kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

কেনাকাটা কালচার

আবুল হাসান রুবেল   

২৩ মে, ২০১৮ ০০:০০



কেনাকাটা কালচার

ঢাকায় লক্ষণীয় সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাম্প্রতিক সময়ে আসলে কী? সম্ভবত মার্কেট ও কেনাকাটার বিস্তার। কেনাকাটা লোকজন আগেও ঢাকায় করত, অনেক শহরের চেয়ে বেশিই করত। বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির শহর ঢাকা। কিন্তু তার বিস্তার এখন আগের সব সীমা অতিক্রম করেছে। কেনাকাটা শুধু কেনাকাটায়ই সীমাবদ্ধ নেই। শপিং সেন্টারগুলো হয়ে উঠেছে যুগপৎ দেখাসাক্ষাৎ করার জায়গা, বিনোদনের জায়গা, অবসর কাটানোর স্থান, এমনকি বর-কনে দেখার জায়গা। কেনাকাটার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। নিয়মিত কেনাকাটা যাঁরা করেন, তাঁরা একবার গিয়েই জিনিসপত্র কিনে ফেলেন না। হয়তো প্রথমে গিয়ে রেকি করে আসেন, তারপর ক্যামেরায় ছবি তুলে বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জনদের দেখান। তারপর সেটা কিনে ফেলেন। আবার দল বেঁধে যাওয়ার সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে। একে বলে একেবারে ‘জম্পেশ শপিং’। অর্থাৎ কেনাকাটা শুধু আর প্রয়োজনের তাগিদে সীমাবদ্ধ নেই, হয়ে উঠেছে উৎসব কিংবা আরো বড় আকারের সংস্কৃতি।

এই সংস্কৃতিটা একদিনে তৈরি হয়নি। গত দু-তিন দশক ধরে শপিং মলের বিস্তার এই সংস্কৃতি তৈরি হতে প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান শপিং মলের নাম এখানে তুলে দিচ্ছি। দীর্ঘ তালিকা, কাজেই চাইলে কেউ তালিকাটা এড়িয়েও যেতে পারেন। সংখ্যাটা একটু নজরে দেওয়ার জন্যই তালিকাটা দেওয়া। বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, পান্থপথ, ঢাকা। ইউনিকর্ন প্লাজা, গুলশান-২, ঢাকা। গুলশান-১ ডিসিসি মার্কেট, গুলশান-১, ঢাকা। গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেট, গুলশান-২, ঢাকা। নাভানা শপিং কমপ্লেক্স, গুলশান-১, ঢাকা। প্লাজা সেন্ট্রাল গুলশান-২, ঢাকা। শপার্স ওয়ার্ল্ড গুলশান-১, ঢাকা। জারা ফ্যাশন মল লি., গুলশান, ঢাকা। পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্স, গুলশান এভিনিউ, ঢাকা। সুবাস্তু নজর ভ্যালি, শাহজাদপুর, বাড্ডা, ঢাকা। ইউএই মৈত্রী কমপ্লেক্স, বনানী, ঢাকা। রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, সেক্টর-৭, উত্তরা, ঢাকা। মাসকট প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স, সেক্টর-৭, উত্তরা, ঢাকা। নর্থ টাওয়ার, সেক্টর-৭, উত্তরা, ঢাকা। রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স, উত্তরা, ঢাকা। এ. আর. এ সেন্টার, ধানমণ্ডি, ঢাকা। আনাম র‌্যাংগস প্লাজা, ধানমণ্ডি, ঢাকা। ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেট, ধানমণ্ডি, মিরপুর রোড, ঢাকা। জেনেটিক প্লাজা, ধানমণ্ডি, ঢাকা। অরচার্ড পয়েন্ট, ধানমণ্ডি, মিরপুর রোড, ঢাকা। রাপা প্লাজা, ধানমণ্ডি, মিরপুর রোড, ঢাকা। সীমান্ত স্কয়ার (রাইফেলস স্কয়ার), ধানমণ্ডি, ঢাকা। প্রিন্স প্লাজা, সোবহানবাগ, মিরপুর রোড, ধানমণ্ডি, ঢাকা। সানরাইজ প্লাজা, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। মুক্ত বাংলা শপিং কমপ্লেক্স, মিরপুর-১, ঢাকা। রেডক্রিসেন্ট সিটি, মিরপুর-১, ঢাকা। শাহ আলী প্লাজা, মিরপুর-১০, ঢাকা। পল্লবী শপিং কমপ্লেক্স, মিরপুর-১১, পল্লবী, ঢাকা। বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্স, মিরপুর-১, শাহ আলী, ঢাকা। রংধনু কমপ্লেক্স, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা। মোল্লা টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্স, রামপুরা, ঢাকা। আল আমিন সুপার মার্কেট, রামপুরা, ঢাকা। ওয়েলকাম সুপার শপ, শ্যামলী, ঢাকা। গ্রীন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্স, রামপুরা, ঢাকা। রাজউক ট্রেড সেন্টার শপিং মল, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, ঢাকা। ইস্টার্ন মল্লিকা, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। আল্পনা প্লাজা, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। শেলটেক সিয়েরা শপিং কমপ্লেক্স, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। ইস্টার্ন প্লাজা, সোনারগাঁও রোড, হাতিরপুল, ঢাকা। মোতালিব প্লাজা, সোনারগাঁও রোড, হাতিরপুল, ঢাকা। নাহার প্লাজা, সোনারগাঁও রোড, হাতিরপুল, ঢাকা। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, শান্তিনগর, ঢাকা। টুইন টাওয়ার্স কনকর্ড, শান্তিনগর, ঢাকা। মৌচাক মার্কেট, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা। বিশাল সেন্টার, মগবাজার, ঢাকা। সিটি হার্ট সুপার মার্কেট, কাকরাইল, ঢাকা। ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেট, পুরানা পল্টন, ঢাকা। ঈশা খাঁ শপিং কমপ্লেক্স, কাকরাইল, ঢাকা। পলওয়েল সুপার মার্কেট, নয়া পল্টন, ঢাকা। পল্টন সুপার মার্কেট, পল্টন, ঢাকা। বায়তুল মোকাররম মার্কেট, পুরানা পল্টন, ঢাকা। পীর ইয়ামেনী শপিং সেন্টার, গুলিস্তান (জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন), ঢাকা। আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা। ফার্মভিউ সুপার মার্কেট, ফার্মগেট, ঢাকা। সেজান পয়েন্ট, ইন্দিরা রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। গাউছিয়া সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট, মিরপুর রোড, ঢাকা। প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টার, মিরপুর রোড, নিউ মার্কেট, ঢাকা। নিউ মার্কেট, মিরপুর রোড, ঢাকা। বঙ্গবাজার, ফুলবাড়িয়া, ঢাকা। গ্রেটওয়াল শপিং সেন্টার, সদরঘাট, ঢাকা। উর্দু রোড মার্কেট, চকবাজার, লালবাগ, ঢাকা। রাজধানী সুপার মার্কেট, টিকাটুলী, ঢাকা।

এর বাইরেও আছে বড় বড় কম্পানির আউটলেট, ছোট-বড় বাজার, আর অসংখ্য পাড়ার দোকান। শুধু দোকানপাট আর নানা রকম মার্কেট ঢাকা শহরের কতটুকু দখল করে আছে সেটা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, তালিকার একটা বড় অংশই তৈরি হয়েছে নব্বইয়ের দশকের পর। অর্থাৎ বিশ্বায়নের কাল শুরু হওয়ার পর। আর যে সংস্কৃতির কথা আগে উল্লেখ করেছি তার গোটাটাই এ সময়ের পরের।

একদিকে বড় বড় শপিং সেন্টার বাড়ছে, সেগুলো আমাদের গর্বের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে, আর অন্যদিকে নগরীর সাধারণ মিলনস্থল, আড্ডার জায়গা, বিনোদনের স্থান বন্ধ হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। সিনেমা হলগুলো বন্ধ হচ্ছে, নাট্যকেন্দ্র সংকুচিত হচ্ছে, খেলার মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে। আড্ডাস্থল বলে পরিচিত জায়গাগুলোতে আড্ডা নিষিদ্ধ হচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে। কিন্তু মানুষকে তো এগুলো থেকে একেবারে বিরত রাখা সম্ভব নয়। কাজেই তারা বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নিচ্ছে। যাদের সময়, সংগতি আছে তারা যাচ্ছে শপিং মলগুলোতে। যাদের সময় বা সংগতি নেই তারা বেছে নিচ্ছে আশপাশের চা দোকান। ঢাকা শহরে এখন যত চা দোকান আছে, সম্ভবত দুনিয়ার কোনো জায়গায়ই এত ঘন ঘন চা দোকান পাওয়া যাবে না।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে এগুলো হয়তো কোনো রকমে ঠেকার কাজ চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু নগরীর এবং তার অধিবাসীদের মানবিক ও আত্মিক বিকাশের পক্ষে এগুলো কোনো ব্যবস্থা নয়। এসব বিষয়ে কোনো ধরনের পরিকল্পনার ছাপও আমাদের না নগর কর্তৃপক্ষের, না সরকারের আছে। এগুলোর অভাবে একটা চিন্তাহীন যথেচ্ছ ভোগ আর কেনাকাটার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। এই সংস্কৃতির ভেতর বেড়ে উঠে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আসলে কী, সেটা ভাবলেও মাঝেমধ্যে শিউরে উঠতে হয়। ওরা কি আমরা যা করছি আজ তার জন্য আমাদের দায়ী করবে না?


মন্তব্য