kalerkantho

তবু হর্ন বাজছেই!

রাতিব রিয়ান   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তবু হর্ন বাজছেই!

রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের হর্ন উচ্চ শব্দ তৈরি করে। হর্নে বিরক্তি প্রকাশ করে ঢাকার শাহবাগের ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তা পার হচ্ছি, দেখা গেল হঠাৎ গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। সারা দিন শব্দের মধ্যেই থাকি। এভাবে যদি হর্ন বেজে ওঠে, তখন মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাব।’ এভাবে ঢাকার যেখানে-সেখানে হর্ন বাজানোর বিষয়ে বলছিলেন ভুক্তভোগী ওই যাত্রী। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ—ঢাকার বেশির ভাগ যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হয়। যদিও আইনে হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ। যথাযথ তদারকির অভাবে হর্ন বাজানোর বিষয়টি কমানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।

নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে যেখানে-সেখানে যানবাহনের হর্ন বাজানোর ওপর বিধি-নিষেধ জানিয়ে এ মাস থেকে লিফলেট প্রচারভভিযান শুরু করেছে রাজধানীর ঢাকার পুলিশ। ৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগে সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশের কয়েকজন সদস্য সচেতনতামূলক প্রচারের জন্য লিফলেট বিলি করছেন। ওই লিফলেটে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া হর্ন বাজানোর বদভ্যাস ত্যাগ করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে হর্ন বাজানো যাবে না। হাসপাতাল কিংবা আবাসিক এলাকা, আদালত এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না; এমনকি রাতেও হর্ন না বাজানোর জন্য বলা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া লিফলেট হাতে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী রেদোয়ান আহমেদ বলেন, ‘এ উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু চালকদের মধ্যে সচেতনতা না থাকায় অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। যে যখন পারে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে হর্ন বাজায়। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।’ যেখানে-সেখানে হর্ন বাজানোর বিষয়টি বিরক্তিকর বলেও জানালেন পল্টনের বেসরকারি এক অফিসে চাকরিরত মোজাম্মেল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পথে যদি ট্রাফিক জ্যাম থাকে, ওই সময়ও হর্ন বাজে। অনেক সময় চালকরা ইচ্ছা করেই হর্ন বাজিয়ে পরিবেশ গরম করে।’

ঢাকায় চলা মোটরসাইকেলগুলো কারণে-অকারণে হর্ন বাজায় বলে অভিযোগ তাঁর। যদিও গত বছরের ২৩ আগস্ট হাইকোর্ট যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ২৭ আগস্টের পর কোনো যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো হলে গাড়িসহ তা জব্দের নির্দেশ দেন; কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছে না কেউ। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেখানে-সেখানে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার ঘটছেই। হাইকোর্ট তাঁর রায়ে বলেন, ঢাকার আবাসিক ও ভিআইপি এলাকায় রাত ১০টার পর সব ধরনের যানবাহনের হর্ন বাজানো এবং ২০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। সেই সঙ্গে স্কুল-কলেজ, হাসপাতালের পাশ দিয়ে চলার সময় হর্ন বাজানোও নিষিদ্ধ করেন আদালত।

মোটরযান আইন ১৯৮৮-এর ১৩৮ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি কিংবা মোটরগাড়ির মালিক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি মোটরযানে এমন ধরনের হর্ন বা শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র সংযোজন বা ব্যবহার করেন, যা সংশ্লিষ্ট এলাকায় যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষ এ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ করেছে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অনুরূপ হর্ন বা যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করেন, তবে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। রাজধানীর পথঘাটে যেখানে-সেখানে হর্ন বাজানোর বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সড়কের যেখানে-সেখানে হর্ন ব্যবহার করা যাবে না। এই সামাজিক আন্দোলন নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যথাযথ আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক সচেতনতা না থাকায় হর্ন বাজানোর প্রবণতা চলছেই। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরও সচেতন হতে হবে।’ পরিসংখ্যান বলছে, সাধারণভাবে মানমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডেসিবল। তার চেয়ে বেশি মাত্রার শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি লোপ, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টিসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে। আর হাইড্রোলিক হর্ন ১০০ ডেসিবলের বেশি মাত্রার শব্দ সৃষ্টি করে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘পথেঘাটে যেখানে-সেখানে হর্নের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, বিষয়টি সবাইকে বোঝাতে হবে, বিশেষ করে যানবাহনের মালিক ও চালকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হবে না।’ এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের উত্তর বিভাগের ডিসি প্রবীর রায় বলেন, ‘গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ। ভেঁপু ব্যবহার করলে এক শ টাকা জরিমানা।’ কিন্তু ট্রাফিক সার্জেন্ট বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে শব্দের মাত্রা পরিমাপের কোনো যন্ত্র না থাকায় তারা এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় যানজট থাকলে কোন গাড়ি থেকে হর্ন বাজানোর শব্দ আসে তা বোঝা মুশকিল। অনেক সময় হর্নের শব্দ দূর থেকে আসে। ফলে আমরা বুঝতে পারি না কোন গাড়ি থেকে অকারণে হর্ন বাজানো হয়। ফলে দায়ী চালকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনেক সময় নেওয়া সম্ভব হয় না। সবচেয়ে জরুরি সামাজিক সচেতনতা। সামাজিকভাবে যে যত সচেতন হবে, পরিস্থিতি তত উন্নত হবে।’

 

 



মন্তব্য