kalerkantho


গুলশান-বনানী-বারিধারার লেক বাঁচাবে আরেক ‘হাতিরঝিল’

রাতিব রিয়ান   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গুলশান-বনানী-বারিধারার লেক বাঁচাবে আরেক ‘হাতিরঝিল’

একটি নিরিবিলি বিকেল। আলোয় ঝলমল এলাকা, জলতরঙ্গে বাহারি আলোর বিচ্ছুরণ। রাজধানীর কোলাহল ভুলে ক্ষণিক নির্জনতা, কিছুটা আনন্দমুখর আড্ডা। এ রকম পরিবেশের জন্য নগরবাসীর অনেকের কাছে পরিচিত হাতিরঝিল লেক। যানজট আর ধূলিদূষণের এই শহরে অনেকেই হাতিরঝিল লেকে এসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। সেই পথ ধরেই গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকার লেকদূষণ, দখল রোধে ও লেকের সৌন্দর্য রক্ষায় এগিয়ে চলছে আরেক ‘হাতিরঝিল’ প্রকল্পের কাজ। বিশাল এ এলাকায় কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে চলছে নির্মাণকাজ। লেক খননের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩১৪ কোটি টাকা। ৪১০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বাকি টাকা অন্যান্য কাজে ব্যয় করা হবে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২১ সালের মধ্যে শেষ করা হবে। এরই মধ্যে প্রকল্পের খননকাজ ও অন্যান্য প্রস্তুতি প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লেক সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলযান চলাচলের জন্য এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। হাতিরঝিল যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, অনেকটা সেভাবেই এই প্রকল্প করা হবে। আর এটি হবে রাজধানী ঢাকাবাসাীর জন্য দ্বিতীয় উপহার।

লেক উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক আমিনুর রহমান সুমন বলেন, ‘ঢাকার জলাধারগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। সেগুলো দখলমুক্ত করার পাশাপাশি এগুলোর পরিবেশ সুরক্ষা করা হবে। সব ময়লা পানি, ওয়াসার বর্জ্য এসে পড়ে লেকে। এসব থেকে লেকগুলো রক্ষা করতেই সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।’

এ প্রকল্পের আওতায় তিনটি লেক খনন করা হবে। লেকের পার দিয়ে একমুখী সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে থাকবে আলাদা দুটি সড়ক ও ৯টি ব্রিজ। লেকের পার দিয়ে একমুখী সড়কও নির্মাণ করা হবে। তিনটি লেকের প্রথমটি নিকেতনের পুলিশ কনভেনশন সেন্টারের পেছন থেকে শুরু হয়ে বাড্ডা-শাহজাদপুর দিয়ে বারিধারায় অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় শাখাটি নিকেতন থেকে শুরু করে গুলশান, গাউসুল আজম মসজিদের পাশ ঘেঁষে বনানী কবরস্থান পর্যন্ত। তৃতীয় শাখা নিকেতন থেকে শুরু করে গুলশান, কড়াইল বস্তির ভেতর দিয়ে বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি পর্যন্ত। নিকেতন থেকে বনানী কবরস্থান পর্যন্ত দ্বিতীয় লেকটির কাজ চলছে এখন। কাকলী থেকে গুলশনা-২ নম্বর যাওয়ার পথের ব্রিজ এলাকার একটি অংশের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

এ প্রকল্পের দুটি রাস্তার একটি হচ্ছে শুটিং ক্লাবের পেছন থেকে শুরু করে মরিয়ম টাওয়ার দিয়ে ভারতীয় দূতাবাস পর্যন্ত যে রাস্তার কাজ চলছে, সেটি। দ্বিতীয় সড়কটি গুলশান-১ থেকে শুরু করে কড়াইল বস্তি হয়ে বনানী ১১ নম্বর পর্যন্ত করা হবে। রাজউক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও এর ব্যবস্থাপনায় থাকবে এ এলাকার বিভিন্ন সোসাইটি। সে ক্ষেত্রে গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, নিকেতন সোসাইটির সঙ্গে চুক্তি করবে রাজউক। সোসাইটিগুলো নিজেদের দায়িত্বে নিরাপত্তা প্রহরী রাখবে, প্রতিদিন ঝাড়ু দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। এখান থেকে বিভিন্ন খাতে যে আয় আসবে, তা দিয়েই ব্যয় সংকুলান করা

হবে।

প্রকল্পের সুবিধা সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রকল্পের কাজ করছি। ওয়াসার স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রকল্পে স্যুয়ারেজের আলাদা প্ল্যান করার পরিকল্পনা রয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, কারওয়ান বাজার, রামপুরা, হাতিরঝিল এলাকাজুড়ে নেওয়া এ প্রকল্পের লাইন যখন সম্পন্ন হবে, তখন আলাদা করে স্যুয়ারেজ বাইরে ফেলার প্রয়োজন পড়বে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘ময়লা পানি লেকে ফেলতে দেওয়া হবে না। তবে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারবে। বৃষ্টির পানি পরিশোধনের মাধ্যমে আমরা লেকে ফেলব। বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি, বনানী গোরস্তান ও ইউনাইটেড হাসপাতাল—এই তিনটি স্থান দিয়ে বৃষ্টির পানি শোধন করে লেকে ফেলা হবে। এ ছাড়া লেক দিয়ে জলযান চলাচল করতে পারবে। ফলে যানজট এড়িয়ে অনেকেই এসব জলযান ব্যবহার করে তাদের গন্তব্যে যেতে পারবে। জলযান চালু করতে তিনটি লেকে প্রায় ৯টি ব্রিজ করা হবে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ব্রিজও থাকবে।’

বনানীর ১৭ নম্বর রোডের বাসিন্দা আকমল মাসুম বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে জলাবদ্ধতা ঢাকার সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি। এ ছাড়া ডোবা, বিল, খালের দখলদারি তো রয়েছেই। গুলশান-বনানীর এ লেকগুলো পরিকল্পনামতো ব্যবহার করা হলে জলাবদ্ধতা একসময় থাকবে না। এ ছাড়া দৃষ্টিনন্দন লেকগুলো নগরবাসীর বিনোদনের চাহিদা পূরণ করবে। এই উন্নয়ন প্রকল্পকে স্বাগত জানাই। এটি হাতিরঝিলের মতো আরেকটি হাতিরঝিল হয়ে উঠবে।’

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় ঠিকাদারি কম্পানির দায়িত্বরত তানজিল আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এরই মধ্যে খননকাজ এগিয়েছে। কিছু মাটি লেক থেকে তুলে পারে রাখা হয়েছে। সেগুলো শুকিয়ে গেলে ওয়াকওয়ে বানানো হবে। আর বর্ধিত মাটি রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় রাতের বেলা ফেলে আসা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নিকেতন থেকে বনানী কবরস্থান পর্যন্ত দ্বিতীয় লেকটির কাজ বর্তমানে চলছে। আশা করি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমাদের কাজ শেষ হবে।’



মন্তব্য