kalerkantho


আজিমপুরের ইরাকি মাঠ দখল করে কাঁচাবাজার

জহিরুল ইসলাম   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



আজিমপুরের ইরাকি মাঠ দখল করে কাঁচাবাজার

দেড় কোটি মানুষের রাজধানী ঢাকায় খেলার মাঠ ও পার্কের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। পাঁচ শতাংশেরও কম। যে কয়টি খেলার মাঠ আছে, সেগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। তাতে নেই কোনো সবুজ ঘাস; সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। একের পর এক মাঠ অপদখল হয়ে পড়ছে। কোথাও গড়ে উঠছে বাজার, কোথাও বানানো হচ্ছে ডাস্টবিন। আবার কোনোটি দখল হয়ে এখন মাঠের কোনো চিহ্নও যেন অবশিষ্ট নেই। তেমনি একটি মাঠ রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের আজিমপুরের ইরাকি মাঠ। মাঠ আছে, তবে বাজার নামের বিষফোড়া আর সংগঠনের ভাগাভাগিতে বিশাল মাঠটি সংকীর্ণ হয়ে গেছে। একাধিকবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও থামছে না মাঠটি ঘিরে অবৈধ বাণিজ্য। 

শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের মাঝখানে বেশ কিছু জায়গা দখল করে বসেছে রমরমা বাজার। প্রস্তুত শাকসবজি, হরেক রকম মাছ, পেঁয়াজ, রসুন থেকে শুরু করে নানা ধরনের পণ্যের সমাহার। তবে সকালে কাপড়ের দোকানই বেশি দেখা গেল। এভাবেই খেলার মাঠে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বসে এক রকমের দোকানি। বিকেলে আবার সেখানেই বসে চটপটি, ফুসকা, হালিমের দোকান। মাঠের দক্ষিণ পাশের একটি অংশে এবং মাঝখানের বিরাট অংশে এই অস্থায়ী বাজার বসে। মাঠটিতে স্থানীয় একটি ক্লাবের পক্ষ থেকে ঘাস লাগানো হলেও এখন তা নেই বললেই চলে। মাঠের উত্তর পাশের অংশে কাদাপানিতে ভরপুর। ২০১৭ সালের শেষের দিকে ঘাস লাগালেও কিছুদিন ধরে সেগুলো মাঠের জন্য পরিণত হওয়ার আগেই শেষ। এখন কাদামাটির মাঠ বললেও ভুল হবে না। মাঠের চারপাশে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। দর্শকদের বসা তো দূরের কথা, দাঁড়ানোর মতো শক্ত মাটিও নেই। দিনের বেলা খেলার মাঠে খেলা করার সুযোগ না থাকলেও, রাতে সুযোগটা নেয় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা। গাঁজার গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে দক্ষিণ পাশের গোরস্থানের অংশ। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় নেশাদ্রব্য কিনে মাঠের মাঝেই অনেকে তা সেবন করে। স্থানীয়রা আর জনপ্রতিনিধি বলছেন, পুলিশ এসে দৌড়ানি দেয়, চলে যায়—আবার আসে। কিছু স্থানীয় বখাটে ছেলে এ বিষয়ে সাহায্য করছে বলে বলছে অনেকে। এ ছাড়া জানা যায়, এই বাজার বসায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, খেলার মাঠ নিয়ে মাঠের বাইরে থাকা কিছু মানুষের খেলা শুরু হয় সকাল থেকে। সকালে দোকানপাট বসিয়ে আর সন্ধ্যায় মাদক বিক্রেতাদের সহায়তা করে। এ ছাড়া মাঠের ভেতরে খানাখন্দ কম থাকলেও, সামান্য বৃষ্টিতে পানি জমে যায়। যার কারণে খেলাধুলার সুযোগ পায় না এলাকার যুবসমাজ ও শিশুরা। সুয়্যারেজব্যবস্থা ভালো না হওয়ায়ই পানি সরতে পারে না, এমনটি মনে করেন অনেকেই। শনিবার বিকেলে খেলার মাঠে গিয়ে কথা হয় আবু হায়দার নামের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। সে তার বন্ধুদের নিয়ে খেলতে এসেছে। কিন্তু মাঠে ময়লা আর কাদা থাকায় মাঠের এক পাশে একটুখানি জায়গায় খেলতে হচ্ছে, তাই তার মন খারাপ বলে জানাল সে। মাঠটি সরকারি করা গেলে পরিবর্তন আসত মাঠে, এমন ভাবনা স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের। শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বার্থে মাঠটি সরকারি মাঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মনে করেন। কথা হয় স্থানীয় যুব সংসদের সভাপতি ফুয়াদ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মাঠে ছেলেরা আগেও খেলত, এখনো খেলাধুলা করে। তবে কিছু সমস্যা তো রয়েছেই। যে সমস্যাগুলো কেউ দেখেও দেখছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িছে, খেলার মাঠটি টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে অনেকেই। ঐতিহাসিক এই মাঠে খেলে কিংবদন্তি হয়েছেন অনেক খেলোয়াড়। আজ সেই মাঠের পাশে ভাগাড়, মাদক বিক্রেতাদের নিরাপদ স্থান, টাকার বিনিময়ে রমরমা বাজার বানিয়ে ছেড়েছে কিছু অর্থপিপাসু মানুষ। এসবের প্রতিকার হওয়া উচিত বলে মনে করি।’ কে বাজার বসাচ্ছে? টাকাই বা কারা নিচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল অস্থায়ী এই বাজারের লাইনম্যান (টাকা উত্তোলনকারী) হিসেবে পরিচিত মো. জালাল আহমদকে। তিনি বলেন, ‘বাজারটি সবার দরকারে বসানো হয়েছে। এর পরিচালনার জন্য প্রত্যেক দোকানির কাছ থেকে প্রতিদিন কিছু টাকা নেওয়া হয়। যা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে খরচ করা হয়। তা ছাড়া পুলিশকেও একটা অংশ দিতে হয়।’ এলাকার কোনো নেতা টাকার ভাগ নেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি কিছুটা সময় নিয়ে বলেন, ‘না, তেমন কোনো বিষয় এখানে নেই। কোনো নেতা টাকা নেয় না।’ এ বিষয়ে লালবাগ থানার ওসির সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘দেখা করলে তবেই এ বিষয়ে কথা বলবেন।’

এ বিষয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রাজধানীতে খেলার মাঠের খুব প্রয়োজন। সে জন্য বর্তমান সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাঠের মধ্যে বাজার বসানো অথবা মাঠের পাশে ময়লার স্তূপ হওয়াটা কারো কাম্য নয়। সিটি করপোরেশনের গাড়ি ময়লা নিয়ে যাওয়ার পরও বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার কারণে এখানে ময়লা জমছে। বাজার যারা বসাচ্ছে, তাদের সবাই চেনে, এ বিষয়ে আর কিছু বলার নেই। এই মাঠ নিয়ে আইনি জটিলতা আছে, তাই সরকারি করা খুবই কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব। যদি ইরাকি কমিউনিটি নিজ থেকে দিয়ে দেয়, তবেই কিছু করা সম্ভব।’ মাদক বিক্রি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খেলার মাঠের পাশে রাতের অন্ধকারে যারা মাদক বিক্রি করছে, তারা দেশ ও জাতির শত্রু। এমনটি যাতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে চেষ্টা করব।’

 



মন্তব্য