kalerkantho


বাড়ি তো নয় পাখির বাসা

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বাড়ি তো নয় পাখির বাসা

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে সিনেমায় অভিনয়। পুরান ঢাকায় যেমন শৈশব কাটিয়েছেন, তেমনি অনেক দিন ধরে আছেন রাজধানীর গুলশানে। এই ব্যস্ত শহরের যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

 

মনের মতো করে সাজিয়েছেন গুলশানের নিজের ফ্ল্যাটটি। বাসার মধ্যে যেমন রয়েছে আভিজাত্য, তেমনি রয়েছে সবুজের ছোঁয়া। ফ্ল্যাটের যেখানেই এক চিলতে বারান্দা বা কার্নিস আছে, সেখানেই রয়েছে সবুজের সমারোহ। বাগানে শুধু নানা প্রজাতির ফুলের গাছই নয়, রয়েছে ছোট্ট কৃত্রিম ঝরনাও। রয়েছে একটি ছোট্ট বাঁশের ঝাড়! তিনি বলেন, ‘যখন চাঁদ ওঠে। তখন বাঁশ বাগানের মাথার ওপর থেকে না দেখলে ঠিক ভালো লাগে না। গাছগাছালি আমার খুবই প্রিয়। আমার বাবারও এমন শখ ছিল। মনে হয়, সেখান থেকেই এই শখটা আমি পেয়েছি।’

বাসার মধ্যের ছোট্ট একটি ফোয়ারায় করেন নানা প্রজাতির বিদেশি মাছের চাষ। বাসায় ঢুকতেই হেসে অভ্যর্থনা জানায় ‘ময়না’। এই অভ্যর্থনাকারী কোনো মানুষ নয়—পাখি, ময়না পাখি। ববিতার হাসি নকল করতে পারে ময়নাটা। সেই হাসি হেসেই অভ্যর্থনা জানায় আগত অতিথিকে। ববিতার সঙ্গে সমানে কথা বলে। শিস দেয়। ময়নাটা বলতে থাকবে অনিক (ববিতার ছেলে) কানাডায়। ববিতা বাসায়, একা মানুষ, একমাত্র ছেলে অনিক থাকেন কানাডায়। শুধু ময়না নয়, বাসায় আছে ঘুঘুও। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি তো নয়, পাখির বাসা। গাছগাছালির পাশাপাশি আমার পাখি পুষতেও খুব ভালো লাগে। গুলশান লেকটি আমার বারান্দা থেকেই দেখা যায়। শীতের দিনে আমার বেশির ভাগ সময়ই কাটে বারান্দায়।’ এমন গাছগাছালি আর পাখিপ্রেমের কারণ কী? শুধুই কি একাকিত্ব? এমন প্রশ্নের জবাবে ববিতা বলেন, ‘ওই যে বললাম বাবার শখ ছিল, যেটা আমাকেও ছোটবেলা থেকে পেয়ে বসেছে। আর আমার বেড়ে ওঠার ঢাকা ছিল শান্ত নিরিবিলি সবুজে ঘেরা। আমরা থাকতাম পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া এলাকায়। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে শিউলি ফুল কুড়াতে যেতাম। তারপর ফুলের মালা নিয়ে স্কুলে যেতাম। কখনো আবার বাসায় বোনদের মালা বানিয়ে দিতাম। গেণ্ডারিয়ার দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে।’

ববিতার শৈশব ও কৈশোরের প্রথমার্ধ কেটেছে যশোর শহরে। বড় বোন কোহিনূর আক্তার (সুচন্দা) চলচ্চিত্রে প্রবেশের সূত্রে পরিবারসহ চলে আসেন ঢাকায়। গেণ্ডারিয়ার বাড়িতে শুরু হয় কৈশোরের অবশিষ্টাংশ। এখানে তিনি গ্লোরিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনিও সিনেমায় নাম লেখান। বড় বোন সুচন্দা অভিনীত জহির রায়হানের ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে ববিতার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে। জহির রায়হানের ‘জলতে সুরজ কে নিচে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়েই তাঁর নাম ‘ববিতা’ হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন প্রথম নায়িকা চরিত্রে। সেই সময়ের ঢাকার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৯৭০ থেকেই দেশের অবস্থা যখন উত্তাল হতে লাগল, তখন যাতায়াতের পথে অনেক কিছু চোখে পড়ত। ওসব দেখে কিছু একটা টের পেতাম। স্বাধীনতাযুদ্ধ তো ঢাকাকে তছনছ করে দিয়েছে। আমার দুলাভাই জহির রায়হানকে হারিয়েছি।’

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ঢাকা কেমন ছিল? ‘ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মানুষের কঙ্কাল। দেয়ালে দেয়ালে নানা আঁকিবুঁকি, লেখা। নানা আকুতি। এরই মধ্যে শুটিং করা, একটা মানসিক ধকলের মধ্যে থাকতে হতো। সেই ধকল সামলে নিয়েই শুটিং করতে যেতাম। এমনও হয়েছে, শট শেষ, আমি হু হু করে কেঁদে চলেছি। অনেকক্ষণ পরে হয়তো পরিচালক এসে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে থামিয়েছেন। আমার চরিত্রে কান্নার দৃশ্যে শুটিং করতে কোনো গ্লিসারিন লাগেনি। মাঝেমধ্যে শট দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। তখন মাথায় পানি ঢেলে জ্ঞান ফেরাতে হতো।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কেমন লাগে? ‘বয়স যত বাড়ছে, আমি চাচ্ছি যেন সেই শৈশবে ফিরে যেতে পারি। ঢাকা উন্নত হচ্ছে। উন্নত হওয়া আর সবুজকে গলা টিপে মারা তো এক কথা নয়। মানুষ মারা যেমন অপরাধ, তেমনি গাছগাছালি কেটে ফেলাও অপরাধ। এখন তো পুরনো বাড়ি দেখাই যায় না। ৩০ বছর আগে হয়তো অনেক জায়গায় শত বছরের বাড়িঘর দেখা যেত। ক্রমেই তা কমছে। একেবারে নতুন একটা ঢাকা তৈরি হচ্ছে। একদিন আমরাও চলে যাব। ঢাকা হবে আরো নতুন। তবে সে ঢাকা যেন একটি নাগরিকবান্ধব ঢাকা হয়, সেটুকুই চাওয়া।’

 



মন্তব্য