kalerkantho


লক্ষ্মীবাজারের ফুটপাত হকারদের দখলে

ভোগান্তিতে পথচারী

জাহিদ সাদেক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভোগান্তিতে পথচারী

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার। ফুটপাতে হাঁটার জায়গা তো নেই-ই; বরং মূল রাস্তার অর্ধেক চলে গেছে জুস বিক্রেতা, চুড়ি-ফিতা আর থ্রিপিস বিক্রেতাদের দখলে। ফলে ফুটপাতে পা ফেলার জো নেই। এতে একদিকে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার, অন্যদিকে যানজটে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ পথচারীরা।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, লক্ষ্মীবাজার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সামনে থেকে সরকারি মুসলিম স্কুলের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিভিন্ন রকমের পসরা নিয়ে ফুটপাত ও ফুটপাতসংলগ্ন রাস্তার অংশ দখল করে বসেছেন হকাররা। কাঁচাবাজার মার্কেটের সামনের হকাররা বাচ্চাদের পোশাক আর বার্মিজ স্যান্ডেল বিক্রি করছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে হকারদের দোকান। চলে বিকেল থেকে রাত অবধি। ফলে ফুটপাতের জন্য বরাদ্দ জায়গা হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পথ চলতে হয় সাধারণ পথচারীদের। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৫টির বেশি বিখ্যাত সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার আর পাশেই কোর্ট-কাছারি এই লক্ষ্মীবাজারকে ঘিরেই। এতে পুরান ঢাকার অন্যান্য এলাকা থেকে এখানে একটু মানুষের চলাচল বেশি। কিন্তু এ চলাচলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাদ সাধে এখানকার তিন শর অধিক হকার।

দেখা যায়, হকারদের কারণে ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন কর্মব্যস্ত মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী ও শিশুরা। চলতে গেলেই সব সময় বিপাকে পড়তে হয় তাঁদের। লক্ষ্মীবাজার ঘিরেই রয়েছে বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে রয়েছে সরকারি কবি কাজী নজরুল কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মহানগর মহিলা কলেজ, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুল, ভিক্টোরিয়া ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের জন্য এ এলাকা সব সময় থাকে লোকারণ্য। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হকারদের ফুটপাত আর রাস্তা দখল করে ব্যবসার উৎপাত। তাই মূল সড়কেই ঝুঁকি নিয়ে পথ চলছে বেশির ভাগ মানুষ। এতে ঘটছে দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে বাড়ছে অস্থিরতা ও অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা।

ভোগান্তির শিকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী ফারহানা বলেন, ‘সকালে ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় এই ফুটপাত দিয়ে যেতে পারি না। এতে ঝুঁকি নিয়েই মূল রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। কিছু কিছু সময় মূল রাস্তায়ও হকারের কারণে হাঁটা যায় না। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে। আর একজন মেয়ের জন্য এটা অনেক বেশি সমস্যার হয়ে যায়।’ কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী রেজাউল করিম জানান, ‘হকাররা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মহিলাদের পণ্য বিক্রি করে থাকে। এতে দোকানগুলোতে মহিলাদের ভিড় বেশি থাকে। ফলে ফুটপাত ধরে ছেলে মানুষের যাওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়ে। আবার মূল রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চলাচলের কারণেও ঝুঁকি নিয়েই পথ চলতে হয়।’ সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলের একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘আমার মেয়েকে যখন স্কুলে নিয়ে আসি, তখন এই এলাকাটি একেবারে লোকারণ্য থাকে। হকারদের হাঁকডাক আর তার পসরা দেখার জন্য বেশি ভিড় করে মহিলারা। তাদের অনেকেই এই স্কুল বা পাশের স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। তারা একটু সচেতন হলেও বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।’ তবে ভিন্ন কথা বললেন পাশে থাকা আরেক অভিভাবক মোমেনা বেগম। তিনি বলেন, ‘দেখার জিনিস আছে, তাই মহিলারা দেখেন। যদি প্রশাসন তাদের উঠিয়ে দেয়, তাহলেই আর এ সমস্যা থাকে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মার্কেটের সামনের দোকানিরাই এসব হকারের কাছ থেকে টাকা নেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লাইনম্যানও টাকা তুলে দেন। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁদের দেওয়া চাঁদার টাকা স্থানীয় নেতারা নেন। পুলিশকেও আলাদাভাবে দিতে হয়। ডিআইটি মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের মার্কেটে ঢোকার গলিতে হকারদের দোকান। এতে অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও ভেতরে আসেন না। স্থানীয় কাউন্সিলরকে একাধিকবার জানিয়েও কোনো ফল হয়নি।’

লক্ষ্মীবাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখানে যারা হকার আছে, তারা স্থানীয় ছোটন কাউন্সিলরের (আরিফ হোসেন ছোটন) মাধ্যমে ব্যবসা করে। একজনের কাছ থেকে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। একাধিকবার পুলিশ তাদের উচ্ছেদ করলেও কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার তারা বসে পড়ে। তাদের কারণে আমাদের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের অনেক সমস্যা হয়।’

হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ফুটপাতে বসার কোনো অনুমতি নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হকার বলেন, ‘আমরা পুলিশকে টাকা দিয়ে ব্যবসা করি। টাকা না দিলে পুলিশ অভিযান চালায়। তখন কোনো রকমে দৌড়ে পালাই। এ ছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অনুমতি নিয়ে হকাররা ফুটপাতে বসে। প্রতিদিন নির্ধারিত হারে চাঁদা দিতে হয়। নয়তো বসতেই দেয় না তারা।’

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফ হোসেন ছোটনের সঙ্গে। তাঁর নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমার নামে কেউ চাঁদাবাজি করে কি না আমি জানি না। জানলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তা ছাড়া হকার উচ্ছেদে আমরা বারবার পদক্ষেপ নিয়েছি। বারবার অভিযান হয়েছে। তার পরও ফুটপাত দখল হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক কিছু করা হয়ে ওঠে না।’ এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী খান মোহাম্মাদ বিলাল বলেন, ‘মানুষের চলাচলে যেন বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রয়েছে আমাদের। আমরা আগেও হকার উচ্ছেদ করেছি। অভিযোগ পেয়েছি, এখন আবারও করব।’

 



মন্তব্য