kalerkantho


বেদখল ও নিরাপত্তাহীনতার কবলে পার্ক ও খেলার মাঠ

নাভিশ্বাস এক জীবনের নাম ঢাকা!

দেড় কোটি মানুষের এই রাজধানীতে খেলার মাঠ একেবারেই নগণ্য। ক্রমেই বেদখল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ ও পার্ক। ফলে শিশু-কিশোররা বন্দি হয়ে পড়ছে চার দেয়ালের মধ্যে। সংকুচিত হয়ে আসছে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান। এসব অপদখলের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও নেই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। ঢাকায় খেলার মাঠ ও পার্কের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন তোফাজ্জল হোসেন রুবেল

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নাভিশ্বাস এক জীবনের নাম ঢাকা!

অঙ্কন : বিপ্লব

নাগরিক কোলাহল আর যাপিত জীবনের নাভিশ্বাস নিয়ে আমাদের ঢাকার জীবন। রাজধানী ঢাকায় প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর জন্য নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক। জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট নগরীতে দিন দিন মানুষের চাপ বাড়ছে। কিন্তু খেলার মাঠ নতুন করে না বাড়িয়ে যেগুলো আছে তা-ও অবহেলা-অযত্নে ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে। শহরের শিশুদের কাটাতে হচ্ছে বন্দিজীবন। খেলার মাঠ নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যেন কোনো মাথাব্যথাই নেই। লাখ লাখ মানুষের ভারে ন্যুব্জ রাজধানীতে একটু আনন্দ আর বিনোদনের পরিবেশ না পেয়ে মানুষ যেন হয়ে উঠছে অমানবিক! অথচ বিশ্বের প্রায় সব উন্নত শহরে এলাকাভিত্তিক রয়েছে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ।

১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশনের আত্মপ্রকাশের পর এ পর্যন্ত বড় আকারের উদ্যান ছাড়াও রাজধানীতে এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ ছিল। কিন্তু এগুলোর এখন আর কাগজের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল পাওয়া যায় না। যদিও রাজউকের মালিকানাধীন মাঠ ছাড়া দুই করপোরেশনের ১৯টি খেলার মাঠ রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাতটি আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১২টি খেলার মাঠ চরম অবহেলায় পড়ে আছে। ডিএসসিসির ১২টি মাঠের মধ্যে মাত্র চারটিতে খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাতটি খেলার মাঠের অবস্থাও নাজুক। কোনো মাঠে ময়লা-আবর্জনায় ভরা তো কোনো মাঠে খেলার পরিবেশই নেই।

সিটি করপোরেশনের বার্ষিক বাজেট বই থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মাঠ রক্ষণাবেক্ষণে সংস্থা দুটির অর্থ বরাদ্দ একেবারেই থাকছে না। সম্প্রতি ডিএসসিসি এলাকার ১২টি খেলার মাঠ নিয়ে ‘জল সবুজের ঢাকা’ নামে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পে রয়েছে ২ দশমিক ৫০ একরের কলাবাগান মাঠ, ২ দশমিক ৫০ একরের বাসাবো মাঠ, ২ দশমিক ৮০ একরের গোলাপবাগ মাঠ, দশমিক ৩৩ একরের লালবাগের দেলোয়ার হোসেন মাঠ, আমলিগোলা মাঠ, শহীদনগর মিনি স্টেডিয়াম, বালুরঘাট মাঠ ও শহীদ আবদুল আলিম মাঠ। এ ছাড়া রয়েছে বাবুবাজারের রহমতগঞ্জ মাঠ, বংশালের সামসাবাদ মাঠ, রায়েরবাজার এলাকার বাংলাদেশ মাঠ, গোলাপবাগ খেলার মাঠ ও ধোলাইখালের সাদেক হোসেন খেলার মাঠ। এসব মাঠে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিএসসিসির এ উদ্যোগের ফলে এরই মধ্যে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঢাকায় খেলার মাঠ নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি জরিপ থেকে জানা যায়, রাজধানীর ৬০ শতাংশ নাগরিক নিকটবর্তী পার্ক ও খেলার মাঠে যান। আর ৩৯ শতাংশ যান না, বাকি ১ শতাংশ খেলার মাঠের তথ্যই জানেন না। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, বিশ্বের অন্য সব শহরের তুলনায় রাজধানীর খেলার মাঠের আয়তন ও নতুন করে সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আর যেগুলো আছে তা ভাড়া ও দখলমুক্ত করতে হবে। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শহরে বসবাসরত মানুষের ঘনত্ব বিবেচনা করে খেলার মাঠ থাকা উচিত। সেই তুলনায় আমাদের মাঠ খুব একটা নেই। তবে যেসব মাঠ রয়েছে ডিএসসিসি নতুন করে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।’ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর খেলার মাঠ নিয়ে জরিপের কাজ করেছে একটি বেসরকারি সংস্থা। ইনস্টিটিউট অব ওয়েল বিং ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট) নামের এ সংস্থাটির জরিপে উঠে এসেছে রাজধানীর খেলার মাঠ ব্যবহারকারীদের নানা তথ্য। বাসাবাড়ি থেকে কাছের পার্ক ও খেলার মাঠে না যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। ৩৯ শতাংশ মানুষ নিকটবর্তী পার্ক ও খেলার মাঠে না যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সেখানকার পরিবেশ। ৩৫ শতাংশ মনে করেন নিরাপত্তার অভাব, ৩৪ শতাংশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবকে চিহ্নিত করেছেন। এ ছাড়া পরিবেশের দুরবস্থা ৪১ শতাংশ, ছিনতাইয়ের ভয় ২৩ শতাংশ, হাঁটাপথের অভাব ১৬ শতাংশ, সড়কের দুরবস্থার কারণে প্রবেশগম্যতার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ১২ শতাংশ, খেলার মাঠের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব মনে করেন ৯ শতাংশ, খেলার জায়গার অভাব ৯ শতাংশ, পার্ক ও খেলার মাঠে প্রবেশগম্যতার সুযোগ না থাকা স্বাস্থ্যগত সক্ষমতার অভাব ৯ শতাংশ, ছাউনির অভাব (যেমন—রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য) ৭ শতাংশ, বেমানান ল্যান্ডস্কেপিং ৭ শতাংশ, পার্ক ও খেলার মাঠে প্রবেশগম্যতার সুযোগ না থাকায় ২ শতাংশ মানুষ যান না। সাধারণ জনমত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ৬০ শতাংশ নিকটবর্তী পার্ক এবং খেলার মাঠে গেছেন। আর ৩৯ শতাংশ যাননি এবং ১ শতাংশ জানেন না বলে অভিমত দেন।

জরিপে দেখা যায়, পার্ক ও খেলার মাঠে আসার ক্ষেত্রে ৭৩ শতাংশ হেঁটে আসে, ১১ শতাংশ রিকশায়, ৬ শতাংশ বাসে, মোটরগাড়ি, মোটরবাইক ও সাইকেলে করে ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য মাধ্যমে ১ শতাংশ। রাজধানীর ১২টি পার্ক ও খেলার মাঠের খেলাধুলার সুবিধাদির ধরন, সুবিধাগুলো ব্যবহারের উদ্দেশ্য, গুণগতমান, আলোর ব্যবস্থা ও ছায়ার উৎস সম্পর্কে পাওয়া যায় বিভিন্ন তথ্য। ১২টি পার্ক ও খেলার মাঠের মধ্যে চারটিতে খেলার জায়গা রয়েছে। প্রতিটি খেলার জায়গায়ই খেলার সুবিধা হিসেবে ফুটবল গোলবার দেখা গেছে। ১২টির মধ্যে সাতটি পার্ক ও খেলার মাঠে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। ছয়টি পার্ক ও খেলার মাঠে কর্মচারী আছে এবং ছয়টি পার্ক ও খেলার মাঠে বসার ব্যবস্থা ভালো। আটটি পার্ক ও খেলার মাঠে আবর্জনা দেখা গেছে। এর মধ্যে ছয়টিতে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য দেখা গেছে। ১১টি পার্ক ও খেলার মাঠেই আবর্জনার পাত্র রয়েছে, পাঁচটি পার্ক ও খেলার মাঠে শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। ১০টি পার্ক ও খেলার মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনা মূল্যে প্রবেশ করা যায়। শুধু উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর পার্ক ও গুলশান সোসাইটি লেক পার্ক সবার জন্য উন্মুক্ত না। পাঁচটি পার্ক ও খেলার মাঠে সবুজ পরিসর রয়েছে। ১০টিতে হাঁটার রাস্তা, ছয়টিতে শিশুদের খেলার জায়গা এবং চারটিতে খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। মিরপুর মাজার রোড ফুটবল খেলার মাঠ ছাড়া প্রতিটি পার্ক ও খেলার মাঠের দৃশ্য ও দুর্গন্ধের দিক থেকে মোটামুটি বলা যাবে। তবে সব পার্ক ও খেলার মাঠে কমবেশি পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে।

ঢাকার কিছুটা নাগরিকবান্ধব দুটি মাঠের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে মোটামুটি সন্তোষজনক। এদের মধ্যে একটি রায়েরবাজারের পশ্চিম ধানমণ্ডিতে অবস্থিত বৈশাখী খেলার মাঠ। মাঠটির উত্তরে আবুল কাশেম খান সড়ক, পূর্বে সুলতানগঞ্জ সড়ক, দক্ষিণে বৈশাখী সড়ক ও পশ্চিমে সাদেক খান সড়ক। এই খেলার মাঠটির চারপাশে আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প প্লট রয়েছে। বৈশাখী খেলার মাঠের ৪৪ শতাংশ খেলাধুলা কার্যক্রম, হাঁটা ও সাইকেল চালানো ২৭ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক কার্যক্রম ২৪ শতাংশ রয়েছে। বৈশাখী খেলার মাঠ খেলাধুলার জন্য ভালোভাবে ব্যবহৃত হয়। মাঠের সীমানা ঘেঁষে একটি বাধাহীন হুইলচেয়ারবান্ধব হাঁটার রাস্তা থাকলে মাঠে খেলতে থাকা ব্যক্তিরা বা হাঁটতে আসা মানুষদের জন্য কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। বাইসাইকেল পার্কিং অবকাঠামো সাইকেল চালকদের মাঠে আসতে এবং নিরাপদে সাইকেল রেখে মাঠ ব্যবহার করতে সহায়তা করে। আরেকটি হলো মিরপুরে অবস্থিত মিরপুর মাজার রোড ফুটবল খেলার মাঠ। এর উত্তরে বাতেননগর সড়ক ও পশ্চিমে মাজার রোড। তথ্য মতে, মিরপুর মাজার রোড ফুটবল খেলার মাঠে হাঁটা ও সাইকেল চালানো ২৯ শতাংশ, পেশাভিত্তিক কার্যক্রম ২২ শতাংশ, ব্যক্তিগত ও সামাজিক কার্যক্রম ২০ শতাংশ, পণ্য বিক্রি ১৫ শতাংশ এবং সব শেষে শরীরচর্চা ও খেলাধুলা ১৪ শতাংশ।

রাজধানীতে একসময় প্রতিটি ওয়ার্ডেই একাধিক খেলার মাঠ থাকলেও এখন অবস্থা একেবারেই নাজুক। শিশুর দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার চর্চা অত্যন্ত জরুরি। সে বিবেচনায় শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ থাকার কথা। অন্যদিকে আবাসিক এলাকার প্রতিটি সেক্টরে একটি খেলার মাঠ রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা করা ও সাধারণ মানুষের মুক্ত বায়ু সেবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কর্তৃপক্ষীয় নজরদারির অভাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যত দ্রুত সম্ভব খেলার মাঠ ও পার্ক বাড়াতে হবে। এ ছাড়া রাজধানীর খোলা জায়গা রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 



মন্তব্য