ায় মিশে বঙ্গভবনে যাচ্ছে। ময়লার দুর্গন্ধে বঙ্গভবনেও টেকা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত বর্জ্য প্রধান কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। বৈঠকের ব্যাপারে ডিএসসিসির অতিরিক্ত বর্জ্য প্রধান এ কর্মকর্তা বলেন, ‘বঙ্গভবনের পাশে ময়লার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন রয়েছে, সেখানে মুরগিপট্টির যত ময়লা-আবর্জনা রয়েছে সেগুলো রাখা হয়। এ জন্য যখন দখিনা বাতাস বয়, তখন এর দুর্গন্ধ বঙ্গভবন পর্যন্ত পৌঁছায়। সে জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে, ওই এসটিএস তাড়াতাড়ি সরিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মুরগিপট্টি, কবুতর ও ছাগলের বাজারে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকান ও ফ্লাইওভারের আশপাশের দোকানগুলো উচ্ছেদ করা হবে।’ তবে দেখা যায়, এসব স্থানে সেগুলো এখনো বহাল তবিয়তে আছে।

শ্রাবণ পরিবহন থেকে গুলিস্তানের পকেট গেটে নেমে হায়দার মিয়া বলেন, ‘লাখ লাখ বাসযাত্রী প্রতিনিয়ত ফ্লাইওভার দিয়ে এসে গুলিস্তানের পকেট গেটে নামা মাত্রই বাতাসের সঙ্গে নাকে ভেসে আসে দুর্গন্ধ। কর্তৃপক্ষ এদিকে নজর না দিলে বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে।’ তবে মুরগিপট্টির ব্যবসায়ী রকিব উদ্দিনের মতে, ‘দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আমি এখানে ব্যবসা করি। ইচ্ছা করলেই হাঁস-মুরগির ব্যবসা যেখানে-সেখানে করা যাবে না, তবু চলছে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঠিকমতো পরিষ্কার করলে এমন দুর্গন্ধ ছড়াতো না। তাদের গাফিলতির জন্যই এসব ঘটছে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে বিভিন্ন ওয়ার্ডে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে এসব এসটিএস প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৫৭টি এসটিএস নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি; কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি এসটিএস নির্মাণ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। আবার সব কয়টি চালু হয়নি বিভিন্ন জটিলতায়। এদিকে পুরান ঢাকা ও এর আশপাশ ঘুরে দেখা যায় যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার সংলগ্ন, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে, পুরান ঢাকার আনন্দবাজার, জুরাইন কবরস্থান, হাজারীবাগ, হাজারীবাগের আকাশ অটো মোটর ওয়ার্কশপ, আজিমপুর সরকারি কলোনি, ঢাবির ফিজিক্যাল মাঠের দক্ষিণ পাশের গ্যারেজসংলগ্ন খালি জায়গা, ওসমানী উদ্যানের খালি জায়গা, ধলপুর স্টাফ কোয়ার্টারসংলগ্ন এলাকায় এখনো ময়লার কনটেইনার সরানো হয়নি।

নবাবগঞ্জ পার্কের পাশে সাবের মাহমুদ নামের এক এলাকাবাসী বলেন, ‘আগে মনে করতাম এসটিএস হলে দুর্গন্ধ কমে যাবে; কারণ এসটিএসের দেয়ালের উচ্চতা ৪৫ ফুটের বেশি হওয়ায় গন্ধ অনেক ওপরে চলে যাবে, কিন্তু এখন সে ভুল ভেঙে গেছে। এতে এলাকাবাসীর ও পথচারীর প্রচণ্ড সমস্যা হচ্ছে।’

এসটিএস থেকে গন্ধ নির্গত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) যুগ্ম মহাসচিব প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘এসটিএস নির্মাণের ফলে রাস্তায় ময়লার দৃশ্য না থাকলেও দুর্গন্ধ থেকে নিস্তার মিলছে না। কারণ জায়গার অভাবে নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় রাস্তার ওপরেই গড়ে তোলা হয়েছে আবর্জনা ট্রান্সফার স্টেশন। ফলে যান চলাচলে যেমন বিঘ্ন ঘটছে, তেমনি দুর্গন্ধে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। তা ছাড়া রাস্তাজুড়ে আবর্জনার এসব ট্রান্সফার স্টেশনের ফলে যানজট লেগে থাকার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে রাস্তার সৌন্দর্য। কোথাও কোথাও আবর্জনায় রাস্তা পুরোপুরি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।’

ডিএসসিসির সূত্রে জানা যায়, মূলত জনবহুল ঢাকার পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে ১৯৯৪ সাল থেকে রাস্তার ওপর এসব কনটেইনারে ময়লা রাখার পদ্ধতি চালু হয়। দীর্ঘ ২৩ বছর পর তা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এসটিএস নির্মাণের মাধ্যমে; কিন্তু নির্মাণের বছর দুয়ের মধ্যেই এর নেতিবাচক দিকগুলো স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে। ডিএসসিসির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ এ নগরীতে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ডিএসসিসিতে উৎপন্ন হয় তিন হাজার ২০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার টন, যা থেকে মাত্র দুই হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। বাসাবাড়ি থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে এসটিএসে রাখা হয়; কিন্তু নগরীর এসটিএসগুলো পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় বেশির ভাগ বর্জ্যই বিভিন্ন মাধ্যম হয়ে নগরীর অলিগলি, ড্রেন, ডোবাসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান এয়ার কমোডর শফিকুল মো. আলম বলেন, ‘আমরাও স্বীকার করছি, এতে জনগণের অনেক সমস্যা হচ্ছে; কিন্তু জায়গার অভাবে ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশেই ট্রান্সফার স্টেশনের কাজ সারতে হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজউকের কাছে আমরা প্রস্তাব করেছি, শহরের নতুন পরিকল্পনার সময় যেন ট্রান্সফার স্টেশন কিংবা আবর্জনার জন্য জায়গা রাখা হয়। তা ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের গাফিলাতির বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।’

 

নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় রাস্তার ওপরেই গড়ে তোলা হয়েছে আবর্জনা ট্রান্সফার স্টেশন। ফলে বাড়ছে জ্যাম, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ

 



মন্তব্য