kalerkantho


ঢাকার অতিথি

সব দেখা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না

আইরিশ পর্যটক উইলিয়াম মেয়ারা। চা বাগান, ধানিজমি, সমুদ্রসৈকত, মহাসড়ক, গ্রাম আর ব্যস্ত কিছু শহর ঘুরে তিনি বাংলাদেশকে দেখেছেন। এ দেশে তাঁর পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

২৩ মে, ২০১৮ ০০:০০



সব দেখা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না

আইরিশ পর্যটক উইলিয়ামের অন্য কোনো পেশা নেই। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ ভ্রমণ করেন, আর দুঃসাহসিক সেসব অভিজ্ঞতা লেখেন। উইলিয়াম মেয়ারা বাংলাদেশে এসেছিলেন গত ২৪ এপ্রিল। বাংলাদেশ ছেড়েছেন ৮ মে। মাত্র এই কয়েকটি দিনে মোটরবাইকে ঘুরে বেড়িয়েছেন দুই হাজার কিলোমিটার এলাকা। তিনি বলেন, ‘মোটরবাইকে করেই আমি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ঘুরে দেখেছি। দক্ষিণে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে সূর্যাস্ত দেখেছি। সে অনুভূতি অসাধারণ, বলে বোঝানো যাবে না। সব দেখা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’ মেয়ারা আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের চা বাগান, ধানের মাঠ, সমুদ্রসৈকত, মহাসড়ক, ব্যস্ত শহরগুলো আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরেছি। সবখানেই দেখা পেয়েছি কৌতূহলী লোকের। এরা সহযোগীপ্রবণ। আমি বাংলাদেশের কৃষক, ব্যবসায়ী, দোকানি, নির্মাণ শ্রমিকের বাড়িতেও থেকেছি। সব ধরনের লোকের সঙ্গ পাওয়ার চেষ্টা করেছি। পরিচিত হয়েছি এ দেশের ধর্ম ও জীবনের নানা বৈচিত্র্যের সঙ্গে। অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভালো। এখানে অনেক ধর্ম থাকলেও দেখলাম সবাই মিলেমিশে থাকে।’

ঢাকা শহরে কেমন কেটেছে জানতে চাইলে মেয়ারা বলেন, ‘বয়স ও ইতিহাসের দিক থেকে সমৃদ্ধ শহর ঢাকা; কিন্তু সে তুলনায় খুবই ঘিঞ্জি। ঘন বসতি। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যানজট লেগেই থাকে। দূষণে ভরপুর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাকে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নগর কর্তৃপক্ষের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া এখানে কোনো তথ্য পাওয়া খুবই কঠিন। ঢাকায় অবতরণ করার আগে যদি কারো সঙ্গে যোগাযোগ করে না আসতাম, তাহলে এই শহরের অভিজ্ঞতা নেওয়া আমার জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে যেত।’

বাংলাদেশে কোনো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা? ‘আসলে মোটরবাইকের প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাছে রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের সময়টুকু খুবই নাটুকে ছিল। বেশির ভাগ সময় আমার ইনস্টাগ্রাম ট্রাভেল চ্যানেলের জন্য ছবি তুলে কাটিয়েছি।’

আর কোনো রোমাঞ্চ? ‘কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের সময়টুকু ছিল রোমাঞ্চকর। শিবিরে ঢোকার ঝুঁকি আমি নিয়েছি। খুবই অবাক লাগল—তুলনামূলক দরিদ্র একটি জাতি ১০ লাখের মতো আশ্রয়প্রার্থীকে দেখভাল কিভাবে করছে! অথচ পশ্চিমা ও ইউরোপিয়ানরা সিরিয়া সংঘাত থেকে তৈরি অল্প কিছু শরণার্থী নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে!’ তিনি আরো বলেন, ‘সময়টা উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। আর আশ্রয়প্রার্থীদের গল্পগুলো ছিল হৃদয়গ্রাহী। ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে আমি অনলাইনে তিন হাজার ৪০০ ইউরো সংগ্রহ করে দিয়েছি রোহিঙ্গাদের জন্য। এগুলো স্থানীয় কিছু সংস্থার হাতে তুলে দিয়েছি, যারা সেখানে অবাক করার মতো কিছু কাজ করছে।’

মেয়ারা জানালেন ঢাকায় তাঁর চমৎকার কিছু সময়ের কথা। তিনি একটি স্কুলে গিয়েছিলেন। সেখানে দেখা হয়েছিল হাসিখুশি অনেক স্কুলপড়ুয়া বাচ্চার সঙ্গে। এরা তাঁকে হাতে ধরে ধরে ক্রিকেট খেলা শিখিয়েছে। বললেন, ‘আমি ক্রিকেটে ভীত ছিলাম, এরাই আমার কাছে ব্যাপারটা সহজ করে তুলল।’

বাংলাদেশের মানুষদের কেমন মনে হয়েছে? জবাবে উইলিয়াম বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাপারে আমি খুবই সজাগ ছিলাম। আগে ধারণা ছিল অন্য ইসলামিক দেশগুলোর মতো এখানেও পর্যটনের অবস্থা নাজুক হবে। কিন্তু এখানে এসে এখানকার ঐতিহ্যগত আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী। এরা পরিবার নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। খোলা হৃদয়ের এবং সৎ। এদের সবাই বিনীত।’

বাংলাদেশের অন অ্যারাইভেল ভিসা ব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন উইলিয়াম। কিন্তু ইন্টারনেটে পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশের ব্যাপারে তথ্যের অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে স্বাধীন কিছু ব্লগে পর্যটকদের কাছ থেকে অনেক তথ্য পাওয়া যায় বলেও জানালেন। উইলিয়াম বলেন, ‘শহরের কেন্দ্রস্থলে আমি যেসব ঐতিহাসিক ভবন দেখেছি, সেগুলো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা উচিত। এই ইতিহাসগুলোই বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিচয়।’



মন্তব্য