kalerkantho


দখল ও দূষণে বিপন্ন প্যারিস খাল

মো. হারুন অর রশিদ   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দখল ও দূষণে বিপন্ন প্যারিস খাল

একসময়ের প্রশস্ত ও খরস্রোতা প্যারিস খালটি কালের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে মৃতপ্রায় খালে। খালে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বাড়ি ও দোকানপাট। মৃতপ্রায় খালটির যতটুকুই টিকে রয়েছে, তা-ও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দখলদারদের কবলে। স্থানীয় জনগণ আশঙ্কা প্রকাশ করছে, যেকোনো সময় বাকিটুকুও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে এই খালটি অবস্থিত। এই খালটি বাউনিয়া খালের একটি অংশ। এটি বাইশটেকি ও প্যারিস রোড, এভিনিউ-৫ হয়ে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের মধ্য দিয়ে রূপনগর খালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ওই এলাকার সাংবাদিক প্লট খাল, ভাসানটেক খাল ও বাইশটেকি খালের প্রবাহ এই খালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই ওই এলাকার সব স্যুয়ারেজের পানি নিষ্কাশন এই খাল দিয়েই হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, খালটি ২০-২৫ ফুট থাকার কথা; কিন্তু সরেজমিনে খালটি পাঁচ-সাত ফুট আবার কোথাও কোথাও দুই-তিন ফুট পাওয়া গেছে। আর যেটুকু আছে, তার পানিও নোংরা ও দুর্গন্ধময়। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় এই খালের প্রশস্ততা ছিল বিশাল। এটি বাউনিয়া খালের একটি শাখা খাল। এই খাল দিয়ে একসময় বড় বড় ব্যবসায়িক নৌকা চলাচল করত, জেলেরা এই খাল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু আজ সেই খালটি সরু ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় দেখেছি, যেমন ছিল এই খালটির প্রশস্ততা, তেমনি ছিল গভীরতাও। বছরজুড়েই পানিতে টইটম্বুর থাকত। আজ চোখের সামনে পর্যায়ক্রমে দখলের কারণে খালটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এলাকার বর্ষার পানি এই খাল দিয়ে নিষ্কাশন হয়। খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা কমে যাওয়ায় এর পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। তাই বর্ষা হলেই ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি উপচে এলাকা প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। বর্ষার পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যায়, তখন যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। আর দুর্গন্ধ ও ময়লা পানির কারণে এলাকায় দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগ। এই খাল থেকে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে ওই এলাকার বায়ুদূষণ হচ্ছে। কিন্তু এসব কেউ যেন দেখার নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এভিনিউ-৫ এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা ধীরে ধীরে খাল ভরাট করে দোকানপাট তুলে ভাড়া দিচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের হওয়ায় কেউ কিছু বলতে পারে না।’ খালের জায়গা দখল করে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাসরত আউয়াল বলেন, ‘এই বাড়ি আমি ভাড়া নিয়েছি। বাড়িটি খালের জায়গার মধ্যে পড়েছে কি না, তা আমি বলতে পারব না।’ কার কাছ থেকে ও কত টাকায় ভাড়ায় নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বাড়ির মালিকের নাম আবুল কালাম আজাদ। তিনি স্থানীয় যুবলীগ নেতা। আমি মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিই।’ বাড়ির মালিক আবুল কালাম আজাদের কাছে খালের জায়গা দখল করে বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো জায়গা দখল করিনি; বরং আমার জায়গা খালের ভেতরে চলে গেছে।’ এই বলে তিনি এ প্রসঙ্গে আর কথা বলতে আপত্তি জানান। খালের পার দখল করে দেওয়া ভাঙ্গারি দোকান মালিক মিজান মিয়া বলেন, ‘এক বছর ধরে আমি এখানে দোকান দিয়ে ব্যবসা করছি। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালালেও এখন টাকা দিলে আর সমস্যা হয় না।’

স্থানীয় বাসিন্দা নাছিম বলেন, ‘এই খাল বর্ষা মৌসুমে এলাকার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, খালটি বিভিন্নভাবে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের ড্রামে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন মহলের দখলের কারণে দিন দিন খালটির প্রশস্ততা কমছে। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে খালটির এই দুর্দশা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খালটি দূষণমুক্ত ও পুনর্খনন করে উদ্ধার না করলে শিগিগরই বিলীন হয়ে যাবে।’ দখলদার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নানা সময় প্রভাবশালীরা এই খাল দখল করেছে। আবার রাইজিং গ্রুপ নামের একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান খালের বেশ খানিকটা অংশ দখল করে স্থায়ীভাবে স্থাপনা বানিয়েছে। এগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড দেখেও না দেখার ভান করে।’ রাইজিং গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চাইলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। কর্তব্যরত সিকিউরিটি গার্ড করিম মিয়া বলেন, ‘দখলের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্যারদের কোনো নম্বরও আমার কাছে নাই।’

ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন বলেন, ‘রাজধানীর প্রতিটি খাল সুরক্ষায় আমরা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করে থাকি। খাল দখলমুক্ত রাখতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় দখলমুক্ত করার পর আবার দখল হয়ে যায়। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ওই সব দখলদার আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারদলীয় নেতা, স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ যদি আমাদের সহযোগিতা করে তবেই সম্ভব খালগুলো পরিপূর্ণভাবে দখলমুক্ত রাখা।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ওসমান গনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ঢাকা উত্তরের প্রতিটি খাল, সড়ক ও ফুটপাত দখল প্রসঙ্গে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, উনি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তাঁর দেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর। যদিও কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছি, তবু পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা উত্তরের সড়ক, ফুটপাত ও খাল দখলদারদের উচ্ছেদ করে দখলমুক্ত করব এবং একটি পরিচ্ছন্ন শহরে পরিণত করব।’

এ বিষয়ে ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘এই খালের অস্তিত্ব একেবারে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। আমি আবার খালটি খনন করে এর প্রবাহ ঠিক রেখেছি।’ দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে যারা দখলদার আছে, তারা ভূমিহীন ও অসহায় জনগোষ্ঠী। শিগিগরই দখলদারদের পুনর্বাসন করে খালটি পুনর্খনন করে একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। এ ছাড়া ওই এলাকায় যে কয়টি খাল আছে, প্রতিটি খালের দুই ধার দখলমুক্ত করে বনায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আমি জনগণের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছি। এলাকার প্রতিটি সড়ক, যা একসময় পর্যাপ্ত প্রশস্ত ছিল না, সেগুলো ৭০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করেছি। শুধু তা-ই নয়, যেকোনো কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য আমরা ডেসকো, ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে কাজ করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই সড়ক, স্যুয়ারেজ ড্রেন ও ডেসকোর কাজ তদারকির জন্য নিয়মিত লোক নিয়োগ করা হয়েছে। যখনই কোনো বিষয়ে সমস্যা দেখা যায়, দ্রুত তার সমাধান করা হয়।’

 



মন্তব্য