kalerkantho


দখলদারদের কবলে ফুটপাত দুর্ভোগে এলাকাবাসী

মো. হারুন অর রশীদ   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দখলদারদের কবলে ফুটপাত দুর্ভোগে এলাকাবাসী

‘ইসিবি চত্বরের পাশেই আমার বাসা। চত্বরের এই সুন্দর প্রশস্ত সড়কটির ফুটপাত আমরা অবাধে ব্যবহার করতে পারি না। কারণ অবৈধভাবে দখল করে ফুটপাতজুড়ে নানা রকমের দোকানপাট খোলা হয়েছে। কোথাও নির্মাণসামগ্রী রেখে ফুটপাতসহ রাস্তা পর্যন্ত দখল করে রাখা হয়েছে। নির্মাণ আইনে এসব বিষয়ে সতর্ক করা হলেও কেউ মানছে না। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের সড়কের মাঝ দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। আবার ইসিবি চত্বরে সিটি করপোরেশন এলোমেলোভাবে ড্রাম রেখেছে, ফলে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে সময়মতো ময়লা আপসারণ না করায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পথচারীদের চলাচল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। মাসের পর মাস এ অবস্থায় থাকলেও কেউ যেন দেখার নেই।’ ইসিবি চত্বর সড়কের ফুটপাত দখল প্রসঙ্গে এভাবেই বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাসরিন জাহান।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের জিল্লুর রহমান উড়াল সেতু থেকে ইসিবি চত্বর হয়ে মিরপুর কালশী, পূরবী, পল্লবী ও মিরপুর ডিওএইচএস হয়ে ১২ নম্বর সেকশন ও ক্যান্টনমেন্ট রোডে গিয়ে সড়কটি সংযোগ স্থাপন করেছে। এই সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনবহুল। একসময় মিরপুর ১২ নম্বর থেকে মহাখালী, বনানী, গুলশান, এয়ারপোর্ট, উত্তরা-গাজীপুর যেতে হলে দু-তিন ঘণ্টা সময় লেগে যেত। এই সড়কটিতে উড়াল সেতু নির্মাণ হওয়ার কারণে ১৫ থেকে ২০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছা যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উড়াল সেতু পার হয়েই ইসিবি চত্বর পর্যন্ত দুই ধারের ফুটপাত দৃশ্যমান। কিন্তু চত্বরের পর থেকে ফুটপাতের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। চত্বরের বাসস্ট্যান্ডে সড়ক দখল করে ময়লার ড্রাম রেখেছে সিটি করপোরেশন। ময়লার দুর্গন্ধে পথচারীরা অতিষ্ঠ। তার ওপর সড়কের ফুটপাত দখল করে বিল্ডার্স কম্পানি গৃহনির্মাণসামগ্রী রেখেছে। রাস্তার উভয় পাশের ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে গাড়ির গ্যারেজসহ নানা ধরনের দোকানপাট। রাস্তার বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. বাহার উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার পথচারী এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু সড়কের উভয় পাশে অবৈধভাবে গড়ে তোলা দোকানপাট, নির্মাণসামগ্রী ও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের ফলে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। আর এ সমস্যা নিত্যদিনের হলেও সমাধানে কারো কোনো উদ্যোগ নেই। আপনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাই।’

বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আল আমীন বলেন, “আমরা আজ মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশ, ডিজিটাল দেশ হিসেবে দাবি করি। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা কি তা-ই? একটি গণতান্ত্রিক উন্নত রাষ্ট্র গঠনে আমি মনে করি, সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতি দমন, সন্ত্রাসী, দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা। স্থিতিশীল সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। আমরা কিন্তু তা পারিনি। এ এলাকার বেশির ভাগ ফুটপাত ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দখল করে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখেও না দেখার ভান করে চলে। এসব ‘মগের মুল্লুক’ পরিস্থিতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সাধারণ জনগণের জন্য কাজ করতে হবে প্রতিটি সরকারকে।”

ফুটপাত দখল করে ইটের খোয়ার ব্যবসা করছেন নুর মিয়া। তাঁর কাছে দখল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। ইট কিনে এনে, খোয়া তৈরি করে বিক্রি করি। এই ছোট্ট ব্যবসা দিয়েই আমার সংসার চলে। বড় বড় কম্পানি তো ইট, বালু, পাথর ও রড দিয়ে পুরো রাস্তা দখল করে আছে। তাদের কোনো দোষ হয় না। সব দোষ গরিবের। যদি সরকার তুলে দেয়, তাহলে উঠে যাব।’ আরেক দখলদার চা দোকানি শরিফ মিয়া বলেন, ‘আমি স্থানীয় নেতা খোকনের কাছ থেকে ভাড়া নিছি। মাসে এক হাজার টাকা ভাড়া দিই। আবার পুলিশকেও প্রতিদিন ৫০ টাকা করে দিতে হয়।’ দখলদার খোকনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি দোকানের মালিকানা অস্বীকার করে বলেন, ‘ওই দোকান আমার না। আমি কোনো দোকান ভাড়া দিইনি।’ এই বলে লাইন কেটে দেন তিনি। এরপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সালেক মোল্লা বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য আমি প্রতিনিয়ত কাজ করছি। এই সড়কে কিছুদিন পর পর উচ্ছেদ অভিযান চালাই এবং ইসিবি চত্বরের আশপাশে যেসব বিল্ডার্স কম্পানি নির্মাণকাজ করছে, তাদের কয়েকবার নোটিশ দিয়েছি, তারা যেন সড়ক ও ফুটপাত দখল করে নির্মাণসামগ্রী না রাখে।’ আপনার দলের নেতারা ফুটপাত দখল করে দোকান তুলে ভাড়া দিচ্ছেন, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা আমার দলের কেউ না। আমার দলের কোনো নেতাকর্মী চাঁদাবাজি ও দখলবাজির সঙ্গে জড়িত নয়। আমি তাদের চিনি না। তার পরও আমি তদন্ত করে দেখব ওই দখলদার কারা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ রাস্তার মধ্যে ময়লার ড্রাম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সরেজমিনে গিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তা ছাড়া মানিকদি কবরস্থানের সামনে ময়লার গাড়ি ও ড্রাম রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করি, খুব শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান করতে পারব।’

 



মন্তব্য