kalerkantho


বাতিঘর

দৃষ্টিহীনের আলো ‘বার্ডো’

‘অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে’—এমন মন্ত্র নিয়েই যেন বার্ডোর পরিচালক সাইদুল হক-এর পথ চলা। শিশু অবস্থায় হারান চোখের আলো। তবে সেখানেই থেমে থাকেনি দৃষ্টিশক্তিহীন আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটি। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে এখন তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মনের আলো জ্বালাতে নিরলস কাজ করে চলেছেন। তাঁকে নিয়ে সবিস্তারে লিখছেন জহিরুল ইসলাম

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



দৃষ্টিহীনের আলো ‘বার্ডো’

চোখে তাঁর আলো ছিল; কিন্তু হঠাৎ তাঁর আলোময় পৃথিবী হয়ে ওঠে ঘোরকাল অমানিশার অন্ধকার। ছয় বছর বয়সের হঠাৎ নেমে আসা অন্ধকার দীর্ঘ ৪৫ বছর বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। এখন যার বয়স ৫১ বছর। চোখ মেলে জীবনের হিসাবের খাতা কখনো দেখার সুযোগ না হলেও হিসাব মেলাতে ভুল হয়নি। থেমেও থাকেনি দৃষ্টিশক্তিহীন আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটি। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে এখন তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মনের আলো জ্বালাতে নিরলস কাজ করে চলেছেন। যে মানুষটির কথা বলছিলাম তিনি ‘ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বার্ডো)’-এর পরিচালক সাইদুল হক।

মিরপুর পূরবী সিনেমা হলের পাশের সড়ক থেকে রূপনগরের সিএনজিতে উঠে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সামনে নামলেই পাশের ১১ নম্বর সড়কের ৩/১ ভবনটিতে পরিচালিত হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের প্রতিষ্ঠান ‘ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড বিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বার্ডো)’। গত সোমবার দুপুরে বার্ডোর রূপনগরের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ভবনটির নিচতলায় শিক্ষার্থীদের খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, দ্বিতীয় তলায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল লাইব্রেরি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং পরিচালকের অফিস। আর তৃতীয় তলায় রয়েছে বার্ডোর সম্মেলনকক্ষ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। সবশেষে চতুর্থ তলায় রয়েছে ৩২ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর আবাসিক ব্যবস্থা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের আলো দেখানো বার্ডোর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালের ১৭ জুলাই। চলতি বছরের ১৭ জুলাই ২৭ বছরে পা দেবে প্রতিষ্ঠানটি। এই দীর্ঘ পথ চলায় সাইদুল হকের মূলমন্ত্র ছিল একটাই ‘হয়ে যাবে’।

মাত্র ছয় বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান সাইদুল হক। ছোট থেকে পড়াশোনা আর সমাজ বাস্তবতায় বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। প্রতিকূলতাকে তোয়াক্কা না করেই বরিশাল সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার শুরু করেন সাইদুল। এখান থেকে ১৯৮৩ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে এইচএসসি পাস করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৮৮ সালে অনার্স ও ১৯৮৯ সালে মাস্টার্স শেষ করেন তিনি। ১৯৯৮ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। এই দীর্ঘ কঠিন পথ চলায় তিনি উপলব্ধি করেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সমাজে কতটা অবহেলিত, বঞ্চিত। শিশু বয়স থেকে এই অবহেলার শুরু, চলতে থাকে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত। সেখানেও আবার হন বৈষম্যের শিকার। এ বিষয়ে সাইদুল হক বলেন, ‘নিচের ক্লাসগুলোতে কোনো প্রতিষ্ঠানে ব্রেইলের (বিশেষ ধরনের বই) কোনো বই ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক না থাকায় আমি এগোতে পারিনি। তার পরও থেমে থাকিনি।’

জানা যায়, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বার্ডোতেই ক্লাস হয়। ওপরের শ্রেণির ক্ষেত্রে বাইরের বিদ্যালয়গুলোতে পাঠিয়ে একীভূত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এদের সব ব্যয় ও থাকার ব্যবস্থা করে বার্ডো। বার্ডোর নিজস্ব শিক্ষার্থী এবং বাইরের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ নিতে আসেন কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় জজ সফটওয়্যারের (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার) মাধ্যমে, যা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে নেই। বার্ডোর শিক্ষার্থী ফারুক হোসেন বলেন, ‘আচ্ছা, আপনি কী কী জানেন? আমি কম্পিউটারে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের সব কাজ জানি, প্রিন্ট করতে জানি, আরো অনেক কিছু।’ আর শিশু জাহিদের স্বপ্ন সে হবে ডাক্তার। জাহিদ বলেন, ‘আমি ডাক্তার হতে চাই। চোখের ডাক্তার হয়ে যারা চোখে দেখে না তাদের ভালো করব। যাতে তারা সব দেখতে পায়।’

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুবিধা এবং চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ব্রেইল লাইব্রেরি। রয়েছে বার্ডোর নিজস্ব ব্রেইল প্রকাশনাও। যেখান থেকে জাতীয় পাঠ্য পুস্তকের ব্রেইল বইও দেওয়া হয়। শিক্ষা দিয়েই থেমে থাকে না বার্ডো। যোগ্যদের চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কম্পানিতে চাকরি পাওয়ায় সহায়তা করেছে তারা। এভাবেই বার্ডো থাকছে এই দৃষ্টিহীন মানুষগুলোর পাশে।

জানা যায়, কিভাবে দৃষ্টিহীন মানুষদের এগিয়ে নেওয়া যায় তা জানার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অবস্থা জানতে চেষ্টা করেছেন সাইদুল হক। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন, পান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিগ্রিও। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অশোকা ফেলোশিপ ‘অশোকা ইনোভেটরস্ ফর দ্য পাবলিক’ এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে রবার্ট এস ম্যাকম্যানার ফেলোশিপ অন্যতম। সাইদুল হক বলেন, প্রথম দিকে কাজটি শুরু করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অর্থ, নির্দিষ্ট স্থান এবং আমার সহযোগীদের মধ্যে কে নেতৃত্ব দেবে। এসব বিষয় নিয়ে সব পিছিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু আমি থামিনি নিজেকে বলেছি ‘হয়ে যাবে’।

বর্তমানে দেশের ছয়টি জেলায় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন বার্ডোর ৭৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যার মধ্যে ১৭ জন রয়েছে প্রতিবন্ধী। বার্ডোর রূপনগরের অফিসে জনসংযোগের কাজ করেন শারীরিক প্রতিবন্ধী ফিরোজা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি বার্ডোর সঙ্গে আছি দীর্ঘদিন ধরে। এখানে কাজ করে কখনো নিজেকে অক্ষম মনে হয়নি। আমি মনে করি মানসিক শক্তির কাছে হার মানে সব বাধা।’

কথা হয় ১২ বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আহাদের সঙ্গে। চোখের আলো না থাকলেও নিজের কাজগুলো ঠিকই করতে শিখে গেছে সে। প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া আহাদের ইচ্ছা প্রতিদিন খেলাধুলা করবে বড় মাঠে। যেখানে গেলে বাতাসের শব্দ শুনে বুঝতে পারবে ওপরে আকাশ নিচে বিশাল মাঠ। এমন আরো অনেক স্বপ্ন রয়েছে দৃষ্টিহীন এই শিশুদের। তবে স্বপ্ন বাস্তবায়ন বড়ই কঠিন। ‘ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড বিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বার্ডো)’ বর্তমানে চলছে স্থানীয় ১৪-১৫ জন মানুষের মাসিক নির্দিষ্ট পরিমাণ দেওয়া সহায়তার ওপর। বার্ডোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন দেওয়া লাগে প্রায় চার লাখ টাকা, যা সব সময় জোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। তাই সবাইকে এগিয়ে আসার আবেদন করেন পরিচালক। বার্ডোর পরিচালক সাইদুল হক বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের পেছনে রেখে কখনো একটি দেশ তার সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা পরিবার থেকে যেমন অবহেলিত, তেমনি অবহেলিত সমাজেও। শিশু বয়সে তাদের শিক্ষার প্রতি নজর দিচ্ছে না পরিবার, যার দরুণ তারা শুরুতেই পিছিয়ে যাচ্ছে। তাদের এগিয়ে নেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

 



মন্তব্য