kalerkantho


বাধা জয়ের প্রেরণা ড. নারগিস

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বাধা জয়ের প্রেরণা ড. নারগিস

ড. নারগিস সুলতানা চৌধুরী। মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। নিজেকে গড়ে তোলার মতো পথটি অন্য সবার মতো মসৃণ ছিল না তাঁর। অকালে হারান বাবাকে। এরপর শুরু হয় জীবন গড়ার সংগ্রাম। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পেয়েছেন সাফল্যের সিঁড়ি। তাঁকে নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন  কবীর আলমগীর

 

‘বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের বাতিঘর। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা হাসপাতালে থাকার কয়েক দিনের মাথায় মারা গেলেন। সংসারের বাতিঘরকে হারিয়ে আমরা পড়লাম অন্ধকার গহ্বরে। ব্যাংকে বাবার কোনো টাকা ছিল কি না আমরা জানতাম না। পরে মা বহু কষ্টে বের করলেন, ব্যাংকে বাবার ৯০ হাজার টাকা আছে। বহু দৌড়াদৌড়ির পর সেই টাকা উদ্ধার করা গিয়েছিল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বোঝানো গিয়েছিল যে আমরাই প্রকৃত উত্তরাধিকারী। বাবার রেখে যাওয়া সেই টাকাও একসময় শেষ হয়ে যায়। আমাদের কোনো ভাই নেই, পরিবারে পাঁচ বোন ছিলাম। আমিই সবার বড়। সেই সব দিনের কথা মনে পড়লে এখনো খারাপ লাগে।’ এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের তৃতীয় বর্ষের সংকটময় সময়ের কথা বলছিলেন ড. নারগিস সুলতানা চৌধুরী। তিনি এখন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান। তিনি আরো বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার আট দিন আগে আমার বিয়ে হয় সহপাঠী মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে। রেজাউলের সঙ্গে ক্যাম্পাসজীবনে আমার বোঝাপড়ার একটা সম্পর্ক ছিল। পরিবারে কোনো ছেলে সদস্য নেই। বিয়ের পর রেজাউল আমাদের পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য হয়ে ওঠে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন নারগিস সুলতানা চৌধুরী। তিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী। ২০১৩-১৪ সেশনে ভর্তি হয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন ডক্টরেট ডিগ্রি। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকেও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন নারগিস। শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল থেকে ৮৫৪ নম্বর পেয়ে পাস করেন এসএসসি। হলিক্রস কলেজ থেকে ৮৫৯ নম্বর পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। একাডেমিক দিক থেকে শুধু ভালো রেজাল্ট নয়, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজেও দখল ছিল নারগিস চৌধুরীর। ব্যাডমিন্টন ভালো খেলতেন। স্কুল-কলেজে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন একাধিকবার। বিতর্কেও মুনশিয়ানা ছিল তাঁর; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি আর বিকশিত হওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। তিনি বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি মননশীল-সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য একটা উত্ফুল্ল মন থাকা দরকার। নানা ধরনের প্রতিকূলতায় সেটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। একটা সময় শুধু লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এর বাইরে কিছু করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।’

নারগিসের সহপাঠী মো. রেজাউল করিম এখন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মার্কেটিং ম্যানেজার। নারগিসের মতো অন্য চার বোনও লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সবাই মাস্টার্স পাস করেছেন। তাঁদের কেউ হয়েছেন ডেন্টিস্ট, কেউ হয়েছেন শিক্ষক, আবার কেউ স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে চাকরি করছেন। নারগিসের দুই সন্তান—বড় মেয়ে হৃদিতা শহীদ আনোয়ার স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে, ছোট মেয়ে আদৃতা একই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘পড়ালেখাটা কষ্ট করেই চালাতে হয়েছে। এমনো হয়েছে, খরচ চালানোর জন্য নিজেরই কোনো জিনিস বিক্রি করে দিতে হয়েছে। একবার দুজনের থিসিস পেপার করেছিলাম, থিসিস পেপার বাঁধাইয়ের খরচ মেটানোর জন্য বিয়ের আংটি বিক্রি করে দিয়েছিলাম।’

‘মাস্টার্সের রেজাল্ট হওয়ার সময় চাকরি নিই হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। প্ল্যানিং অ্যান্ড কমার্শিয়াল বিভাগে চাকরি ছিল। বেশির ভাগ দিনই গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর ফ্যাক্টরিতে যেতে হতো। দেখা গেল, খুব সকালে বের হয়ে বাসায় আসতে আসতে সময় লেগে যেত। রাত ১০টা-১১টা নাগাদ বাসায় আসতাম। চাকরি চলাকালে আমি সন্তানসম্ভাবনা হয়ে পড়ি। ওই অবস্থায়ই ঢাকা থেকে রাজেন্দ্রপুর যাওয়া-আসা করতাম। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত আমি ওই ওষুধ কম্পানিতে চাকরি করি।’

২০০৪ সালে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চাকরির ভাইভা দেন নারগিস সুলতানা। সেখানেও অর্জন করেন প্রথম স্থান। শিক্ষকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওষুধ কম্পানিতে চাকরি করেছি, প্রয়োজনের তাগিদে চাকরিটা করতে হয়েছে। কিন্তু রেজাল্ট তো ভালো ছিল আমার। তাই স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হব। এই স্বপ্ন তো পূরণ হয়েছে। শিক্ষকতা হলো জাতি গড়ার পেশা এবং একজন শিক্ষিত মানুষই পারেন জাতি গড়ার কাজটি এগিয়ে নিতে।’

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চাকরির পাশাপাশি ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে ভর্তি হন। সেখানে বছরখানেক গবেষণাও করেন। এরই মধ্যে হার্টে ছিদ্র নিয়ে জন্ম হয় নারগিসের ছোট মেয়ে আদৃতা। জন্মের পর সাড়ে তিন বছরের মতো অসুস্থ ছিল আদৃতা। ভারতে তার অস্ত্রোপচারও করতে হয়। পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা থাকায় ওই সময় পিএইচডি সম্পন্ন করতে পারেননি। সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ছোট মেয়েকে নিয়ে নানা কষ্ট করতে হয়েছে। অসুস্থ থাকায় সারা রাত ঘুমাতে পারত না। কোলে ঘুমাত, শুইয়ে দিলেই আবার জেগে উঠত। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন, তিন বছর না হলে অপারেশন করা যাবে না। পরে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি। মেয়ের চিকিৎসা করানোর টাকাও ছিল না। আমাদের একটি গাড়ি ছিল। গাড়িটি সাত লাখ টাকায় বিক্রি করে দিই। ২০১২ সালে মেয়ের চিকিৎসা করাই। এখন মেয়ে ভালো আছে।’

ইচ্ছা ছিল বিদেশে পিএইচডি করতে যাব। আমার বন্ধুদের অনেকেই দেশের বাইরে থেকে পিএইচডি করেছে; কিন্তু বিদেশে গিয়ে ডিগ্রি আনার মতো সামর্থ্য ছিল না আমার। ফলে ২০১৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। পিএইচডির বিষয় ছিল ‘বায়ো-অ্যাকটিভ কম্পাউন্ড ফ্রম থ্রি অ্যাকুয়াটিক প্লান্ট অ্যান্ড দেয়ার অ্যাসোসিয়েটেড এন্ডোফাইটিক ফানজি’।

গবেষণার সুবিধার্থে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সুযোগ পান নারগিস। পান দুই বছরের ফেলোশিপ। ‘ল্যাবে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করতাম। বাসায় গিয়ে দুই বাচ্চাকে সামাল দেওয়া, তাদের খাওয়াদাওয়া করানো, এরপর আবার ৫টায় ঘুম থেকে উঠে পড়তাম। এক বছরের মধ্যে হতাশ হয়ে পড়ি; কিন্তু দমে যাইনি। অবশেষে জলজ উদ্ভিদ থেকে জীবন্ত কোষে সক্রিয় কম্পাউন্ড আবিষ্কার করতে পেরেছি। এই কম্পাউন্ডে ক্যান্সার সেল প্রতিরোধী শক্তি পাওয়া গেছে।’

‘ক্যান্সার সেলবিরোধী’ এই শক্তি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা কতটুকু জানতে চাইলে নারগিস বলেন, ‘প্রকৃতির সোর্স থেকে যেসব উপাদান পাওয়া যায়, তা অনেক সময় সরাসরি মানব শরীরে ব্যবহার করা যায় না। বায়ো-অ্যাকটিভ কম্পাউন্ড নিয়ে গবেষণা করে রোগ প্রতিরোধী কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসংবলিত অ্যানালগ উৎপন্ন করার দরকার আছে। আশা করি, একসময় এটি থেকে ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার হবে।’

নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে ড. নারগিস চৌধুরী বলেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ল্যাবরেটরি আছে। সেটি আরো উন্নত করার চিন্তাভাবনা আছে। আমার অধীনে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী কাজ করে। আমি চাই গবেষণার ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হোক। গবেষণা যত বাড়বে, ততই নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে, আবিষ্কার হবে নতুন নতুন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, যা মানুষের অকালমৃত্যুকে জয় করতে সক্ষম হবে।’



মন্তব্য