kalerkantho


জয়িতা

প্রিয়ভাষিণীর কথা বলছি

মারুফা মিতু   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রিয়ভাষিণীর কথা বলছি

ছবি : কাকলী প্রধান

ভাস্কর হিসেবে তাঁর সামান্য বস্তুতে অসামান্য বিষয় প্রকাশের প্রয়াস অসাধারণ। ঘাসফুল-লতাপাতা, ডাল, শিকড় ইত্যাদি নির্জীব বস্তুতে তিনি শিল্প প্রয়োগ করে আমাদের অনুভূতিকে আলোড়িত করেছেন।

 

সূর্যোদয়ে তুমি... সূর্যাস্তেও তুমি... ও আমার বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি। এমন আকুল হয়ে দেশের গান গাই আমরা। এই দেশকে যাঁরা আমাদের ভালোবাসার জন্য রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিলেন সেই মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিনিয়ত বুকের মধ্যে আলোড়ন তুলে রাখেন। এক সমুদ্র ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মাথা নত করে আমরা সেই ৩০ লাখ শহীদদের শ্রদ্ধা জানাই। তেমনই এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। ৬ মার্চ এই মহীয়সী নারী না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এ দেশের মানুষের কাছে আজন্ম শ্রদ্ধেয়, অনুকরণীয় একজন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মর্মস্পর্শী নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হন এই মহীয়সী নারী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্পেষণে মুক্তিকামী জনগণকে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছিল। বুকের রক্ত আর নারীর শরীর নিয়ে তারা যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেছিল। ধর্ষণ, গণধর্ষণের মতো পাপাচারের নিকৃষ্টতায় পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নারীদের ক্ষতবিক্ষত করেছিল। মৃত্যুর মুখে নিপতিত হয়েছিল অসংখ্য নারী-পুরুষ।

বেয়নেটের তীব্র আঘাত উপেক্ষা করে মুক্তিবাহিনীর দামাল ছেলেরা বুক ভরা সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি দানবদের বিরুদ্ধে। ৯ মাস দুঃখ-যন্ত্রণা-বেদনার ধারাবাহিকতা শেষে অবশেষে বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হলো। স্বাধীন দেশে মানুষের বিজয় উল্লাসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে সুন্দর একটা রাষ্ট্র গঠিত হলো। কিন্তু এই উল্লাসের নিচে চাপা পড়ে গেল ইজ্জত-সম্মান হারানো হাজারো মা-বোনের আকুতি ও আর্তি।

দেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযোদ্ধারা স্বীকৃতি পেলেন। অত্যাচারিত নারীরা নাম পেলেন বীরাঙ্গনা। বৈষম্য শেষ হলো না। বীরাঙ্গনা নামের মধ্য দিয়ে তাঁরা আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেল না। নিগৃহীত একাত্তরের মহীয়সী নারীরাও লোকলজ্জার ভয়ে স্বীকৃতির দাবিতে এগিয়ে এলেন না বরং পরিবার-সমাজের কটূক্তির ভয়ে কুণ্ঠিত হয়ে রইলেন।

দীর্ঘ সময় পর একজন নীরবতার কুণ্ডলি ভেঙে বেরিয়ে এলেন। আত্মপরিচয় যখন সম্মানের তখন লুকিয়ে থাকার মানে হয় না, তিনি উপলব্ধি করলেন। নিজের যুদ্ধস্মৃতি ও কষ্টের কথা, পাকিস্তানি বাহিনীর ধর্ষণ ও অত্যাচারের নির্মমতা নিয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। স্বাধীন দেশে এ রকম অসংখ্য নির্যাতিত নারীর প্রতীক হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।

সমাজের কূপমণ্ডূকতা ও স্বাধীন দেশের মানুষের করুণ মানসিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করে একাত্তরকে জাগিয়ে তুললেন নতুন অবয়বে। সাহসের প্রাচীর টপকালেন আপন আলোয়। বাংলাদেশ তাঁর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের নতুন ইতিহাস অবলোকন করল। হাজার হাজার নারীর মধ্যে সাহস সঞ্চার হলো। শক্তির প্রাচুর্যে একা নারীও যে নিঃসঙ্গ নয়, সেটা প্রমাণিত হলো।

মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়েছিল ঠিক, মানুষের মন স্বাধীন হয়নি। আর না হলে দেশের জন্য ত্যাগ শিকার করা সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধা নারী কেন মুখ খুলতে পারলেন না আজও। ত্যাগের ইতিহাস তো এক-দুজন নারীর নয়। আমরা চিনতে পারলাম কয়জনকে। কয়জন আমাদের দ্বারা সম্মানিত হলেন, সেগুলোও বড় এক প্রশ্ন বটে। কিন্তু আশার কথা হলো, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী পরিবারের সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রকাশ্যে এলেন। সমাজের কটূক্তি উপেক্ষা করে কথা বললেন। আমরা জানলাম এক বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ ও অসংখ্য নাম না জানা নারীর প্রতি বীভৎসতার বয়ান।

অবশেষে বাংলাদেশ অসংখ্য বীরাঙ্গনার খোঁজ পেল, ঘোষণাও করল কারো কারো নাম। যুদ্ধের বয়ান থামেনি। ইতিহাস বিকৃত হয়েছে, ঠিকও হয়েছে। প্রিয়ভাষিণী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করেছেন। এটা তাঁর লড়াই, তাঁর অধিকার। সেটা তিনি অর্জন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন—অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অর্জন করতে হয়।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধাদের দান। আমরা সেই দান নিয়ে অহংকার করি, বেঁচে থাকি। সাহসের সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারীর প্রতি অবদমন যে কত নিষ্ঠুর, সে ইতিহাস আরো লজ্জার। প্রিয়ভাষিণী তাই মুক্তির বারতা, আমাদের নতুন ইতিহাস। সে ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে দেশ তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেছে।

প্রতিনিয়ত দেশের স্বাধীনতার অনুভূতি তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে তিনি ছড়িয়েছেন, বিস্তার ঘটিয়েছেন। ভাস্কর হিসেবে তাঁর সামান্য বস্তুতে অসামান্য বিষয় প্রকাশের প্রয়াস, অসাধারণ। ঘাসফুল-লতাপাতা, ডাল, শিকড় ইত্যাদি নির্জীব বস্তুতে তিনি শিল্প প্রয়োগ করে আমাদের অনুভূতিকে আলোড়িত করেছেন। নীরব সংস্কৃতিকে সরব করা তাঁর যে স্বাধীনতা প্রয়াস, সেটা একজন ভাস্কর কত নিপুণভাবে করতে পারেন বাংলাদেশ তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে সেটা অনুভব করেছে।

শিল্প সাধনা ও সমৃদ্ধ বাংলা সংস্কৃতি বিনির্মাণে তাঁর ব্যক্তিগত অবদানও অনস্বীকার্য। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর হিসেবে নিজেকে সাজানো ও নির্মাণ করা তাঁর নিরন্তর সংগ্রামশিল্পের পর্যায়ে অভূতপূর্ব এক নিদর্শন। হাজারো নারীর শক্তি, কথা বলার অনুপ্রেরণা—ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর একার লড়াই ও পথচলা, একাত্তরের মূল চেতনা। সে চেতনার আলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেশ এগিয়ে যাবে জ্ঞানে, মানুষ পাবে হতাশার মধ্যে দিশা—এটা তাঁর জীবনেরই শিক্ষা। সেই শিক্ষাটুকু আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েই চলে গেলেন তিনি না-ফেরার দেশে।

 



মন্তব্য