kalerkantho


ঢাকা ও তার উপকণ্ঠের পর্যটনশিল্প

অবহেলায় নিপতিত পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বিকাশের রয়েছে সমূহ সম্ভাবনা। তা সত্ত্বেও নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এ শিল্পকে একটি সফল শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এ খাত থেকে বিপুল কর্মসংস্থান ও অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা থাকলেও বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত। এ শিল্পের বিরাজমান পরিস্থিতিতে ঢাকা ও এর উপকণ্ঠের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও অন্তরায় নিয়ে লিখেছেন মো. মনির হোসেন

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অবহেলায় নিপতিত পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা

আহসান মঞ্জিল

নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিদ্যমান পর্যটন খাতে যে বিচিত্রতা রয়েছে, তাতে সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। অন্যদিকে ঐতিহ্যের শহর ও সংস্কৃতির শহর ঢাকা। ঢাকার উপকণ্ঠও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এখানে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রাজধানী ঢাকার চারদিকে রয়েছে চারটি নদী—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু। ঢাকার চারপাশ ঘিরে রয়েছে পাঁচটি জেলা। ঢাকার পশ্চিমে মানিকগঞ্জ, পূর্বে নরসিংদী, দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ, উত্তরে গাজীপুর ও দক্ষিণ-পূর্ব কোণে নারায়ণগঞ্জ। এখানে বেড়ানোর জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় অনেক জায়গা। বুড়িগঙ্গা নদীর পার ঘেঁষে কুমারটুলি এলাকায় আহসান মঞ্জিলের অবস্থান। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় শেখ ইনায়েত উল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে রংমহল নামের একটি প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেন। পরে বিভিন্ন হাত ঘুরে তা নওয়াব আব্দুল গনির হাতে আসে। তিনি ভবনটিকে পুনর্নির্মাণ করেন। নিজের ছেলে খাজা আহসান উল্লাহর নামে ভবনটির নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মোগল আমলের স্থাপত্যকীর্তি লালবাগের কেল্লা। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মোহাম্মদ আজমের সময়ে নির্মিত। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে লালবাগ মহল্লায় এর অবস্থান।

লালবাগ কেল্লা থেকে ৩০০ মিটার উত্তর-পূর্বে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের অবস্থান। ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির এটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে রয়েছে অনন্য স্থাপত্য ‘কার্জন হল’। ১৯০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল জর্জ কার্জন এ ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি লুইকান বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা করেন। তাঁর নকশা অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলানগরে ২০৮ একর জমির ওপর নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবন এ উপমহাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। ১৭ শতকে সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপন করলে রাজধানী ঢাকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে বেশ কিছু কামান তৈরি করা হয়। এসব কামানের মধ্যে ‘কালে খাঁ জমজম’ ও ‘বিবি মরিয়ম’ বিশালত্বে, নির্মাণশৈলীতে ও সৌন্দর্যে ভারতখ্যাত হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিবি মরিয়ম কামান ওসমানী উদ্যানের প্রধান ফটকের পেছনে রয়েছে।

পানাম নগর

রূপলাল হাউস ঊনবিংশ শতকে নির্মিত একটি ভবন। এটি পুরনো ঢাকা এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর পারে ফরাশগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। ভবনটি নির্মাণ করেন হিন্দু ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয় রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস। দ্বিতল এই ভবনের স্থাপত্যশৈলী অভিনব। ভবনটিতে ৫০টির বেশি কক্ষ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই রয়েছে তিন নেতার সমাধি। যা তিন নেতার মাজার হিসেবেও পরিচিত। ঢাকার রায়ের বাজার ইটখোলায় রয়েছে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। এক নম্বর মিরপুর এলাকায় গাবতলী মাজার সড়কের পশ্চিমে রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। এ ছাড়া জাতীয় জাদুঘর, পোস্টাল জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, প্রাণী জাদুঘর, সামরিক জাদুঘরসহ ঢাকা শহরজুড়ে প্রায় অর্ধশত জাদুঘর রয়েছে।

পুরান ঢাকার আরমানীটোলায় একসময় বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয়ের বসবাস ছিল। আর্মেনীয়দের বসবাসের কারণেই ওই এলাকার নামকরণ হয় আরমানীটোলা। এখানে রয়েছে আর্মেনীয়দের নির্মিত একটি গির্জা। আর এর নামকরণ হয় আর্মেনীয় গির্জা। পুরনো ঢাকার সদরঘাটের সন্নিকটে রয়েছে ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক। বলধা গার্ডেন নামে ওয়ারিতে রয়েছে একটি উদ্ভিদ উদ্যান। ঢাকায় আরো রয়েছে বড়কাটরা, ছোটকাটরা, নিমতলীর কুঠিবাড়ি, রোজ গার্ডেন, লালকুঠি, তারা মসজিদ, সাতগম্বুজ মসজিদ, হোসেনি দালান, ভাসানি নভোথিয়েটার, বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক, ধানমণ্ডি লেক, গুলশান লেক পার্ক, হাতিরঝিল, টগী ওয়ার্ল্ড, শিশু পার্ক, শ্যামলী শিশু মেলা, চিড়িয়াখানা, জিনজিরা প্রাসাদ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী

ঢাকার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো পর্যটনের এত কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও এগুলোকে আমরা পর্যটনপণ্য  হিসেবে দেশে ও দেশের বাইরে তুলে ধরতে পারিনি। বলতে গেলে ঢাকাকে সঠিকভাবে সাজাতে পারিনি ও ব্র্যান্ডিং করতে পারিনি। ঢাকার পর্যটনের কেন এ রকম দৈন্য—জানতে চাইলে এ বিষয়ে বেঙ্গল ট্যুরসের নির্বাহী পরিচালক মাসুদ হোসেন বলেন, ‘পর্যটনের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দেওয়া ও অগ্রাধিকার না দেওয়া প্রধান কারণ। ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো পর্যটনপণ্যকে কিভাবে অলংকরণ করতে হয়, সে বিষয়গুলো আমাদের পর্যটন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাথায়ই আসে না। নেই পর্যাপ্ত অর্থায়নও। পর্যটনশিল্পের বিকাশে কাজ করে অন্তত ১০টি মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যেও নেই কোনো সমন্বয়। গত ৪৭ বছরে করা যায়নি পর্যটনের একটি ডাটা বেইস। দেশে একটি ভালো পর্যটননীতি থাকলেও পর্যটন আইন করতে না পারাটা দুর্ভাগ্যজনক। আইন থাকলে রিসোর্ট, হোটেল, ট্যুর অপারেটর—সবাইকে নিয়মের মধ্যে এনে পরিচালনা সহজ হতো। দেশে নৌ-পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পর্যটকবাহী জাহাজ কিভাবে চলবে, সে ব্যাপারে কিছু বলা নেই। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণকারী ট্যুর অপারেটরদের নেই কোনো মর্যাদা, নেই কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এমনকি নেই কোনো নিয়ন্ত্রণও। ট্যুর অপারেটরদের মুদির দোকানের মতো ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। নেই কোনো নিবন্ধন অথরিটি। এ থেকেই বোঝা যায়, পর্যটনশিল্প কতটা অবহেলায় আছে। আর অবহেলার মধ্য দিয়ে কোনো কিছুর সুন্দর বিকাশ হতে পারে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড একটি রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’

তিন নেতার সমাধিস্থল

ট্যুরিজম অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-টোয়াবের পরিচালক (অর্থ) আবুল কালাম আযাদ বলেন, ‘২০১০ সালে দেশের পর্যটনশিল্প এবং সেবার মান উন্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড (বিটিবি) আইন প্রণীত হয়। সে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটছে না। পর্যটন বোর্ড কিছু ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ফেয়ার ও সিম্পোজিয়াম করে থাকে। এতে টোয়াব ও ইনবাউন্ড অ্যাসোসিয়েশনকে ডাকা হয় না। বোর্ড এখনো সর্বজনীন হতে পারেনি। দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে যা জরুরি ছিল।’

ঢাকার উপকণ্ঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা গাজীপুর। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে বর্ণিল এ জেলাটি প্রত্নসম্পদ ও দর্শনীয় স্থানে ভরপুর। রাজধানী ঢাকা জেলার সঙ্গে লাগোয়া গাজীপুর জেলার দর্শনীয় স্থান ও প্রত্নসম্পদের মধ্যে ভাওয়াল রাজবাড়ি, রাজবাগান, ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী, বলধার জমিদারবাড়ি, প্রাচীন রাজধানী ইন্দ্রকপুর, বলিয়াদী জমিদারবাড়ি, কাশিমপুর জমিদারবাড়ি, সেন্ট নিকোলাস চার্চ, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, জাগ্রত চৌরঙ্গী, অনুপ্রেরণা ’৭১ ও ধাঁধার চর উল্লেখযোগ্য।  নরসিংদী বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ তাঁতশিল্প জেলা। নরসিংদী জেলার দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনার উয়ারি-বটেশ্বর, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, আশ্রাবপুর মসজিদ, বেলাব বাজার জামে মসজিদ, গিরীশচন্দ্র সেনের ভিটা, জমিদার লক্ষণ সাহার বাড়ি, শাহ ইরানি মাজার, দেওয়ান শরীফ মসজিদ খুবই পরিচিত। তা ছাড়া লটকনের জন্যও নরসিংদী বিখ্যাত।

নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পানাম নগর, লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি, জামদানি পল্লী, হাজীগঞ্জ জলদুর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ, বিবি মরিয়ম মসজিদ ও সমাধি, কদম রসুল দরগা, বারদী লোকনাথ আশ্রম, বন্দর শাহী মসজিদ, গোয়ালদি হোসেন শাহ মসজিদ, গিয়াশউদ্দিন আজম শাহর সমাধি, সাতগ্রাম জমিদারবাড়ি ও লাঙ্গলবন্দ—যা পুণ্যস্নানের জন্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান।

মানিকগঞ্জে রয়েছে বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, তেওতা জমিদারবাড়ি, তেওতা নবরত্ন মঠ, মানিকগঞ্জের মত্তের মঠ, রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম, শিব সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, মানিকগঞ্জের শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি, মানিকগঞ্জের গৌরাঙ্গ মঠ, নারায়ণ সাধুর আশ্রম, মাচাইন গ্রামের ঐতিহাসিক মাজার ও পুরনো মসজিদ, কবিরাজবাড়ি, বাঠইমুড়ী মাজার। খ্রিস্টীয় ১০ শতকের শুরু থেকে ১৩ শতকের প্রথম পর্যন্ত চন্দ্র, বর্মণ ও সেন রাজাদের রাজধানী ছিল মুন্সীগঞ্জ। সেই সুবাদে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। জগদীশচন্দ্র বসু ও অতীশ দীপঙ্করের জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জে রাজা শ্রীনাথের বাড়ি, বাবা আদমের মসজিদ, হাসারার দরগা, সোনারং জোড়া মন্দির, পদ্মার চর, ইদ্রাকপুর কেল্লা, রাজা বল্লাল সেন ও হরিশচন্দ্রের দিঘি, শ্যামসিদ্ধির মঠ ও শুলপুরের গির্জা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ঢাকার উপকণ্ঠের জেলাগুলোতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অনেক রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্র। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে গাজীপুর জেলা। নীতিমালা ছাড়াই চলছে এসব রিসোর্ট। দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন থাকলেও পর্যটন রিসোর্ট পরিচালনায় আইন নেই। রিসোর্টগুলো পরিচালিত হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে। নীতিমালা হলে সরকার এ খাত থেকে আরো বেশি রাজস্ব পাবে। এ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, অবস্থানগত কারণে রাজধানী ঢাকা ও এর উপকণ্ঠের জেলাগুলোতে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও নানা কারণে এখানকার পর্যটন কাঙ্ক্ষিত বিকাশ লাভ করেনি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এবং টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ ও সফল শিল্প হিসেবে পর্যটনশিল্প বিকাশের বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যা আয়ের অন্যতম খাত হিসেবে পরিগণিত হবে। শুধু তা-ই নয়, এই শিল্প ও শিল্পসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে হাজার হাজার বেকার যুবকের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরকারেরও বিপুল অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি হবে এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে।

 

পর্যটনপণ্যের বিপণনকৌশলের অপর্যাপ্ততা

ড. সন্তোষ কুমার দেব

পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকাসহ সারা দেশের পর্যটনপণ্যগুলো উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। বিশেষ করে আমাদের পর্যটনপণ্যগুলোর বিপণনকৌশলের অপর্যাপ্ততা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব। এ খাতে সরকারের বরাদ্দও খুবই নগণ্য। বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা ভ্রমণে যে ধরনের আন্তর্জাতিক প্রচারণা প্রয়োজন ছিল, তা লক্ষ করা যায়নি। রয়েছে দক্ষ ‘ট্যুরিস্ট গাইডে’র অভাব। পর্যটনবান্ধব রাস্তাঘাট, পার্কিং ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও অন্যান্য স্থাপনার অভাবে পর্যটকরা ঢাকা ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। ঢাকার পর্যটনপণ্যগুলোর উন্নয়নে পর্যাপ্ত গবেষণার দরকার। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড একাডেমিশিয়ানদের সংযুক্ত করে উন্নতমানের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরি করতে পারে।

 

রিসোর্টগুলোতে পেশাদারির ভীষণ অভাব

মো. জিয়াউল হক হাওলাদার

পর্যটন লেখক ও গবেষক

ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলো অনেক সমস্যা-সংকটে নিমজ্জিত। রিসোর্টগুলোতে পেশাদারির ভীষণ অভাব রয়েছে। সার্ভিসের ক্ষেত্রে একেবারে আনাড়ি। বেশির ভাগ রিসোর্ট অদক্ষ এবং অল্প শিক্ষিত লোকবল দ্বারা পরিচালিত। স্বল্প সময়ে বেশি মুনাফা গুনতে চায় অনেক মালিক। কটেজ ও রেস্টুরেন্টগুলোতে পর্যাপ্ত হাইজিন এবং পেস্ট কন্ট্রোল করা প্রয়োজন। অনেক রিসোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অ্যাটিক-ম্যানার এবং টেলিফোন ম্যানারেও ভীষণ সমস্যা রয়েছে। অনেক রিসোর্ট মালিক অদক্ষ, অপেশাদার ছেলে-মেয়ে স্বল্প বেতনে নিয়োগ করেন, যাদের ন্যূনতম হাইজিন সেন্স নেই। এসব সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য মালিকদেরও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে এবং পেশাদারি অর্জন করতে হবে।

 

পণ্যের উন্নয়ন করতে হলে অলংকরণ প্রয়োজন

মহিউদ্দিন হেলাল

সম্পাদক, পর্যটন বিচিত্রা

ঢাকা ও তার উপকণ্ঠে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু স্থাপনা থাকলেই পর্যটনপণ্য হয় না। এর জন্য প্রয়োজন পণ্য উন্নয়নের। আর পণ্যের উন্নয়ন করতে হলে তার অলংকরণ প্রয়োজন। যেমন পর্যটনবান্ধব রাস্তাঘাট, আরামদায়ক গণপরিবহন, প্রশিক্ষিত স্পেশালাইজড গাইড, পর্যটন স্পটে পর্যটকবান্ধব পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও বিনোদন। তার পরের ধাপ হচ্ছে পণ্য বিপণন—অর্থাৎ সঠিকভাবে পণ্যের পরিচয়টা দেশের ও দেশের বাইরের পর্যটকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যার ব্যাপক অভাব রয়েছে আমাদের। পর্যটনশিল্প বিকাশ না হওয়ার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে হোটেল ও রিসোর্টের চড়া মূল্য। যা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ। তাই পর্যটনশিল্পকে সমৃদ্ধ করতে হলে পণ্য উন্নয়ন ও বিপণনের সঙ্গে সঙ্গে হোটেল ও রিসোর্টের মূল্যও কমাতে হবে।



মন্তব্য