kalerkantho


ডিএসসিসির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড

অব্যবস্থাপনা, দখল আর চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



অব্যবস্থাপনা, দখল আর চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

আহসান মঞ্জিল চত্বরে ময়লার স্তূপ

অব্যবস্থাপনায় দর্শনার্থীবিমুখ আহসান মঞ্জিল। শতাব্দীকাল ধরে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই প্রত্নসম্পদ ঢাকার ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে শোভা বর্ধন করে আসছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নানা অব্যবস্থাপনায় এর চারপাশে সৃষ্টি হয়েছে নোংরা পরিবেশ। আহসান মঞ্জিলের চারপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনা এবং ভাসমান দোকানিদের উচ্ছিষ্ট ময়লা-আবর্জনা নির্বিচারে ফেলার কারণে এর সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এর দক্ষিণের দেয়ালের পাশে নানা ধরনের কাগজের পোঁটলা, পচা ফলমূল সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বাড়িটিতে প্রবেশের উত্তর পাশের রাস্তার দুই পাশে ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান, রিকশা সব সময় দাঁড়িয়ে থাকে। এ ছাড়া আছে মূল ফটকের সামনে টং দোকান। এসব দোকান থেকে ভাড়া বাবদ উচ্চমান সহকারী আলী রেজা টাকা নিয়ে থাকেন বলে জানালেন একজন টং দোকানদার। সরেজমিনে গিয়ে আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, রাতে সেখানে নানা অপরাধীচক্রের আনাগোনা। বাড়িটির দেয়ালের পাশে বসে নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে কিছু ভাসমান লোক। এ ছাড়া আহসান মঞ্জিলের ভেতরেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। আবার এক স্থানে দেখা যায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে আবর্জনা। যেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এসব অবস্থা দেখে সাধারণ মানুষ ও দর্শনার্থীরা চরম হতাশ হচ্ছে। সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রধান তথ্যদাতা কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন এই প্রতিবেদককে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বললেও পরে কথা বলতে রাজি হননি এবং টং দোকান থেকে টাকা নেন কি না জানতে চাইলে উচ্চমান সহকারী আলী রেজাও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 

বুলবুল ললিতকলা একাডেমির ভেতরে চলছে স্থানীয় যুবলীগ নেতার জেনারেটর ব্যবসা

বুলবুল ললিতকলায় দলীয় অফিস

বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা) এখন রয়েছে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়। এ ছাড়া এর পূর্ব দিকে আছে যুবলীগ নেতা রিপন ব্যাপারীর জেনারেটর ব্যবসা। এতে একদিকে যেমন শঙ্কা দেখা দিয়েছে বুলবুল ললিতকলার এই জয়গা বেহাত হয়ে যাওয়ার, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে শিল্পচর্চার পরিবেশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির সভাপতি হাসানুর রহমান বাচ্চু বলেন, ‘আমাদের তো একটু সমস্যা হচ্ছেই।’ তবে তিনি সংশ্লিষ্টদের নাম বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেনারেটর ব্যবসায়ী ও ৩৭ নম্বর যুবলীগ সেক্রেটারি রিপন ব্যাপারী বলেন, ‘জেনারেটর চলে বুলবুল ললিতকলার স্বার্থেই। আর এখানে দলীয় অফিস অনেক দিন ধরেই আছে। আমাদের তারাই জায়গা দিয়েছে, যাতে অন্য কোনো ভূমিদস্যু এখানে নজর দিতে না পারে।’

 

সদরঘাটের প্রবেশমুখে ডাস্টবিনের কারণে সৃষ্ট যানজট

রাস্তাঘাটের বেহালদশা

৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এলকাগুলোর মধ্যে ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, সিমসন রোড, কুমারটুলী, জি এল সাহা রোড, কবিরাজ লেন, আহসানউল্লাহ রোড, লিয়াকত এভিনিউ, ওয়াইজঘাট, রমাকান্ত নন্দী লেন, লয়াল স্ট্রিট, বাংলাবাজার ও চিত্তরঞ্জন এভিনিউ। এই সব এলাকার যাতায়াতের রাস্তাগুলো দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দে ভরা। রাস্তায় আছে বড় বড় গর্ত। পয়োনালারও বেহালদশা। এ ছাড়া পাটুয়াটুলী থেকে ওয়াইজঘাটে প্রবেশের মুখে রিকশা-ভ্যানের জট। গুলশান আরা মার্কেটের সামনে রাস্তার ওপর রড বিছানো, বালুর স্তূপ। এসব ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ সিরাজ বলেন, ‘এলাকায় যেসব সমস্যা আছে, তা ধারাবাহিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

 

সদরঘাটে চাঁদাবাজি আর কুলির হয়রানি

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ‘সদরঘাট অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর’ এখন চাঁদাবাজ আর কুলির দখলে। তাদের আধিপত্যে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। কর্মরত পুলিশ কিংবা অন্য প্রশাসনিক ব্যক্তিরাও তাদের কাছে অসহায়। গ্যাংওয়েতে ঢোকার সময় নেওয়া হয় জনপ্রতি পাঁচ টাকা। এ টাকার দেওয়া হয় না কোনো রসিদ। এ টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আদায়কারী লতিফের ভাষ্য, ‘এই টাকা বিআইডাব্লিউটিএর অফিস মতিঝিলে জমা হয়।’ রসিদ ছাড়া কিভাবে টাকা তোলে জানতে চাইলে তারা এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এ ছাড়া সাধারণ হকার ও কুলিদের কাছ থেকে চাঁদাসহ বিভিন্ন উপায়ে চাঁদা তোলে এখানকার বেশ কিছু সিন্ডিকেট।

 

সদরঘাটে মাদকের ফাঁদে শিশুরা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা গেছে, সদরঘাটের বেশির ভাগ শিশুই গাঁজা খেয়ে নেশা করে। তবে সস্তা হওয়ায় পথশিশুদের সবচেয়ে প্রিয় ‘ড্যান্ডি’। বেসরকারি একটি সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, সদরঘাটে শিশুদের সংখ্যা প্রায় ৫০০। এদের প্রায় ৯৮ শতাংশই মাদক সেবন ও কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত। এদের দলে নিয়মিতই নতুন শিশু যোগ হচ্ছে। সদরঘাটের পথশিশুরা যেন পথভ্রষ্ট না হয়, সে জন্য একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পাশে একটি স্কুল করা হয়েছে। তবে সদরঘাটে পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই স্কুলের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এদিকে পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকাটি বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় এখানে যাতায়াত করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। আর কিছু কিছু মার্কেটের অসাধু ব্যবসায়ীরাও মূল ব্যবসার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসায়। কিছুদিন আগেও বিক্রমপুর গার্ডেন সিটি থেকে আট হাজার পিস ইয়াবাসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘যেকোনো ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

 

রাস্তা দখল করে রাখা হয়েছে হিউম্যান হলার

রাস্তা দখল করে হিউম্যান হলারের ব্যবসা

পুরান ঢাকার সরু রাস্তায় মহাদুর্ভোগের নাম ‘হিউম্যান হলার’। বাংলাবাজার প্রবেশের পথে আছে ‘বাহাদুর শাহ পরিবহন’ ও ‘মহানগর পরিবহন’ নামে দুটি হিউম্যান হলার ব্যবসা। যাদের নেই কোনো রুট অনুমোদন। উপরন্তু এসব পরিবহন রাখা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটকের সামনে। এ ছাড়া কলেজিয়েট স্কুল, হিড ইন্টারন্যাশন্যাল স্কুল এবং বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনেও রাখা হয়। এতে একদিকে বাড়ছে রাস্তার যানজট, অন্যদিকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত থাকছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে। কিছুদিন আগেও কলেজিয়েট স্কুলের এক শিক্ষার্থী মহানগর পরিবহনের আঘাতে গুরুতর আহত হয়। এখান থেকে স্ট্যান্ড সরানোর জন্য অভিভাবকরা বেশ কয়েকবার কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানালেও কোনো লাভ হয়নি। এ ছাড়া সদরঘাট প্রবেশের পথে ওভারব্রিজের নিচে ‘দোয়েল পরিবহন’ নামে আরেকটি হিউম্যান হলার ব্যবসা আছে। এই পরিবহনের কারণে সদরঘাটের প্রবেশপথ মাঝেমধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘এরা সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে এখানে স্ট্যান্ড দিয়েছে বলে শুনেছি।’

 

বাংলাবাজারে ঘিঞ্জি পরিবেশ

সারা বাংলাদেশের পাঠ্য বই কিংবা সৃজনশীল বইয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই সরবরাহ করা হয় বাংলাবাজার এলাকা থেকে। কিন্তু বাংলাবাজারের মূল রাস্তাটির বেশির ভাগ চলে গেছে ‘দোয়েল পরিবহন’ আর ফুটপাতে বই বিক্রেতাদের দখলে। এতে সর্বদা তীব্র যানজট আর ভোগান্তিতে নাকাল হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাবাজারের ঘিঞ্জি পরিবেশের আরেকটি কারণ হলো, যে যেভাবে পারছে ছোট ছোট দোকান দিচ্ছে। এতে এমন কিছু দোকানও আছে, যারা সূর্যের আলোও দেখতে পায় না।

 

ফুটপাতে ব্যবসা, পথচারী রাস্তায়

রাজধানীর জনবহুল ও ব্যস্ততম এলাকার মধ্যে সদরঘাট, বাংলাবাজার ও ইসলামপুর অন্যতম। এ এলাকার স্বাভাবিক চলাচলের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ফুটপাত ও রাস্তাজুড়ে হকারদের উৎপাত। সদরঘাট মোড়ের ফুটপাত ও রাস্তা যেন হকারদের স্বর্গরাজ্য। যে যেখানে পারছে, নির্বিচারে দোকান ও টুকরি নিয়ে বসে পড়ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, লিয়াকত এভিনিউ, মায়া কাটরা সড়কের দুই পাশের ফুটপাত এবং মূল রাস্তার কিছু অংশ দখল করে বসেছে অসংখ্য দোকানপাট। হকার্স মার্কেটের সামনের সারিতে প্রায় ৩০টি দোকান ড্রেনের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি থানার ডিউটি পুলিশ সদস্যরা বখরা আদায় করেন। এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার ব্যাপারে আমরা সব সময়ই জিরো টলারেন্সে বিশ্বাসী। সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলে আমরা তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করি।’

 

নাক চেপে কোনো রকমে রাস্তা পার

বিআইডাব্লিউটিএর তথ্য মতে, প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যাত্রী চলাচল করে এই নৌপথ দিয়ে। এত বিপুলসংখ্যক লোককে সদরঘাটে স্বাগত জানানো হয় বাংলাবাজার মোড়ে রাখা দুটি বড় বড় ডাস্টবিন দিয়ে! এসব ডাস্টবিনের গন্ধে বমি আসে অনেকের! অনেকেই নাক চেপে কোনো রকমে রাস্তা পার হন। বুড়িগঙ্গায়ও আছে ময়লার উৎকট গন্ধ। কাউন্সিলর বলেন, ‘সুইপাররা পরিষ্কার করতে না করতেই আবার ময়লা-আবর্জনায় ভরে যায়।’ তা ছাড়া ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ইসলামপুর ঘড়ি মার্কেট, ইলেকট্রনিকস মার্কেট, গুলশান আরা সিটির সামনেও প্রচণ্ড দুর্গন্ধ নিয়েই ব্যবসা করছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচসহ সব ধরনের মসলার পাইকারি বাজার হিসেবে রাজধানীতে পুরান ঢাকার শ্যামবাজার বিখ্যাত। শ্যামবাজারেও আছে জলাবদ্ধতা আর দুর্গন্ধের সমস্যা। ঘড়ি ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, “ট্যাক্স নেওয়ার সময় ঠিকমতো নিলেও সেবার বেলায় ‘শূন্য’। কেউ তো এসব নিয়ে ভাবে না। নেতারা আছেন ভোটের রাজনীতিতে।”



মন্তব্য