kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

স্বাধীন শিল্পী থেকে অধীন সেলাইকারীতে রূপান্তর

ঢাকার পোশাকশিল্পের বিবর্তন

আবুল হাসান রুবেল   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



স্বাধীন শিল্পী থেকে অধীন সেলাইকারীতে রূপান্তর

গার্মেন্ট খাত বৈশ্বিক শ্রমবিভাজনের অংশ। একে মুনাফা জোগাতে হয় বহু পক্ষের

কোনো কালেই শ্রমিকরা পরিপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন যাপন করতেন এমন নয়, সব সময়ই তাঁদের ওপর শোষণ-নির্যাতনের খড়্গ ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে তারা তাঁদের কাজের স্বাধীনতা, নিজস্বতা, আর বৈচিত্র্য হারিয়েছে নতুন করে। আর আমাদের শিল্প খাতও আন্তর্জাতিক পুঁজির হুকুমদারির অধীনস্থ হয়ে আমাদের জাতীয় বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে।

(গত সংখ্যার পর)

সাধারণভাবে শ্রমিক আন্দোলনে একটা ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়। সেটা স্থান ও কাল উভয় পরিপ্রেক্ষিতে। যেমন—ইউরোপের শ্রমিকরা আন্দোলনের মাধ্যমে দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের যে অধিকার আদায় করেছিলেন সেটা একটা সর্বজনীন রূপ পেয়েছে, প্রতিটি দেশেই শ্রমিকদের এই দাবি আদায়ে আর আলাদা আলাদা সংগ্রামের দরকার হওয়ার কথা নয়। আবার একটা নির্দিষ্ট দেশের শ্রমিকরাও বেশ কিছু দাবি আদায় করেন, যেগুলো তার পরবর্তী সময়ে রক্ষিত হওয়ার কথা। শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটি, সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, থাকার জায়গা ইত্যাদি যেমন এ দেশের শ্রমিকরা ষাট ও সত্তরের দশকে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আদায় করেছেন। তার ধারাবাহিকতাও পরবর্তী সময়ে রক্ষিত হওয়ার কথা। এর জন্য নতুন করে আন্দোলনের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ে গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলনগুলো দেখি, তাহলে দেখতে পাব ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরা এর চেয়েও আদিম ধরনের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে বাধ্য হচ্ছেন। কেন এ রকম হচ্ছে?

‘লেডি ইন মসলিন’ চিত্রকর্ম। শিল্পী ফ্রান্সিসকো রিনালদি। ঢাকা, ১৭৮৯ সাল

এর প্রধান কারণ হলো শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা রক্ষিত না হওয়া; বরং এই শিল্প খাত একটা ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে যাওয়া। যে প্রক্রিয়ার কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। আগে পাট খাতের মুনাফার বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিয়ে যেত। এখন গার্মেন্ট খাত নিজেই বৈশ্বিক শ্রমবিভাজনের অংশ। একে মুনাফা জোগাতে হয় বহু পক্ষের। দেশের মালিক, বায়ার, বিদেশের রাষ্ট্র, খুচরা বিক্রেতা এতসব পক্ষের মুনাফার জোগান দিতে গিয়ে তাদের জীবনের জেরবার অবস্থা। আর এই শিল্পের পরিস্থিতি ও শর্ত এমন যে সেখানে ওভারটাইম বাধ্যতামূলক। ফলে পাটকল শ্রমিকদের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ও সময় সে হারিয়েছে। আর যা হারিয়েছে সেটা হলো নিজস্বতা। পাটশিল্পে মসলিনের ব্যক্তিগত শৈল্পিক ভাবনার প্রকাশ ঘটানো হয়তো সম্ভব ছিল না। কিন্তু বৃহৎ উৎপাদনে নিয়োজিত সংগঠিত শ্রমের শৈল্পিক প্রকাশ, নানা গবেষণা ও নিজস্ব উৎকর্ষ লাভের তাগিদ ছিল। শুধু অর্ডারের ভিত্তিতে মাল সরবরাহের বাধ্যবাধকতা তাতে ছিল না। ছিল মাটির সঙ্গে তার সংযোগ। পাটশিল্পের সঙ্গে এখানকার চাষিদের যে সম্পর্ক ছিল, যেভাবে তা দেশজ অন্যান্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তা যে ধরনের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ দাবি করে এর ভেতর দিয়েই গোটা দেশে একটা জাতীয় জাগরণ সম্ভব ছিল। যেটা আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি হওয়া খাতগুলো দিতে পারছে না।

মসলিন বা মলমল ছাড়াও ঢাকার বিখ্যাত বস্ত্র জামদানি

এই নিজস্বতা ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার পোশাকশিল্পের ইতিহাসের আরেকটা বড় ক্ষতি এর বৈচিত্র্য ধ্বংস। ঢাকার মসলিনের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সেই মসলিন শুধু এক রকমের কাপড় নয় কিন্তু। তার আছে হরেক বাহারি বৈচিত্র্য। ঝুনা ছিল মাকড়সার জালের মতো দেখতে। পুরাঙ্গনা, নর্তকী ও গায়িকারা সাধারণত এটা পরতেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এই বস্ত্র পরতেন বলে প্রাচীন তিব্বতীয় গ্রন্থ ‘কুলভায়’ উল্লেখ আছে। ঝুনা মসলিনের মতোই সূক্ষ্ম কাপড় ছিল। খুবই নিবিড়ভাবে যুক্ত সুতা দিয়ে তৈরি কোমল বস্ত্র ছিল সরকার আলি। এটি বাংলার নবাবরা পরতেন ও দিল্লির সম্রাটকে পাঠাতেন উপহার হিসেবে। ছিল খাসা মলমল নামের সুদৃশ্য বস্ত্র। সবনম ছিল স্বচ্ছ ও সূক্ষ্ম বস্ত্র, যার নামের অর্থ সান্ধ্য শিশির। একবার নাকি নবাব আলীবর্দী খাঁ এ রকম একটা কাপড় ঘাসের ওপর রেখে দিয়েছিলেন আর গরু সেটা ঘাস থেকে আলাদা করতে না পেরে সেটাসুদ্ধ খেয়ে ফেলেছিল। আবরোয়ান নামের অর্থ প্রবাহিত নির্মল সলীল। কথিত আছে, সাত স্তর পুরু এই কাপড় পরে সম্রাট আওরঙ্গজেবের কন্যা তাঁর সামনে উপস্থিত হলে তিনি তাঁকে আবরণহীনা বলে তিরস্কার করেন। যাহোক, এর প্রত্যেকটি ধরন সম্পর্কে একটি করে বাক্য লিখতে গেলেও এখানে স্থান সংকুলান হবে না। কাজেই কয়েকটির শুধু নাম উল্লেখ করছি। মলমলের প্রকারের ভেতর আরো ছিল আলা বাল্লে, তজেব, তরন্দাম, নয়নসুক, বদনখাস, সরবন্দ, সরবতি, ডুরিয়া, কুমিস, চারখানা ইত্যাদি। সবশেষে যে চারখানার কথা উল্লেখ করলাম তাও আবার ছয় ধরনের হয়—নন্দন শাহি, আনার দানা, কবুতর খোঁপা, সাকুতা, বাছাদার, কুণ্ডিদার।

মসলিন বা মলমল ছাড়াও ঢাকার বিখ্যাত বস্ত্র জামদানি। ফুল ও কারুকার্য শোভিত বস্ত্র জামদানি। আওরঙ্গজেব জামদানি বিশেষ পছন্দ করতেন বলে জানা যায়। জামদানিও আছে অনেক ধরনের—তোড়াদার, কারেলা, বুটিদার, তেরছা, জলবার, পান্নাহাজার, মেল, দুবলিজাল, ছাওয়াল, বালআর, ডুরিয়া, গেদা, সাবুরগা ইত্যাদি। ঢাকা শহর ছাড়াও ডেমরা, ধামরাই, কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় জামদানি তৈরি হয় বহুকাল ধরে।

সবশেষে মলমল খাসের কথা না বললে বলাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। দিল্লির সম্রাটদের জন্য এই পোশাক বানানো হতো। এটা এতই সূক্ষ্ম যে একটা আংটির ভেতর দিয়ে এ পাশ থেকে ও পাশে টেনে নিয়ে যাওয়া যেত। ১০ গজ দৈর্ঘ্য ও এক গজ প্রস্থের একখণ্ড কাপড়ের ওজন হতো আট তোলা ছয় আনা অর্থাৎ ১০০ গ্রামের কাছাকাছি।

ঢাকায় এগুলোর পাশাপাশি ছিল আরো নানা রকম শিল্প। তার ভেতরে ছিল শঙ্খশিল্প, দেশি সাবান, সোনা-রুপার কারুকার্য, ডোকের সাজ, লোহার কারখানা, তামা, পিতল ও কাঁসার পাত্র, টিনের বাক্স, হাতির দাঁতের তৈরি জিনিসপত্র, কাচের চুড়ি, শৃঙ্গের কারখানা, দেশি কাগজ, মোজা ও গেঞ্জির কারখানা, ইট-সুরকির কল, ঝিনুকের দ্রব্যাদি, মৃিশল্প, বেতের তৈরি জিনিসপত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ প্রাচীনকাল থেকেই ঢাকা ছিল শিল্পে সমৃদ্ধ নগরী। কোনো কালেই শ্রমিকরা পরিপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন যাপন করতেন এমন নয়, সব সময়ই তাঁদের ওপর শোষণ-নির্যাতনের খড়্গ ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে তারা তাঁদের কাজের স্বাধীনতা, নিজস্বতা, আর বৈচিত্র্য হারিয়েছে নতুন করে। আর আমাদের শিল্প খাতও আন্তর্জাতিক পুঁজির হুকুমদারির অধীনস্থ হয়ে আমাদের জাতীয় বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে।



মন্তব্য