kalerkantho

বউ-শাশুড়ি!

শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক অন্য আট-দশটা সম্পর্কের মতো যে সহজ-সুন্দর হতে পারে, তা ভাবতেই পারেন না কেউ। আমাদের কেন এমন হয়? এই সম্পর্কটায়ই বিদ্বেষভাবাপন্ন অবয়ব কেন মানুষের মুখে ফুটে ওঠে?

মারুফা মিতু   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বউ-শাশুড়ি!

ছবি : শেখ হাসান

বউ-শাশুড়ি। সাপে-নেউলে কিংবা দা-কুমড়া। শব্দগুলো একই মনে হয় অনেকের কাছে। আসলে আমাদের সমাজ তো এমনটি দেখে ও শুনে অভ্যস্ত। শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক অন্য আট-দশটা সম্পর্কের মতো যে সহজ-সুন্দর হতে পারে, তা ভাবতেই পারেন না কেউ। আমাদের কেন এমন হয়? এই সম্পর্কটায়ই বিদ্বেষভাবাপন্ন অবয়ব কেন মানুষের মুখে ফুটে ওঠে? মনোবিজ্ঞানী ফারাহ দীবা জানিয়েছেন এই সম্পর্কের এমন নানা টানাপড়েন নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আসলে এখানে যদি আমি ঘটনার মূল থেকে দেখতে যাই, তাহলে দেখতে পাব, একজন শাশুড়ির কাছে তাঁর ছেলেসন্তান, যে কিনা এত দিন শুধু মাকেন্দ্রিকই ছিল, সেই সন্তানের ভাগীদার আরেকজন হয়ে যায়। শুরু থেকে শাশুড়ির মনোভাব এমন থাকে। আবার স্বামী তাকে কিছু সময় কম দিলে, একটু কম মূল্যায়ন করলেই স্ত্রী একটু মুখ ভার করে ফেলে। আসলে প্রতিটি সম্পর্কের একটি নিজস্ব ভাব আছে। এখানে ছেলে মাকে মায়ের জায়গায়, স্বামী স্ত্রীকে স্ত্রীর জায়গায় মূল্যায়ন করলেই সম্পর্কটা সহজ হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে। তার পরও দুই পক্ষ যদি কিছু জিনিস মেনে চলে, তাহলে সম্পর্কে তিক্ত ভাব দূর হয়ে সহজ-সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

 

চিরন্তন সম্পর্ক

বউ-শাশুড়ি ‘বেস্টফ্রেন্ড’ হবে, তা ধরে না নেওয়াই ভালো। যে শাশুড়ি নিজের শাশুড়ির কাছে খারাপ ব্যবহার পেয়েছেন, তাঁর মাথায়ও ওই বিষয়গুলো গেঁথে থাকে। তিনি হয়তো কথায় কথায় সেই উদাহরণ টেনে বউকে চাপে রাখতে চান। অনেক সময় তিনি মনে করেন, এটাই ঠিক। তবে নিজের শাশুড়ির কাছ থেকে খারাপ আচরণের শিকার হওয়া শাশুড়ি তো বুঝবেন, কতটা কষ্ট তাঁকে পোহাতে হয়েছে। তাই নিজের বউমা যাতে একই আচরণের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকাই উচিত তাঁর। কারণ সময় পাল্টে গেছে, সব খারাপ বিষয় ঝেড়ে ফেলার সময় এসেছে। সময়ের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারলে নিজেরই সুখ।

 

সম্পর্কে ভারসাম্য

অনেক ক্ষেত্রে শাশুড়ির ব্যবহার বউয়ের জন্য স্বস্তিদায়ক না-ও হতে পারে। বউকে আঘাত করে কথা বলতে পারেন তিনি। বউয়ের নেওয়া সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করতে পারেন। এ ধরনের সমস্যা এড়াতে শাশুড়ির সঙ্গে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করা উচিত।

 

অনর্থক অবহেলা?

মনে রাখতে হবে, স্বামীর জীবনে অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তার মা। মা তাকে লালন-পালন করে বড় করেছেন। এত দিন মা ছিলেন তার সব। সুতরাং স্বামীর মাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সংসারে, স্বামীর জীবনে তার গুরুত্ব বুঝতে হবে। তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। তার সঙ্গে পরশ্রীকাতরতা পরিহার করুন।

 

দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ভয়?

শাশুড়ি ও বউয়ের মনমানসিকতা এক না হওয়াটাই স্বাভাবিক। একজন আরেকজন থেকে ভিন্ন। তাই দুজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। কিন্তু এই মতপার্থক্য দূর করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। শাশুড়ির সঙ্গে যথাসম্ভব বেশি বেশি কথা বলতে হবে। কথা বলে সম্পর্কের কঠিন বরফ গলাতে হবে। এতে স্বস্তির মাত্রা বাড়বে। শক্তিশালী হবে পারস্পরিক বোঝাপড়া।

 

হই একটু নমনীয়

শাশুড়ি তাঁর সিদ্ধান্তে একেবারে অটল। বউও তাঁর দিক থেকে অনড়। এমন হলে সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকেই যাবে। বরং এ ক্ষেত্রে বউ একটু নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। শাশুড়ির চোখরাঙানির মুখেও ধৈর্য ধারণ করুন। নরম সুরে কথা বলুন। শাশুড়ির সমালোচনা পরিহার করাই ভালো।

 

একটু মজার সম্পর্ক

হালকা ধরনের কৌতুক, হাস্যরস বউ-শাশুড়ির মধ্যকার সম্পর্ককে আরো সহজ করে তুলতে পারে। শাশুড়ি হয়তো বউয়ের বিরুদ্ধে সারাক্ষণ অভিযোগ করেই চলছেন। বউয়ের উচিত এটি সহজভাবে নেওয়া। হাস্যরস করে অভিযোগগুলো উড়িয়ে দেওয়া।

 

প্রশংসা

শাশুড়ির কাজের স্বীকৃতি দিন। পরিবারে তাঁর অবদান, ভালো কাজের প্রশংসা প্রকাশ্যে করুন। তাঁকে জানিয়ে দিন, তাঁর প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতার কমতি নেই। তবে মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা পরিহার করা উচিত। কারণ এতে আপনার মনোভাব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সুস্পষ্টভাবে মন থেকে পরিমিত প্রশংসা করুন।

 

যদি হয় ভুল-বোঝাবুঝি

কোনো কারণে দুজনের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হলে দ্রুত তা ব্যাখ্যা করুন। ভয়ে বা লজ্জায় মনের মধ্যে কথা চেপে না রাখাই ভালো। শাশুড়ির পাশে গিয়ে বসুন। আন্তরিকতা নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির বিষয়টি তাঁকে গুছিয়ে বলুন।

 

তর্কবিতর্ক পরিবারে নয়

তর্কে তর্ক বাড়ে। দুজনের মধ্যে কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে পাল্টা জবাব বা তর্ক পরিহার করা শ্রেয়। ক্ষুব্ধ হয়ে শাশুড়ি তাঁর কথা চালিয়ে গেলেও আপনি থেমে যান। পাল্টা জবাব দিলে শাশুড়ি আরো কথা বলার সুযোগ পাবেন। এতে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। শান্ত হলে শাশুড়িকে সব বুঝিয়ে বলুন।

 

যদি হই কর্মজীবী

আজকের যুগের নারীদের অনেকেই চাকরিজীবী, তাই সব কিছু সামলে নিয়ে আগের দিনের মতো শাশুড়ির সেবা করা তাঁদের জন্য বেশ কঠিন। সেটি শাশুড়িকেও বুঝতে হবে। আবার বউকেও বুঝতে হবে, শাশুড়ির দিকে মাঝেমধ্যে কিছুটা মনোযোগ দেওয়া উচিত, বিশেষ করে ছুটির দিনে। তাঁর মনটাও তো চায় আপনার কাছ থেকে কিছুটা সেবা পেতে। সময় পেলে শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করুন, স্বাস্থ্যের খবর নিন, শপিংয়ে যান কিংবা কোনো উপলক্ষে তাঁকে উপহার দিন। এতে সম্পর্ক সুন্দর হবে।

 

শ্রদ্ধাবোধ

ছেলে ভালো থাকুক, সুখে থাকুক, তা পৃথিবীর সব মা-ই চান। কাজেই ছেলের মতামতের প্রতি মায়ের শ্রদ্ধা রাখা দরকার। রাগারাগি বা অভিমান না করে সমস্যা নিয়ে বউয়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। এ যুগের আধুনিক ও শিক্ষিত মেয়েরা অবশ্যই তা বুঝবে। যেকোনো সম্পর্কে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা অনেক বড় বিষয়।

 

নাতি-নাতনি

রক্তের টান অন্য রকম একটি বিষয়। শিশুরা দাদির কাছে যে আবদারটা করে, সেই আহ্লাদিত সম্পর্কটা আপনি অনেক কিছুর মধ্যেই খুঁজে পাবেন না। এ এক অপার্থিব সম্পর্ক! এমন সম্পর্কে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের পছন্দের প্রিয়জনের সংস্পর্শেই বেড়ে উঠতে দিন। নাতি-নাতনিকে শাশুড়ির কাছে নিয়মিত যেতে দিন। শাশুড়ি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, দেখবেন ধীরে ধীরে তিনি বউকে পছন্দ করতে শুরু করেছেন। জার্মানিতে দুজন নারীর মধ্যে সম্পর্ক খারাপ থাকলে, বউ-শাশুড়ি কিংবা ননদ-ভাবির মতো সম্পর্ক বলে ঠাট্টা করা হয়ে থাকে। তবে বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক সুন্দর রেখে সংসারে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব, যদি দুই পক্ষই সেটি চায়।



মন্তব্য