kalerkantho


নকশি ফোঁড়ে স্বপ্ন বোনেন পারভিন

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নকশি ফোঁড়ে স্বপ্ন বোনেন পারভিন

নকশি কাঁথাকে নানাভাবে নতুনত্ব দিয়েছেন পারভিন আক্তার। ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশ ও দেশের বাইরেও। পরম মমতায় গড়ে তুলেছেন ‘রাজশাহী নকশি ঘর’ নামের প্রতিষ্ঠান। স্বল্প পুঁজির মূলধন নিয়ে শুরু করলেও তাঁর প্রতিষ্ঠানে এখন কাজ করেন প্রায় সাত শর বেশি কর্মী। শত বাধা পেরিয়ে তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন ফরহাদ হোসেন

 

‘জন্ম মফস্বল শহর লক্ষ্মীপুরে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব কেটেছে ঢাকার জুরাইনে। ১৯৯৭ সালের কথা। বিএসসি পরীক্ষা শেষ না হতেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। স্বামীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে গিয়ে একটি বিষয় বেশ চোখে লাগল আমার। দেখলাম শ্বশুরবাড়ির সব মেয়েই নকশি কাঁথা বুনছে। আশপাশের এ বাড়ি, ও বাড়িতেও দেখলাম মেয়ে-বুড়ো সবাই সুঁই-সুতার ফোঁড় দিয়ে বুনছে নকশি কাঁথা। দেখতে দেখতেই নকশি কাঁথার প্রতি একটা ভালো লাগা জেগে ওঠে। সেই ভালো লাগা থেকেই নকশি কাঁথার কাজ শিখতে শুরু করলাম। কাজ শেখার পর ভাবলাম, নকশি কাঁথাকে শুধু গতানুগতিক নকশি কাঁথায়ই সীমাবদ্ধ না রেখে এর বহুমুখী রূপ দেওয়া যায় কি না। সেই ভাবনা থেকেই নকশি কাঁথা দিয়ে তৈরি করলাম কুশন কাভার, ম্যাট, চাদর, ওড়না, ডিভাইন কভারসহ নানা পণ্য। কিন্তু বিক্রি হবে কোথায়? সেই ভাবনারও সমাধান পেলাম। অনেকেই বলল, ঢাকায় এসব পণ্যের ভালো কদর পাওয়া যাবে। ফলে ঢাকায় পাঠানো হলো কিছু পণ্য। বিক্রিও হলো। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল পণ্য তৈরি ও বিক্রির পরিমাণ।’ নকশি কাঁথা ও কাঁথার আবহে তৈরি নতুন পণ্য নিয়ে ভালো লাগা, কাজ শেখা ও উদ্যোক্তা হওয়ার কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন পারভিন আক্তার

কাজের প্রতি ভালো লাগা, ভালোবাসা থাকলে যত বাধাই আসুক, তা জয় করা যায় বলে মনে করেন পারভিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি যখন কাজ শিখতে শুরু করি, তখন অনেকেই বলত, এটা শিখে তুমি কী করবে? অশিক্ষিত মেয়েরা এ কাজ করে আর তুমি তো শিক্ষিত মেয়ে। ঢাকায় বড় হয়েছ। তুমি এ কাজ কেন করবে? পরিবারের অনেকে হাসি-ঠাট্টা করত, যখন আমি নকশি কাঁথা বিক্রির কথা বলতাম। তারা শুধুই জানত এটা শুধু নিজেরা বানাবে এবং ব্যবহার করবে। পরিবারের অনেকেই মশকরা করে বলত পাগল। শুরুতে এ বিষয়ে পরিবারের লোকজনের ছিল ঘোর আপত্তি। তা ছাড়া এসব পণ্য যখন বিক্রির জন্য ঢাকার পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো অনেকেই নেতিবাচক মনোভাব দেখাত, আবার অনেকে উৎসাহ জোগাতে। মফস্বল শহরে নকশি কাঁথা তৈরি হলেও সেখানে বাজার ছিল না। ভালো লাভের জন্য ঢাকার বাজারই ছিল ভরসা। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় পণ্য পাঠানো, এর বাজার ধরা আমার জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। কিন্তু তার পরও আমি পরিচিতজনদের কাছে অল্প অল্প পণ্য বিক্রির জন্য ঢাকায় পাঠাতাম।’

এর পর তিনি ২০০৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চলে আসেন ঢাকার জুরাইনে। তিনি বলেন, “ঢাকায় আসার পরে লক্ষ করলাম পরিচিতজন ছাড়াও অনেকে পণ্যগুলো কিনছে। নিজের কোনো শোরুম ছিল না। তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে পণ্য তৈরি করে এনে বাসায় রাখতাম। বাসা থেকে বেশ কয়েকজন মহিলা আমার কাছ থেকে পণ্য নিয়ে সারা দিন বিক্রি করে বিকেলে হিসাব দিয়ে তাঁদের লাভের অংশ বুঝে নিয়ে যেতেন। এভাবেই বাড়তে লাগল বিক্রির পরিমাণ ও পণ্যের পরিচিতি। ২০১০ সালে কোনো এক পত্রিকায় চোখ পড়ল এসএমই মেলায় পণ্য প্রদর্শনের একটি বিজ্ঞপ্তি। যোগাযোগ হলো তাদের সঙ্গে। শর্ত দিল থাকতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ। তখনই এর নাম দেওয়া হলো ‘রাজশাহী নকশি ঘর’। অংশ নিলাম মেলায়। সেখানে পণ্যগুলো বেশ প্রশংসিত হলো। কাজগুলো পছন্দ করল ব্যান্ডশপ ‘সাদা-কালো’ আর ‘টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির’। তাদের কাছে বেশ কয়েক ধরনের পণ্যও বিক্রি করলাম। এ ছাড়া অরণ্য নামের একটি প্রতিষ্ঠানকেও দেওয়া হলো বেশ কিছু নতুন ধরনের পণ্য। ঐতিহ্যবাহী ‘লোহরি কাঁথা’ নামে একটা পণ্যের বেশ প্রচলন ছিল গোটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলজুড়েই। কিন্তু ক্রমেই তা বিলুপ্ত হতে বসেছিল। ঢাকায় শৌখিন পরিবারের কাছে এর কদর ছিল বেশ। অরণ্য চাইল সেই পণ্যটি। সেই কাঁথার খোঁজে গেলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জে। অনেক ঘুরে ঘুরে এক গ্রাম থেকে তৈরি করে আনা হলো সেই ‘লোহরি কাঁথা’। ঝামেলা ছিল সেই পণ্যটি বানানো প্রায় ভুলেই গেছিল সেখানকার মানুষ। এটা বানাতে অনেক সময় ও ধৈর্য ধরতে হতো। নকশি কাঁথার সঙ্গে বানিয়ে আনা হয় লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ পাঁচ কাঠের তৈরি জুটের খাট, জুটের ম্যাট, কাঠের টুলসহ নানা কিছু। ২০১২ সালে আবার এসএমই মেলায় অংশ নিলাম। ঢাকার মেলা ছাড়াও আমি বিভাগীয় ও জেলা শহরের বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করি। প্রতিটা মেলা থেকেই প্রচুর অর্ডার পাওয়া যায়।” তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটা মেলা আমার ব্যবসার এক একটা ভিত গড়ে দেয়। মেলা থেকেই প্রচার, প্রসার ও বিক্রি—এই তিনই হয়ে থাকে। একের পর এক অর্ডার আসতে থাকে। বলতে গেলে এসএমই মেলাই আমার উদ্যোক্তা হওয়ার রসদ জুগিয়েছে।’

শুরুটা ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে। তখন এর কর্মী, বাজার, চাহিদা সবই ছিল কম। এখন ক্রমেই বাড়ছে বাজার। পণ্যের বিস্তৃতি লাভ করছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও। তাই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এর বিনিয়োগও। তিনি বলেন, ‘শুরুটা ছিল খুব কম মূলধনে। যে টাকা লাভ হয়, তা আবার বিনিয়োগ করি। এভাবেই বেড়েছে মূলধন। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নিই ছয় লাখ টাকা এবং এ বছরের শুরুতে ব্যাংক ঋণ পেয়েছি তিন লাখ টাকা, যা আমার প্রতিষ্ঠানের প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। শুরুতে পরিবারের সবাই নেতিবাচক মনোভাব দেখালেও স্বামী সব সময় পাশে ছিলেন। এখন শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও সহযোগিতা করে সব কাজে।’

শুরুতে তাঁর কোনো কর্মী না থাকলেও এখন তাঁর পণ্যের জোগানে কাজ করছেন প্রায় ৭০০ নারীকর্মী, যার বেশির ভাগই চাঁপাইনবাবগঞ্জের। যেখানে আগে তাঁদের হাতের কাজের মূল্যায়ন হতো শুধু নিজের ব্যবহারের জন্য, এখন সেই নারীরা রোজগার করেন বেশ। পারভীন আক্তার বলেন, ‘কাজ করার সুযোগ দিয়ে তাঁদের সংসারে সচ্ছলতা আনতে পেরে আমি ধন্য। শুরুতেই এমন মানসিকতা না থাকলেও নিজের লাভের পাশাপাশি তাঁদের কর্মসংস্থানের জোগান দিতে পেরে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি কাজ করে নিজের ভেতরে।’ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও সোনারগাঁর অনেক মহিলা তাঁর কাজ করেন। ঢাকায় রয়েছে নিজস্ব ধোলাই কারখানা। সেখানেও কর্মী রয়েছে বেশ কিছু। কাজের সাফল্য হিসেবে পারভিন আক্তার ২০১৭ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন মাইক্রো উদ্যোক্তার পুরস্কার। ২০১৭ সালে আয়োজিত ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) সম্মেলনকে ঘিরে আয়োজিত বিশেষ মেলায় তাঁর পণ্য দিয়ে কুড়িয়েছেন বেশ প্রশংসা। তাঁর তৈরি নান্দনিক ও বাহারি পণ্য পরিচিতজনদের মাধ্যমে যায় জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকাসহ নানা দেশে।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যে কাজই করুন না কেন, আগে কাজকে ভালোবাসতে হবে। কাজ শিখতে হবে, বুঝতে হবে। সাফল্য এমনি এমনি আসে না। পরিশ্রম করতে হয়। নিজের কাজের বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানা না থাকলে সেটা অন্যকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বোঝানো যায় না। এসব বিষয় লক্ষ রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে সফলতার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রম।’



মন্তব্য