kalerkantho


কোরবানির হাট

৩১ কোটি টাকার আশায় নষ্ট হবে ১০টি খেলার মাঠ

কবীর আলমগীর   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



৩১ কোটি টাকার আশায় নষ্ট হবে ১০টি   খেলার মাঠ

অন্যান্য বছরের মতো এবারও দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীর ২২টি স্থানে কোরবানির হাট বসানোর অনুমতি দিয়েছে। হাট ইজারার মাধ্যমে এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। আর উত্তর সিটি করপোরেশনের আয় ধরা হয়েছে ২১ কোটি টাকা। কোরবানি হাটের ইজারা দিয়ে উভয় সিটির আয় হবে ৩১ কোটি টাকা। আর এই ৩১ কোটি টাকা আয়ের আশায় নষ্ট হবে রাজধানীর অন্তত ১০টি খেলার মাঠ। অথচ পরিবেশ আন্দোলনকারীদের দাবি, বিকল্প কোনো চিন্তা করলে খেলার মাঠগুলোর পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা যাবে।

ডিএসসিসি এলাকায় ১৩টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এগুলো হলো—মেরাদিয়া বাজার, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারসংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠ, ব্রাদার্স ইউনিয়নসংলগ্ন বালুর মাঠ, কমলাপুর স্টেডিয়ামের আশপাশের খালি জায়গা, জিগাতলা হাজারীবাগ মাঠ, রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ, কামরাঙ্গীর চর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধসংলগ্ন জায়গা, আরমানীটোলা খেলার মাঠ ও আশপাশের খালি জায়গা, ধূপখোলা ইস্টএন্ড ক্লাব মাঠ, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা, শ্যামপুর বালুর মাঠ এবং সাদেক হোসেন খোকা মাঠসংলগ্ন ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল ও সংলগ্ন খালি জায়গা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তালিকায় থাকা স্থানগুলোর ১০টি খেলার মাঠ।

অন্যদিকে ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর তারা মোট ৯টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে—কুড়িল, বসিলা, মিরপুর ডিওএইচএস, উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টর, খিলক্ষেত বনরূপা, আশিয়ান সিটি, ভাটারার সাঈদনগর, আফতাবনগর ও মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশন। রাজধানীর কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, নানা রঙে সাজানো হচ্ছে ব্যানার। বসানো হচ্ছে গেট। পশু বেঁধে রাখতে বাঁশের খুঁটি মাটিতে পোঁতার কাজ চলছে। পশু ব্যবসায়ীদের বিশ্রামের জন্য আলাদা জায়গা প্রস্তুত করা হয়েছে।

আরমানীটোলা লেনের বাসিন্দা হাজী মকবুল হোসেন বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর হলো আরমানীটোলা মাঠে কোরবানির হাট বসে। হাটের কারণে মাঠের পরিবেশ নষ্ট হয়। বাচ্চারা খেলাধুলা করতে পারে না। মাঠের পরিবেশও ঠিক থাকে না। এই বিষয়টি নজরে রাখা জরুরি।’ নগর বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছর পার্ক, মাঠ, রাস্তাসহ যেখানে-সেখানে কোরবানির পশুর হাট বসে। পশুর হাটে পশুকে খুঁটিতে বেঁধে রাখার জন্য এসব জায়গায় গর্ত করা হয়। কাদা না হওয়ার জন্য হাটে ইট, পাথর, আবর্জনাসহ ইট-পাথরের গুঁড়া ইত্যাদি ফেলানো হয়। হাট শেষে খুঁটি, পশুর খাবার ও মল সরানো গেলেও গর্ত, ইট, পাথর, আবর্জনা রয়েই যায়। এরপর পশুর মূত্র মাটিতে লেগে থাকায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত দুর্গন্ধ ছড়ায়, ফলে শুধু হাট চলাকালীনই জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় না; বরং হাট শেষেও অনেক দিন পর্যন্ত এর প্রকোপ থেকে যায়।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘খেলার মাঠে গরুর হাট বসানো হলে মাঠের পরিবেশ চরমভাব নষ্ট হয়। অনেক দিন পর্যন্ত মাঠ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই কোনোভাবেই যাতে পার্ক ও খেলার মাঠে পশুর হাট না বসে, সেদিকে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ পুরান ঢাকার নাগরিক উদ্যোগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘শারীরিক ও মানসিক উন্নতির জন্য খেলার মাঠের দরকার আছে। এ ছাড়া খেলার মাঠ জীবন ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে। কোনোভাবেই এসব খেলার মাঠের পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না।’

ঘনবসতিপূর্ণ এ নগরীতে জনগণের জন্য পার্ক, খেলার মাঠের সংখ্যা খুবই নগণ্য। নাগরিকের দুর্ভোগের কথা ভেবে এবার থেকেই পশুর হাট যেন কোনোভাবেই এসব পার্ক, খেলার মাঠসহ রাস্তাঘাটে না বসে, সেদিকে প্রশাসনকে মনোযোগী হতে হবে। জনগণের বিচরণ তুলনামূলকভাবে কম—এ রকম ফাঁকা জায়গায় পশুর হাটের ব্যবস্থা করতে হবে। এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা কার্যক্রম শুরু করেছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় দুই সিটি করপোরেশন ২০১৫ সাল থেকে কোরবানির জন্য নির্ধারিত স্থান ঠিক করে দিলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় জনগণ এ উদ্যোগে তেমন সাড়া দেয়নি। গত বছরের তুলনায় এ বছর কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি এলাকায় কোরবানির নির্ধারিত স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকবে বলে আশা নগরবাসীর। এ ছাড়া কোরবানির হাটগুলোও পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠুক—এমনটি প্রত্যাশা তাদের।

এবারও আগের বছরের মতো ঘুরেফিরে ইজারা পাচ্ছে দলীয় অনুগত সিন্ডিকেট। এতে দুই সিটি করপোরেশন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিহ্নিত সিন্ডিকেটচক্রের আপসমীমাংসার মাধ্যমে কম মূল্যে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে ইজারা দেওয়া-নেওয়া হয়ে আসছে কয়েক বছর ধরে। হাটগুলো নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধেই।

এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আবু নাসের খান বলেন, ‘পশুর হাটের কারণে প্রতিবছর আবর্জনায় রাস্তাঘাট ছয়লাপ হচ্ছে। ড্রেনে পানির প্রবাহ আটকে যায়, উপচে পড়া নোংরা পানি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে পরিবেশের দূষণসহ জনস্বাস্থ্য হুমকিতে থাকে। এ বিষয়টি এখনই ভাবতে হবে।’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ইজারাপ্রক্রিয়া শেষ করেছি। দুই দফায় দরপত্র আহ্বান করেছি। বেশ কয়েকটি হাট এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।’ খেলার মাঠের পরিবেশ নষ্ট হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নগরবাসীর সুবিধার জন্যই এই হাটগুলো বসানো হয়। সাময়িক নানা অসুবিধা হতে পারে। এর বিকল্প কোনো উপায় থাকলে তা ভবিষ্যতে চিন্তা করব।’ একই বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, ‘সাতটি হাটের ইজারাদার চূড়ান্ত হয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও সুষ্ঠুভাবে কোরবানির হাট পরিচালিত হবে বলে আশা করছি।’



মন্তব্য