kalerkantho


ঢাকার জীবন তো এক জ্যামেই থমকে থাকে

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকার জীবন তো এক জ্যামেই থমকে থাকে

জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে আসেন ঢাকায়। মগবাজার থেকে তিনি এখন বনানীর বাসিন্দা। ঢাকার যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

 

নুসরাত ইমরোজ তিশার জন্ম রাজশাহীতে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে চলে আসেন ঢাকায়। শোবিজ অঙ্গনে তাঁর শুরুটা ছিল ১৯৯৫ সালে। নতুন কুঁড়িতে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হন। গান থেকে নাচ, অভিনয় সব শাখায়ই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। মডেলিংয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর শুরু করেন নাটক, তারপর সিনেমা। ঢাকার যাপিত জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে মগবাজারে। পড়াশোনা করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। শৈশবের গল্প বলতে সেই রিকশার আধিপত্য। ক্রমেই বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা, জনসংখ্যা। সেই সঙ্গে জ্যামটাও সবে মাত্রাতিরিক্তের দিকে যাচ্ছে। বাড়ছে উঁচু দালানকোঠাও। আর এসবের মধ্যে তিশাও হয়ে উঠছেন তারকা। শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা জানতে চাইলে তিশা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তবে আমি বরাবরই বেশ ঘরকুনো। আমি যে ঢাকায় খুব বেশি ঘোরাঘুরি করেছি ব্যাপারটা এমন নয়। আমি খুব শান্তশিষ্ট ছিলাম। বাসায় থাকতাম। স্কুল-কলেজের দিনগুলোতে তেমন হৈ-হুল্লোড় করে কাটাইনি, তেমনটা আমার ভালোও লাগত না। কিছু বান্ধবী ছিল, ওদের সঙ্গেও খুব বেশি কথা হতো না। আবার বাসায় এসে পড়াশোনা করতাম, না হয় কোনো কাজ থাকলে চলে যেতাম। আমার ব্যস্ততা শুরু হয় মোটামুটি ২০০৩ সালের পর। তখন থেকে মিডিয়ায় নিয়মিত। এখন তো শুটিং ও ক্যামেরার ঘেরাটোপে জড়ানো জীবন। যখন অভিনয় ব্যস্ততা শুরু হলো, তখন থেকে বলতে পারেন আমি বন্দি কারাগারে! তারকা হওয়ায় সাধারণের সঙ্গে মিশে সব কিছু করাও সম্ভব হয় না। এমনও হয় ২৪ ঘণ্টায় আমি সাধারণত তিন-চার ঘণ্টা ঘুমের সময় পাই। আমি যেমন ব্যস্ত, আমার চারপাশের মানুষও তেমন ব্যস্ত। আর তুলনামূলক ঢাকার মানুষ একটু বেশিই ব্যস্ত। দিনকে দিন ঢাকার জীবন একটা মেশিনে পরিণত হচ্ছে।’

বর্তমান তিশা-মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দম্পতির বাসা বনানী। তিশার মায়ের বাসাও কাছাকাছি। ২০০৪ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই নাকি মানসিকভাবে অনেক বড় হয়ে উঠেছেন একসময়ের শিশুশিল্পী তিশা। নিজের সংসার ও মাকে দেখতে হয় তাঁর। তাই নিজের বাসার চেয়ে মায়ের বাসায় কোনো অংশে কম সময় দেওয়া হয় না। নিজের গল্প বলতে গিয়ে ঢাকার গল্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। তাই প্রশ্ন করা হলো ঢাকার পরিবর্তনগুলো কিভাবে দেখছেন? ‘এই তো ফ্লাইওভার বেড়ে গেছে। তবু ঢাকার জ্যাম কমছে না; বরং দিনকে দিন জ্যাম বেড়েই চলেছে। ঢাকার জীবন তো এক জ্যামেই থমকে থাকে! যারা বাসা থেকে বের হয়। তারা সবচেয়ে ভয় পায় জ্যামকে। আরেকটা পরিবর্তন বেশ লক্ষণীয়, সেটা হলো আমাদের সামাজিক বন্ধনের পরিবর্তন। ক্রমেই আমাদের পরিবারগুলো নিউক্লিয়াস পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। একান্নবর্তী পরিবার এখন ইতিহাসের কথা। সমাজ, পরিবার থেকে আমাদের দূরত্ব বাড়ছে। এখন রেস্টুরেন্ট কালচার। আগে যে যতই ব্যস্ত থাকুক, দিন শেষে অন্তত খাবার টেবিলে এক হতো। সে সময়টাও এখন রেস্টুরেন্ট কালচার দখল করে নিয়েছে।’

এই রেস্টুরেন্ট কালচারের সঙ্গে কতটা জড়িত? ‘‘আমার তো মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হয়ই। কিন্তু আমার বর সরয়ার আবার অন্য টাইপের মানুষ। যেমন—আমি যদি বলি চলো আজ রেস্টুরেন্টে যাই। প্রথমে খুব উৎসাহ নিয়ে বলবে ‘চলো চলো’। কিছুক্ষণ পর বলবে ‘আচ্ছা খাবারগুলো বাসায় অর্ডার করা যায় না? বা গিয়ে খাবার বাসায় নিয়ে আসি। সিনেমা দেখলাম আর খেলাম।’ প্রায় সময়ই তার আবদার রাখতে হয়।’’ ঢাকার পজিটিভ দিক যে তাঁর চোখে পড়ে না তেমনটা নয়। তিনি বলেন, ‘আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনার ক্যারিয়ার কেমন চলছে। সেখানে আমি বলতে পারব ভালো। কারণ ক্যারিয়ারে এখনো আমার পছন্দসই ক্যারেক্টার পাচ্ছি; কিন্তু ঢাকাকে নিয়ে সেই স্যাটিসফাইডের জায়গায় নেই। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই তার জীবন গড়ে তুলছে এই ঢাকাকেন্দ্রিক। জীবিকার টানে, আধুনিক বেশ-ভুষার মোহ ছাড়াও নানা রকম ব্যক্তিগত কারণে মানুষ ঢাকা শহরে আসছে। ক্রমেই ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে। আমাদের এই প্রিয় ঢাকা শহরের নাম উঠে গেছে বাসের অযোগ্য শহরের তালিকায়। এর প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজটসহ আরো নানা ধরনের সমস্যা। আমি যেমন বুঝি—কী করলে আমার অভিনয় আরেকটু ভালো করতে পারব, কর্তাব্যক্তিরাও তেমনটা বোঝেন। আমার বিশ্বাস তাঁরাও আমার মতো চিন্তিত। একটা সময় হয়তো আমাদের ঢাকা শহরও হতে পারবে সেই সব উন্নত শহরের একটি।’



মন্তব্য