kalerkantho


ভাগাড়ে পরিণত শুভাঢ্যার বিভিন্ন খাল

রাতিব রিয়ান   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভাগাড়ে পরিণত শুভাঢ্যার বিভিন্ন খাল

সরেজমিন কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা খাল এলাকা। এক সময়ের খরস্রোতা এই খালটি এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। আগের মতো ভরাট পানির জোয়ার নেই তার। মৃতপ্রায় এই খালটি ভরে যাচ্ছে ময়লা-আবর্জনায়। শুভাঢ্যা, কালীগঞ্জ, খেজুরবাগ, পাড়গ্লোরিয়া ও চর মীরেরবাগ এলাকার খালগুলোও বানানো হয়েছে ময়লার ভাগাড়।

শুভাঢ্যার অধিবাসীরা বলছেন, এই এলাকাটি তুলনামূলক ঘনবসতিপূর্ণ। কিন্তু ময়লা-আবর্জনা সরানোর মতো কেন্দ্রীয় কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে যে যার মতো যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলতে বাধ্য হয়। শুভাঢ্যা ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এটি ঢাকার নিকটবর্তী একটি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে মোট গ্রাম রয়েছে ৪০টি। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই ইউনিয়নের মোট এলাকা প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ওয়ার্ডগুলো হলো ১ নম্বর ওয়ার্ড শুভাঢ্যা, ২ নম্বর ওয়ার্ড বেগুনবাড়ী, ৩ নম্বর ওয়ার্ড চুনকুটিয়া, ৪ নম্বর ওয়ার্ড কালীগঞ্জ পশ্চিমপাড়া, ৫ নম্বর ওয়ার্ড কালীগঞ্জ পূর্বপাড়া, ৬ নম্বর ওয়ার্ড খেজুরবাগ, ৭ নম্বর ওয়ার্ড পাড়গ্লোরিয়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ড ইকুরিয়া-মীরেরবাগ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড হাসনাবাদ এলাকা।

হাসনাবাদের বাসিন্দা রইসুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে শুভাঢ্যা খালসহ আরো কয়েকটি খাল রয়েছে। কিন্তু আবর্জনা ফেলার জন্য কোনো ডাম্পিং স্টেশন নেই। ফলে যে যার ইচ্ছামতো তাদের নিত্যদিনের ময়লা-আবর্জনা খালে ফেলছে। শুধু খাল নয় রাস্তার যেখানে-সেখানেও ময়লা-আবর্জনা ফেলছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ময়লার দুর্গন্ধ সব সময় লেগে থাকে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অস্বস্তির মধ্যে থাকতে হয়। এ ছাড়া রোগ-ব্যাধি সব সময় লেগেই থাকে। এসব দেখেও যেন কেউ দেখে না।’ স্থানীয় ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শুভাঢ্যা ইউনিয়নে অভ্যন্তরীণ খালগুলো অন্তত ১০ কিলোমিটার। এই খালগুলো দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি।’

মীরেরবাগ থেকে কালীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার শাখা খালটিতে নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলছে এলাকাবাসী। ৮০ ফুট প্রশস্ত খালটি এখন মরা ও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খালটির দুই পাশেই ময়লা ফেলা হয়। দখল-দূষণে খালের কোথাও কোথাও ৭-৮ ফুট নালা তৈরি হয়েছে। হাসনাবাদের বাসিন্দা ইসরাফিল আলম বলেন, ‘আগে খালগুলো অনেক ভালো ছিল। খালের পানি দিয়ে খাল সংলগ্ন বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতেন। এখন তো ময়লা-আবর্জনায় খাল পুরো নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে দুর্গন্ধ। ব্যবহার করা তো দূরের কথা, কেউ ভুল করে নামলে তার চর্মরোগ হতে বাধ্য!’ তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, ‘খালের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ও পোশাক কারখানার টুকরা বর্জ্য ফেলে ধীরে ধীরে ভরাট করা হচ্ছে। এতে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া দূষিত পানির দুর্গন্ধে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

কালীগঞ্জ পূর্বপাড়ার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘খালগুলোতে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। এতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। লোকজন যাতে ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলে এর জন্য সামাজিক সচেতনতা দরকার।’

খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কেরানীগঞ্জের পোশাক ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মিলন বলেন, ‘অনেকে আছেন গার্মেন্টের উচ্ছিষ্ট খালে ফেলেন। আমরা বিষয়টি নিরুৎসাহিত করেছি। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে ভ্যানগাড়ির ব্যবস্থা করেছি। নিজস্ব খরচে টুকরা কাপড় ও গার্মেন্ট বর্জ্য অন্য কোনো নিরাপদ জায়গায় ফেলা হচ্ছে। দূষণের হাত থেকে এই খালগুলো রক্ষা করা জরুরি। খাল তো পরিবেশের জন্য সহায়ক। আমাদের অসচেতনতার কারণে খালগুলো নষ্ট হোক এটি আমরা চাই না। আমরা চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খালগুলো দূষণমুক্ত হোক। এ ছাড়া খালের সীমানায় অবৈধ দোকানপাট গড়ে উঠেছে, সেগুলোও উদ্ধার করা হোক।’

শুভাঢ্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মুনতাহাসিমুর রহমান মিলন বলেন, ‘কেউ যাতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে এ জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এলাকায় জনস্বার্থে মাইকিংও করা হয়। এ ছাড়া খালের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দূষণের হাত থেকে এই খালগুলো রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যেকোনো মূল্যে এটি করা হবে।’ এই আশাবাদ প্রকাশ করেন এই জনপ্রতিনিধি।

শুভাঢ্যা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ ও শুভাঢ্যা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে প্রতিবছর দুই-তিনবার খাল ও এলাকার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু অসচেতন অধিবাসীরা কিছুদিন পরেই ময়লা-আবর্জনা ফেলে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘শুভাঢ্যার বাগানবাড়ি এলাকায় ময়লা ফেলার জন্য একটি নির্ধারিত স্থান করা হয়েছে। তার পরও লোকজন খালগুলোয় ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। আমরা বিষয়টি শক্ত মনিটরিং করার চিন্তা করছি। উপজেলা প্রশাসনকেও বিষয়টি আমরা জানিয়েছি। এ ছাড়া এই এলাকার উন্নয়নে মাস্টার প্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী এই এলাকা আরো বেশি নাগরিক সুবিধা ভোগ করবে। এরই মধ্যে এলাকার রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা ও পাকা করার কাজ শুরু হয়েছে। আমিনপাড়া, চুনকুটিয়া, কালীবাড়ি ও জিয়ানগরের রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। এলাকায় বেশকিছু বেইলি ব্রিজও নির্মাণ করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শুভাঢ্যা এলাকাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটি এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া ওয়ার্ডভিত্তিক সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে। নানা অসংগতির কথা মাথায় রেখে আমরা উদ্যোগ নিতে শুরু করেছি। এ ছাড়া স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে করণীয় ঠিক করা হয়। আমরা আশাবাদী পর্যায়ক্রমে সব সমস্যার সমাধান করা যাবে।’

 



মন্তব্য