kalerkantho


রাজধানীর শিক্ষা পরিস্থিতি

শিক্ষাব্যয় জোগাতে গিয়েই মধ্যবিত্তের হিমশিম

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



শিক্ষাব্যয় জোগাতে গিয়েই মধ্যবিত্তের হিমশিম

কার্টুন : বিপ্লব

‘শিক্ষা’ অর্জন হওয়া উচিত জীবন ধারণের জন্য, অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা হলো শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদানের যেন প্রধান উদ্দেশ্যই হয়ে গেছে অর্থ উপার্জন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে জিডিপির সবচেয়ে কম ব্যয় ধরা হয়, যা একটি কর্মক্ষম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। অন্যদিকে যথাযথ শিক্ষাব্যবস্থার অভাবে বাড়ছে শিক্ষাব্যয়। নগরবাসীর আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় হচ্ছে শিক্ষা খাতে। এর ফলে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অপেক্ষা সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত। নগর ঢাকার বিরাজমান শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন শরীফুল আলম সুমন

 

রাজধানীর পল্টনের একটি বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি করেন আবুল বাসার। দুই ছেলে, মা ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন মুগদা এলাকায়। ছেলে দুটিকে ভর্তি করেছেন মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। প্রথম ছেলে এবার দশম শ্রেণিতে, আর দ্বিতীয়টি পঞ্চম শ্রেণিতে। আবুল বাসারের বেতন ৩৫ হাজার টাকা। তাঁর পরিবারের শিক্ষা খরচের হিসাব তিনি নিজেই জানালেন। আবুল বাসার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুজনের স্কুলের বেতন খুব বেশি নয়। মাত্র দুই হাজার ২০০ টাকা। আর স্কুলের কোচিংয়ে আরো প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এতেই তো হয় না। স্কুলে তো তেমন পড়ানো হয় না। আলাদাভাবে তাদের উভয়েরই দুটি করে প্রাইভেট পড়তে হয়। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয় না পড়লে হয় না। স্কুলে তো শুধু পড়া দেয় আর নেয়। মাসে প্রাইভেটে খরচ হয়ে যায় প্রায় ছয় হাজার টাকা। আর দুজনের যাতায়াত, টিফিন আর খাতা, কলমসহ আনুষঙ্গিক শিক্ষা উপকরণে আরো প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে পড়ালেখার পেছনেই খরচ হয় প্রায় ১৬ হাজার টাকা। এরপর বাসা ভাড়া দিলে অবশিষ্ট আর কিছু থাকে না।’

জানা যায়, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বেতন-কোচিং ফি নিয়ে কোনো সমস্যাই নেই। আর নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা কোনো রকমে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই দরিদ্রদের বিনা বেতনে পড়ালেখার সুযোগ রয়েছে। তবে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা মধ্যবিত্তরাই আছেন চরম বিপদে। এই পরিবারের সন্তানরা বিনা বেতনেও পড়তে পারে না, আবার মুখ ফুটেও কিছু বলতে পারে না। ফলে পড়ালেখার খরচ জোগাতে নাভিশ্বাস উঠে মধ্যবিত্ত পরিবারের। এমনকি মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মোটামুটিভাবে পড়ালেখা করাতে গেলে অভিভাবকদের বেতনের এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয়ে যায়। একটু ভালোভাবে পড়াতে গেলে আয়ের অর্ধেকই চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে পরিবারের জীবনযাপন করাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

সূত্র জানায়, বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে নানা কারণে অর্ধেক সময়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। সর্বোচ্চ ক্লাস হয় ১৮০ দিন। আবার যেসব স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, তাদের ক্লাস আরো কম হয়। আর একটি ক্লাসে ১০০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকে। ফলে শ্রেণি শিক্ষক এসে রোল কল করতেই সময় চলে যায়। আর অন্য শিক্ষকরা ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের ক্লাসে এসে পড়া দিতে দিতেই সময় চলে যায়। বড়জোড় গণিত ক্লাসে একটি অঙ্ক করে বাকিগুলো বাড়িতে করতে বলা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা গত দিনের পড়া করেছে কি না বা যা পড়া দেওয়া হলো তা বুঝতে পেরেছে কি না তা দেখার সময় থাকে না।

সালমা আক্তার নামে মণিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন অভিভাবক বলেন, ‘স্কুলে হয়তো সিলেবাস শেষ করে দেওয়া হয়, কিন্তু সেটা না পড়িয়েই। আবার অনেক সময় সিলেবাস শেষও করানো হয় না। আর সব শিক্ষার্থীর মেধা তো সমান নয়। একই শ্রেণিকক্ষে একই শিক্ষকের কাছে সবাই সমানভাবে শিখতে পারে না। সব মিলিয়েই আমাদের সন্তানদের নিয়ে কোচিং-প্রাইভেটের পেছনে দৌড়াতেই হয়।’

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বেইলি রোড শাখার নবম শ্রেণির একজন অভিভাবক বলেন, ‘এক ক্লাসে শিক্ষার্থী প্রায় ১০০ জনের কাছাকাছি। ফলে স্কুলে তো কোনো পড়ালেখা হয় না। শিক্ষকরাই বলে দেন প্রাইভেটে আসতে। কিন্তু স্কুলের খরচের পর সাত-আট হাজার টাকা প্রাইভেটের পেছনে খরচ করতে হয়। এতে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। অন্য খরচ বাদ দিয়ে পড়ালেখার পেছনে বেশি খরচ করতে হয়।’

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষকরা যদি দক্ষ হয়, আর ক্লাসে মনোযোগী হয়, তাহলে তো শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমরা শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে নানা রকম প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছেন। আশা করছি আগামী দিনে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে।’ শুধু বাংলা মাধ্যমের স্কুল-কলেজেই নয়, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেও এখন পড়ছে মধ্যবিত্তরা। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত পরিবারের। কিন্তু এসব পরিবারও এখন শিক্ষাব্যয় জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০০-এর ওপরে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেলে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা চলে যায় দেশের বাইরে। আবার কেউ কেউ ভর্তি হয় নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে মধ্যবিত্তদের একমাত্র ভরসা মধ্যমসারির কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এর পরও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ও থাকা-খাওয়ার খরচ বাবদ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়, যা মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্য বড় বোঝা। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রায় প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে একটি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় যেন তাদের টিউশন ফি নির্ধারণ করে।’ কিন্তু মন্ত্রীর এ কথা যেন না শোনার ভান করে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ীই তারা টিউশন ফি নির্ধারণ করে। আর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি মওকুফসহ নানা ব্যবস্থা থাকলেও মধ্যবিত্তদের জন্য এক টাকাও ছাড় দেওয়া হয় না।

 

স্কুলেও বাধ্যতামূলক কোচিং

কোচিং নীতিমালার দোহাই দিয়ে স্কুলেও বাধ্যতামূলকভাবে আয়োজন করছে কোচিংয়ের। প্রায় সব স্কুলেই অতিরিক্ত ক্লাসের নাম দিয়ে এই কোচিং করানো হচ্ছে। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোর পাশাপাশি সরকারি স্কুলের অবস্থাও একই। এতে একজন শিক্ষার্থী এই কোচিং করতে সম্মত হোক আর না হোক, তাকে নির্দিষ্ট ফি দিতেই হবে। এমনকি অভিভাবকদের কোচিং করানোর অনুরোধসংবলিত একটি আবেদনও জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর কোনো অভিভাবক এই আবেদন জমা না দিলে তাঁর সন্তানকে হেস্তনেস্ত করা হচ্ছে।

 

রাজধানীর সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের কোচিং সিন্ডিকেট

রাজধানীর সরকারি স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে থাকা শিক্ষকরা নিজেরাই কোচিং সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। আর এতে বিপদে পড়েছেন অভিভাবকরা। রাজধানীর ২৫টি স্কুলে ১০ বছরের বেশি চাকরি করছেন ৪৭৬ জন শিক্ষক। এক শিক্ষক দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে গড়ে উঠেছে অনিয়ম, ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে থাকা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিলেও ২০ থেকে ২৫ জন সহকারী শিক্ষককে ঢাকার বাইরে বদলি করে দায় এড়িয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রভাবশালী শিক্ষকরা বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। যাঁরা কোচিং বাণিজ্যে জড়িত বলে জানা যায়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুন নাহার শাহীন ১৯৯৮ সাল থেকে ঘুরেফিরে ঢাকায় চাকরি করছেন, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হাফিজুল ইসলাম ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ধানমণ্ডি ল্যাবরেটরি হাই স্কুল এবং ২০০৭ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১১ বছর একই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল রয়েছেন।

মাউশির ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক গৌরচন্দ্র মণ্ডল। যিনি মূলত প্রধান শিক্ষক। তিনি ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধানমণ্ডি সরকারি বয়েজ হাই স্কুল ও ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাউশি অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এবং ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত বর্তমান পদে বহাল রয়েছেন। মাউশি অধিদপ্তরের বর্তমান উপ-পরিচালক এ কে এম মোস্তফা কামাল ১৯৯৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ধানমণ্ডি গভ. বয়েজ হাই স্কুল, নরসিংদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (ছয় মাস) এবং ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক পদে ছিলেন। এই কর্মকর্তা ঘুরেফিরে প্রায় ১৯ বছর ধরেই ঢাকায় আছেন।

এ ছাড়া শেরেবাংলানগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দা জিন্নাতুন নুর, শেরেবাংলানগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সফিকুর রহমান, মোহাম্মদপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন সুলতানা নুরুন্নাহার, টিকাটুলী কামরুননেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওবায়দা বানু, নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানা, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিন বছরের বেশি সময় ধরে রাজধানীতে বহাল রয়েছেন। মূলত বেশি সময় ধরে থাকা প্রধান শিক্ষকরা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। স্কুলে ঠিকমতো পড়ানো না হলেও তাঁরা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেন না। তাঁরাই মূলত কোচিং বাণিজ্যে মদদ দিচ্ছেন।

 

নামেই কোচিং বন্ধ নীতিমালা

সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে। সেখানে একজন শিক্ষককে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ১০ জন শিক্ষার্থী পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে শুধু অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি বিষয়ে মেট্রোপলিটন শহরে মাসিক ৩০০ টাকা, জেলা শহরে ২০০ টাকা এবং উপজেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে ১৫০ টাকা করে রসিদের মাধ্যমে নেওয়া যাবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধান স্ববিবেচনায় এ হার কমাতে বা মওকুফ করতে পারবেন। একটি বিষয়ে মাসে সর্বনিম্ন ১২টি ক্লাস হতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারবে। এই টাকা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নিয়ন্ত্রণে একটি আলাদা তহবিলে জমা থাকবে। প্রতিষ্ঠানের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সহায়ক কর্মচারীর ব্যয় বাবদ ১০ শতাংশ টাকা কেটে রেখে বাকি টাকা অতিরিক্ত ক্লাসে নিয়োজিত শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। কিন্তু নীতিমালা করেই যেন কাজ সেরেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এগুলোর কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা তাদের নেই। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ কোচিং-প্রাইভেটের নামে মধ্যবিত্তের পকেট কাটছে।

 

শিক্ষকদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনতে হবে

অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ক্লাসরুমে ঠিকমতো পড়ালেখা হচ্ছে না। অথচ পরীক্ষা নেওয়াটাই শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান কাজ। এটা কোনো উন্নত দেশে দেখা যায় না। অনেক দেশেই দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটা পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। ক্লাসরুমে একজন শিক্ষার্থী কী শিখছে, সেটাই তাদের মূল বিবেচ্য। অথচ আমাদের দেশে জিপিএ ৫-এর ওপর ভিত্তি করে জাতির উন্নতির হিসাব করা হয়। আসলে পরীক্ষাকেই আমরা প্রধান হিসেবে দেখছি। আর শিক্ষাও এখন পণ্য হয়ে গেছে। শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পড়ানোর পরিবর্তে কোচিং খুলে বসেছেন। এর কারণ হিসেবে তাঁরা কম বেতনের কথা বলছেন। তাই শিক্ষকরা শিক্ষা বেচছেন, অভিভাবকরা কিনছেন। এখন আমাদের শিক্ষকদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য তাঁদের বেতন-ভাতা ও সম্মান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ক্লাসরুমে নজরদারি বাড়াতে হবে। আর এ ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।

 

পরীক্ষা কমানোই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সব মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা আবশ্যিকভাবে স্কুলে পড়ছে। আর এটা বেসিক শিক্ষা। এখানেই সবচেয়ে বেশি সংকট। আমাদের সন্তানদের যে পদ্ধতিতে পড়ানো হচ্ছে, সেখানেই বড় গলদ। অভিভাবকরা পিএসসি, জেএসসি আর জিপিএ ৫-এর পেছনে ছুটছেন। এ জন্য তাঁরা ঋণ করে হলেও সন্তানদের পড়াচ্ছেন। কারণ তাঁদের একটাই ভয়, পিএসসিতে জিপিএ ৫ না পেলে ভালো স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। একইভাবে এসএসসিতে জিপিএ ৫ না পেলে ভালো কলেজে ভর্তি করানো যাবে না। আর জিপিএ ৫ একটা সামাজিক মর্যাদার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের দুটি বাচ্চা থাকলে অর্ধেক আয় চলে যায় সন্তানদের পড়ালেখার পেছনে। সরকার শিক্ষাব্যবস্থা যতই সহজলভ্য করুক না কেন, গ্রামাঞ্চলে ব্যয় নির্বাহ না করতে পারলেই শিক্ষার্থীরা ঝরে যায়। মূলত পরীক্ষা বেশি বলেই পড়ালেখায় ব্যয়ও বেশি হচ্ছে। এখন পরীক্ষা বেশি হচ্ছে বলেই যে পড়ালেখা ভালো হচ্ছে তা কিন্তু নয়। পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা একটা ছকের মধ্যে চলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের এখন পরীক্ষা কমানোই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।



মন্তব্য

Rupal commented 26 days ago
বর্তমানে শিক্ষাখাতে দুর্নীতি সবচাইতে বেশি। কাউকে বা কোন খাতকে নিয়ন্ত্রন করার মতো কেউ নেই। কারন সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে।